পোস্টগুলি

2025 থেকে পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে

জুলাই - আবু সাঈদ - মুগ্ধ - হাদি

আধুনিক মানুষের সকল কাজকর্মই অর্থনৈতিক। স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশে বারবার বিপ্লব হয়না। বাংলাদেশে বিগত সময়ে যত উন্নতিই হোক না কেন, অর্থনৈতিক ভাবে দেশের মানুষ সুখী ছিলনা বলেই বিপ্লব হয়েছে। এবং আবারও হবে।

রাজনীতিতে আপনি লোকজনকে তখনই বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাতে পারবেন যখন সে মনে করবে বর্তমান অবস্থানে সে সুখী নেই। বাংলাদেশের মানুষ সুখী নয়। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি অসুখী। এরা ২০২৪ এর সরকার পতনের পর এখনও বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে। যদিও দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখন আর ছাত্রদের তৈরি দলের উপর আর আস্থা রাখছে না। মূল কারন হয়ত দেশের পুরনো সকল প্রথা, পদ্ধতি এবং ইন্সটিটিউশনের বিরুদ্ধে কথা বলা। 

অনভিজ্ঞ হাতে দেশ চালানো যায় না। অবধারিতভাবে ছাত্ররা ভূল করবে, তাদের ভুল পথে চালিত করা হবে এবং দেশে পুলিশিং এর যে অবস্থা বর্তমানে ছাত্রদের অবস্থাও সেরকম হবে।

মাঝখান থেকে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত লাফালাফির কারনে এদের বড় একটা অংশ পড়াশোনা এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দুটোই হারাবে।

জুলাইয়ের আন্দোলনের পর বেশ কয়েকজনকে দেশজুড়ে হিরো বানানো হয়েছে। আবু সাঈদ তাদের প্রথমজন, মুগ্ধ দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ হচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চের হাদি।

লাশের রাজনীতির বলি হয়ে এরা এখন অনেকের জন্য নমস্য। কিন্তু ইতিহাস এদের মনে রাখবে কিনা সেটা বড় একটা প্রশ্ন হয়ে গেছে। হাদির মুখের ভাষা রাজনৈতিক নেতার মত ছিল না। গালাগালি এবং চিৎকার দিয়ে জনসম্মুখে তিনি কি প্রমান করতে চাইতেন সেটা জানি না। আমি যৌক্তিক কথা না শুনলে বা যুক্তিতর্কের ধার না যাচাই করতে পারলে কাউকে বড় নেতা বলে মানতে রাজি না। তার দর্শনের সাথেও আমি একমত হই না।

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, প্রায় দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে, মসজিদ থেকে ফেরার সময় রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকায় হাদি গুলিবিদ্ধ হন। 

২০২৪ এর জুলাইয়ের পরে হাদিকে চিনতাম না, খুব একটা মিডিয়াতেও দেখিনি। ২০২৫ এ তাকে হিরো বানিয়ে এবং পরে হত্যার পর তাকে প্রচুর মিডিয়া কাভারেজ দেয়া হচ্ছে। ঘটনাগুলোর পরম্পরা দেখলে মনে হবে কিছুদিন পর পর একজন করে মানুষকে তারা শহীদ বানানোর ধান্ধায় থাকেন। এরপর শুরু হয় তাকে নিয়ে রাজনীতি আর রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন।

শাহবাগ জায়গাটাকে মোটামুটি ভাবে পঁচিয়ে ফেলা হয়েছে। আওয়ামীলীগ আমলে গণজাগরণ মঞ্চের পর, মৌলবাদীরা এ জায়গাটাকে নিয়ে প্রচুর উপহাস করলেও বর্তমানে শাহবাগ হয়ে গেছে আন্দোলনের তীর্থভূমি। সম্প্রতি এটাকে হাদি চত্বর নাম দেয়া হয়েছে। কয়দিন আগে অবশ্য অন্য নাম ছিল। সে যাই হোক, শাহবাগ আগের জায়গাতেই আছে। মানব সন্তানদের লম্ফঝম্পে তার কিছুই যায় আসে না।

যখনই কোন প্রতিবাদের দরকার পড়ে, তখনই আমরা জানি শাহবাগ বন্ধ হবে আর আশেপাশের তিনটা হাসপাতালের রোগীদের অবস্থা খারাপ হবে এবং শহরবাসী বিশেষ করে পুরান ঢাকাবাসী সেদিন কষ্ট করবে।

 

ডানপন্থীরা একসময় শাহবাগ আন্দোলনকে নিয়ে প্রচুর গালিগালাজ করেছে। এখনও করে তবে পরিমানে কম, কারন এখন তারা নিজেরাই সেখানে বসে থাকে আন্দোলন করার জন্য। শাহবাগে ছেলেমেয়ে একসাথে আন্দোলনরত ছিল বলে মেয়েদের নিয়ে প্রচুর রং-তামাসার কথা তারা ছড়িয়েছিল সেসময়। নিয়তির কি পরিহাস, তারাও এখন রাতজেগে বা ঘুমিয়ে শাহবাগে কাটিয়ে দেয়।

কেউ যদি বলে বাংলাদেশে ডানপন্থী রাজনীতি নাই তবে সে ভুলের রাজ্যে আছে। এখানে চরম ডানপন্থার উত্থান হতে পারেনি কারন বাংলাদেশের একটা শক্ত সাংস্কৃতিক ইতিহাস আছে। ডানেরা কখনো এই বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে আপন করে নিতে পারেনি। মৌলবাদের উত্থানের জন্য তাই তাদের রমনা বটমূলে বোমাবাজি করতে হয়, ভয়ে যেন লোকজন পরের বছর থেকে এই সব অনুষ্ঠানে আর না যায়। উদীচী, ছায়ানটে হামলা এবং অগ্নি সংযোগ করা হয়েছে ২০২৫ সালে এসে। নাটকের মঞ্চে হামলা হয়েছে, শিল্পীকে গান গাইতে বাধা দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়, বাউল ধরে পেটানো হচ্ছে, মাজারগুলো ভেঙে দেয়া হয়েছে - ইত্যাদি নানা কিছু করার একটাই কারন, জাতিকে সংস্কৃতি থেকে সরিয়ে দেয়া।

ভারত বিরোধিতার ব্যাপারটা অনেক সময় অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায় ডানপন্থীদের কারনে। এক ফেলানীকে যে রকম হাইলাইট করা হয় রাজনৈতিক কারনে, দেশের ভেতরে এদের কারনে হয়ে যাওয়া খুন আর অগ্নিসংযোগ ততটা গুরুত্ব পায় না। রাজনৈতিক আন্দোলন করতে ইস্যু দরকার হয়। এরা ইস্যু তৈরি করে, তারপর আন্দোলন করে।

মধ্যমপন্থী দল হিসেবে বিএনপির সুনাম থাকলেও, বিগত দিনে জামাতের সাথে মিলে তাদের জোট করাকে অনেকেই ভাল চোখে দেখেনি। আর এবার জামাতের সাথে জোট ভাঙ্গাকে ডানপন্থীরা ভাল চোখে দেখছে না। আওয়ামীলীগ সেকুল্যার দল হিসেবে পরিচিত থেকেও তারা ডানপন্থীদের তোষন করেছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এবং তাদের পতনের পর এই মৌলবাদীরা দেশ জুড়ে ক্ষমতার তান্ডব দেখাচ্ছে। এদেরকে দুধ-কলা দিয়ে পুষে আওয়ামীলীগ দেশের এই একটা ক্ষতি অন্তত করে গেছে দীর্ঘ মেয়াদে।

আমি এখনও পর্যন্ত এদেশে এমন একটা রাজনৈতিক দল দেখিনি যারা জোর গলায় বলবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এখানে সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। রাজনীতি করতে হবে যুক্তি আর তর্ক দিয়ে, আবেগ আর লোভ থেকে নয়। ২০২৫ বিদায় নিচ্ছে, সামনে ভোট হবার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বাংলাদেশ বসে আছে জ্বলন্ত উনুনের উপর।

গণতন্ত্র সবচেয়ে আরাধ্য শাসন ব্যবস্থা হলেও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য এটি হিতে বিপরীত হয়। কারন একজন যোগ্য শাসক নির্বাচনের প্রক্রিয়াটাই এদেশের জনগণ জানে না। এখানে যে বেশি চিল্লায় আর মাঠ গরম রাখতে পারে সেই ভোটে নির্বাচিত হয়। যিনি সবচেয়ে দক্ষ বা যৌক্তিক তাকে রাখা হয় খেলার বাইরে। 

২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
ঢাকা, বাংলাদেশ । 

The Wind of Change - হাওয়া বদল

সকল সাম্রাজ্যের একদিন শেষ হবে। ক্ষমতার পালাবদল হবে। 

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে দীর্ঘ পনের বছর পর। আওয়ামীলীগ আর ক্ষমতায় নেই। কিন্তু এখন দেশ কারা চালাচ্ছে সেটা বোঝাটা খুব দূরহ হয়ে গেছে। জামায়াত নাকি বিএনিপি - কে আসবে ক্ষমতায় এটা নিয়ে চলছে বিতর্ক। টকশোগুলোতে গরম গরম বক্তৃতা রেখে যাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ক্ষমতার অত গহীনের মারপ্যাঁচ বোঝাটা সাধারণের জন্য খুব কষ্টের।

ক্ষমতার শূন্যস্থান তৈরি হলে সেখানে সবসময়ই উগ্রবাদ স্থান নেয়। বাংলাদেশের বর্তমান সংবাদগুলো দেখলে অন্তত তাই মনে হচ্ছে। মাজার পোড়ানো হয়েছে, মেয়েদের ফুটবল খেলায় বাধা দেয়া হয়েছে, বাউলদের ধরে পেটানো হচ্ছে, বিরোধী মতের কাউকে পেলে জবাই করে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছে। একটা সভ্য সমাজ বলতে আদতে যা বোঝায় সেটার কোন অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না।

কারো কথা ভালো লাগে না বলে তাকে স্বৈরাচার বলার একটা ট্রেন্ড চালু হয়েছে। মোদ্দা কথা চরম ডানপন্থার উত্থানের যা যা উপসর্গ তার সবকিছুই বর্তমান বাংলাদেশে বিদ্যমান।

ধর্মের নামে কারা অধর্ম চালায় সবাই তা জানে। কিন্তু মুখ ফুটে বলে না। কারন বাকস্বাধীনতার থেকে জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। ধর্ম-ছাগলদের রোখার তাই কেউ নাই। এরা বিভিন্ন দলে ভাগে হয়ে একসময় সবাইকে আক্রমন করে বসবে।  হয়ত এমন একদিন আসবে যেদিন ছবি আকাঁর জন্য বা কবিতা লেখার জন্যও ধরে ধরে সবাইকে পেটানো হবে।

ওহ... আমি মনে হয় ভুল বললাম। লেখালেখির জন্য ইতিমধ্যেই এদেশে অনেকের জীবন গেছে, বাকিরা পালিয়ে বেঁচেছে। এদেশেই কবিতা লেখার জন্য দেশান্তরি হতে হয়েছে কবিকে, ধার্মিকের কোপ খেতে হয়েছে। ছবি আঁকার জন্য কার্টুনিস্ট জেলে গেছে।

ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি করবে, কিন্তু এদেশের শাসকেরা সেখান থেকে শিখবে না। জ্ঞানের পরিচর্যা না করে যেখানে অন্ধবিশ্বাসকে তোষন করা হয় - সেখান থেকে বড় বড় বিপ্লবী তৈরি হবে, বিজ্ঞানী নয়। 

হয়ত তিরিশ বছর পরে এই সময়টার কথা যখন কেউ পড়বে সে ভাববে দেশে তখন খুব বড় একটা সংস্কার  চলছিল। ব্যপারটা আসলে সেটাও নয়। একটা গোলমাল চলছে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ঠিক করা নিয়ে, কিন্তু আমি খুব আশাবাদী যে সত্য একদিন জিতে যাবে। সত্য খুব কঠিন আর অপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু আপনাকে শেষ পর্যন্ত তার দ্বারস্থ হতেই হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় - ১৯৭১ কে মুছে ফেলার একটা আপ্রান চেষ্টা চলছে জেনজি প্রজন্মের হাত ধরে। ইতিহাস মুছে ফেলা না গেলেও তাকে বিকৃত করা বা তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ২০২৪ কে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। এ চেষ্টা নতুন নয়। যদিও এটা সফল হবে না। 

অশিক্ষিতের দেশে গণতন্ত্র সবসময় একটা দূর্বল শাসন ব্যবস্থা। সেই দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে সবাই বাংলাদেশকে নিয়ে খেলছে। কে যে আসল বন্ধু সেটা চেনাটাই দুষ্কর। তবুও আমাদের গণতন্ত্র আকঁড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে, খেলাফত, স্বৈরতন্ত্র কিংবা রাজতন্ত্র নয়।

আশা রাখি একদিন আবার বাউলের দেশে একতারা কথা বলবে। লালন বা নজরুলকে কেউ রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে দাঁড় করাবে না। মানুষ যুক্তি আর বিশ্লেষণের পথে হাঁটবে।

 

২৫ নভেম্বর, ২০২৫
ঢাকা ।

 

 

ক্ষমতা

ক্ষমতা হচ্ছে দায়িত্বের মত। আপনি যখনই ক্ষমতা পেয়ে তার অপব্যবহার করবেন, এটা কবর পর্যন্ত আপনাকে তাড়া করবে।

 


আমাদের কৈশোরের স্রষ্টার মৃত্যু

রকিব হাসান মারা গেছেন। আমাদের কৈশোরে তার ছবি দেখে আমরা তাকে চিনতাম না। তিন গোয়েন্দার বইয়ে শুধু তার নাম থাকত। নব্বই দশকের কয়েকটা প্রজন্মের কাছে তার নামটাই একটা কাল্টের মত ছিল। রকিব হাসানের নামেই যে কোন বই চলত।

২০২২ এ মারা গেলেন কাজী আনোয়ার হোসেন, তার একবছর আগে শেখ আবদুল হাকিম আর এখন রকিব হাসান। কয়েক প্রজন্মকে যারা বইপড়া শিখিয়েছিলেন তারা একে একে চলে গেছেন। আমাদের কৈশোরের সুপারহিরোরা সবাই অতীত হয়ে গেছেন। মূলত মধ্যবিত্ত বাঙালী বলতে আমরা যাদের বুঝি তাদের মানসিক বিকাশে এই তিনজনের অবদান অসীম। আমরা এখন মধ্য বয়সে আছি। আমাদের বয়স এখন চল্লিশ বা তার বেশি। বিয়ে-থা করে সবাই থিতু হয়েছে নিরামিষ জীবনে। কিন্তু যতদিন আমরা বেঁচে থাকব আর এই নামগুলো শুনব, আমরা ফিরে যাব রঙিন কৈশোরে।

আমি রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল চেনার আগে এদের চিনেছিলাম। তিন গোয়েন্দার কাল্পনিক অভিযানে কতবার নিজেকে কল্পনা করে হারিয়ে গিয়েছিলাম লস এঞ্জেলস রকি বিচে। মাসুদ রানার সাথে ঘুরে বেড়িয়েছি পৃথিবী। বুনো পশ্চিমে চালিয়েছিলাম ঘোড়া।

আমাদের সময় ইন্টারনেট ছিলো না। তথ্যের অবাধ প্রবাহ ছিলনা বলে আমাদের মনযোগ বিক্ষিপ্ত ভাবে সবকিছুতে ছড়িয়ে পড়ত না। আমাদের মনোরঞ্জনের প্রধান মাধ্যম ছিল বই। উত্তেজনা আর কল্পনার মিশেলে গড়া একটা অদ্ভুত দুনিয়া।

বর্তমানের কিশোরেরা যাদের টিকটকে নাচানাচি আর রেস্টুরেন্টে ঘুরে বেড়ানোটা নেশা, তারা আমাদের এই আবেগ বুঝতে পারবে না।

মানুষ জন্মায় আবার মরে যায়, কিন্তু কজন মানুষ ইতিহাসের অংশ হতে পারে? রকিব হাসান আপনি ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবেন। স্রষ্টার মৃত্যু হয় বারবার কিন্তু তার সৃষ্টির মাঝেই তিনি বেঁচে ওঠেন আবার। 

হাসপাতালে ঈশ্বর অনুপস্থিত থাকেন, প্রার্থনায় থাকে মানুষ

জীবনের একটা ব্যাস্ত সময় পার করেছি। হাসপাতাল আর বাসা করতে করতেই সারাদিন শেষ। এইদিকে ক্লায়েন্টের প্রোগ্রাম্যাটিক সমস্যা সমাধানের তাড়া অন্যদিকে আরেকজনের জীবন-মৃত্যু ছুয়ে ফিরে আসা। গত দশ বছরে আমাকে যে পরিমান হাসপাতালে দোড়াদৌড়ি করতে হয়েছে এই পরিমান শ্রম আর সময় নিয়ম করে আমি অন্যকিছুতে দেইনি।

কয়দিন আগে আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে নিয়ে গেলাম ধানমন্ডি ইবনে সিনা হাসপাতালে। ইমার্জেন্সি থেকে একটা কেবিনে শিফট করতেই সারাদিন পার। এরপর শুরু হল টেস্টের ধাক্কা। প্রায় দু'লাখ টাকার লম্বা একটা বিল নিয়ে হাসপাতাল থেকে তাকে সুস্থ করে আনলাম।

এরা বিল পেইড করার আগে হাসপাতাল থেকে রোগী বের হতে দেয় না। কেউই দেয় না। কাস্টমার একবার চলে গেলে যদি বিল না দেয়া হয়! হাসপাতাল থেকে রিলিজের দিন শুক্রবার ছিল। আমার মা অস্থির ছিল বাসায় ফেরার জন্য, আর তাদের তখন জুম্মার নামাজের তাড়া, কাউণ্টার বন্ধ হয়ে গেছে। নামাজের পর বিল পে করে রিলিজ নিতে হবে। আমি যতই বলি রিলিজ নিয়ে রোগী চলে যাক, আমি বিল পে করার জন্য থাকি। তারা মানতে নারাজ। শেষ পর্যন্ত আমার ব্যাংকের কার্ড আর ভিজিটিং কার্ড জমা রাখলাম। তারপর রিলিজ দিল। 

এই দেশে আসলে কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। এর আগে হয়ত তাদের বিল না দিয়ে কেউ পালিয়ে গিয়েছিল। যদিও এরাই একবার ভুল করেছিল আর কিছু টাকা বাকি রয়ে গিয়েছিল। আমাকে ফোন করার পর আমি নিজে গিয়ে তাদের সেই বিল পরিশোধ করে এসেছিলাম। 

ল্যাব এইড হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে মাত্র তিরিশ মিনিটের জন্য আমার মাকে রাখতে হয়েছিল সেখানে প্রায় সাত হাজার টাকা বিল করেছিল। 

তারপরেও মন্দের ভালো রোগী নিয়ে গেলে ইমার্জেন্সিতে সেবা পাওয়া যায়। তার জন্য আপনার দরকার হবে টাকা। টাকা থাকলে এই দেশে আপনার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

সব হাসপাতাল আর ডাক্তারই কি খারাপ? 

অবশ্যই না। এই দেশে আমি এমন অনেক স্পেশালিষ্ট ডাক্তার দেখেছি যারা মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে রোগী দেখেন। বিনা পয়সায় ট্রান্সপ্লান্টের মত জটিল সব অপারেশন করান। ফ্রি-তে টেস্ট করানোর ব্যবস্থা করে দেন। স্যাম্পলের ঔষধ রোগীদের দিয়ে দেন। 

মিরপুরের কিডনি ফাউণ্ডেশন কিংবা শ্যামলীর সিকেডি হাসপাতালে প্রচুর রোগি হয়। এখানে নুন্যতম খরচে দেশের সেরা কিছু ডাক্তার চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে শ্যামলীর সিকেডিতে ঔষধের দামও অন্যজায়গার থেকে কম। হ্যাটস অফ টু দেম।

ঢালাওভাবে সবাইকে খারাপ কিভাবে বলি? কিন্তু ভালোরা আড়াল হয়ে যায় কর্পোরেট হাসপাতালের আড়ালে। স্বাস্থ্য সেবা একটা ব্যবসা এইখানে। স্বাধীনতার পর থেকে কোন সরকারই এই মৌলিক অধিকারকে ফ্রি করতে পারেনি। নূন্যতম সেবা পেতে হলেও আপনাকে খরচ করতে হবে অর্থ।

এর একটা কারন হতে পারে, আমাদের কোন সরকারই দেশের মানুষইকে মানুষ মনে করেনি। এখনও করে না। আপনি সরকারি মেডিকেল গুলোতে যান, সেখানে লাশ বের করতে হলেও আপনাকে স্ট্রেচারের জন্য পে করতে হবে। জীবিত মানুষ মৃত মানুষকে নিয়ে ব্যবসা করে।

একটু সামর্থ্যবান হলে তাই কেউ সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় যেতে চায় না। মানুষ ব্যবসা করে মানুষকে নিয়ে, জীবন আর মৃত্যু নিয়ে। সৃষ্টিকর্তা হাসপাতালে না থাকলেও, তাকে ডেকে যায় অনবরত রাত জেগে থাকা রোগীর আত্মীয়স্বজন।

স্কয়ার বা এভার কেয়ারের মত ফাইভস্টার হাসপাতালে যাবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। বেঁচে থাকতে একবার দেখার ইচ্ছা আছে। টাকা ঈশ্বরের থেকে কত বেশি শক্তিশালী সেটা নিজের চোখে দেখার খুব ইচ্ছা।

 

 

আমাদের ব্যর্থ রাষ্ট্র

এইটা একটা বিখ্যাত ছবি হতে যাচ্ছে। কারন প্রতিদিনতো আকাশ থেকে টুপ করে বিমান পড়ে স্কুলের বাচ্চা মারা যায় না! তাই এইরকম ধবংসস্তুপ দেখতে পাওয়াটা দূর্লভ।

সোমবার ২১শে জুলাই, বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষন বিমান ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের উপর গিয়ে পড়ে। হতাহতের সংখ্যা কেউ সঠিক বলছে না। তবে গোনা যাবে একসময়। কারন স্কুলের বাচ্চাদের পরিবার আছে, হাজিরার সিস্টেম আছে।

আমি সারাদিন অনেক কিছু লেখার চেষ্টা করেও লিখতে পারিনি। কোন কাজও করতে পারিনি গত দুইদিন। মানুষের সীমাহীন অভিযোগ আর একে অপরের উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা দেখছিলাম সোশ্যাল মিডিয়ায়। নিহত বৈমানিককে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত করা হয়েছে। মৃত বাচ্চাদের যাদের দেহ পাওয়া গিয়েছে পরিবারের লোকজন নিজের মত করে সৎকার করেছেন। রাষ্ট্র চুপ হয়ে আছে। অসভ্য রাষ্ট্র, আ ফেইল্ড স্টেইট।

পৃথিবীর যেকোন উন্নত রাষ্ট্র সর্বোচ্চ চেষ্টা করে তার বাচ্চাদের বাচানোর জন্য। তাদের জন্য আলাদা স্কুল বাস, সেটা অতিক্রম করলে কঠিন জরিমানার ব্যবস্থা থাকে। স্কুলের আশেপাশে অনেক জায়গা জুড়ে নিরাপত্তা বলয়, মাইনর হিসেবে তাকে সর্বোচ্চ সুবিধা দেয়া, যাতে ঠিকমত পড়াশোনা করতে পারে সেজন্য যা যা করা দরকার, ইত্যাদি হাজার রকম বিষয় নিয়ে তারা কাজ করে।

যদি সেখানে এরকম ট্র্যাজেডি হত তবে এতক্ষনে তাদের সরকার নড়েচড়ে বসত অথবা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পদত্যাগ করত। ভাগ্যিস আমাদের কোন সরকার নেই। আমাদের আছে শিক্ষার নামে ব্যবসা আর দেশপ্রেমের নামে ইতরামি। 

আমরা আমাদের বাচ্চাদের শিখিয়েছি রাস্তায় আন্দোলন আর নেতা হতে হলে কি করতে হয় সেটা। We have failed our children. 

একটা জাতি ধর্মের নামে নোংরামি করে, জাতীয়বাদের চেতনায় দূর্নীতি করে, কেউ বিপদে পড়লে তামাশা দেখে, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সারা পৃথিবীর থেকে পিছিয়ে, নূন্যতম সিভিক সেন্স নাই - এইখানে এর থেকে বড় দূর্যোগ আসলে ব্লাডি সিভিলিয়ান হাজারে হাজারে মরবে।

আঙ্গুল তুলে ভুল দেখিয়ে দেবার হাজারটা জায়গা আছে। আজকে কিছুই করতে চাচ্ছি না। খুব ক্লান্ত লাগছে। গত জুলাই থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কেউ মরছে।

রাষ্ট্র বলে আলাদা কিছুর অস্তিত্ব নেই। যেখানে একদল মানুষের চিন্তার প্রতিফলন ঘটে সেটাই রাষ্ট্র। আমাদের চিন্তা অস্বচ্ছ, অসৎ, লোভাতুর আর ধার্মিক। 

দূর্ঘটনা ঘটতেই পারে, কিন্তু সেটা ঘটার উপকরণ যদি রাষ্ট্র ছড়িয়ে রাখে তবে সেই রাষ্ট্র একটা বাতিল চিন্তা-ভাবনা নিয়ে এগুচ্ছে। বাংলাদেশ একটা মৃত্যুপুরী, এইখানে বেঁচে থাকাটাই একটা যুদ্ধের মত। এটাই প্রথম বা শেষ নয়, সামনে আরো দূর্যোগ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। সবকিছু একটা চেইন রি-অ্যাকশনের মত  কাজ করে।

 

অ-সুখ বিলাস

প্রায় তিনবছর পর তিনদিন জ্বরে ভুগলাম। আমি ধারনা করেছি চিকেন গুনিয়া। 

সাধারনত আমি জ্বর, ঠান্ডা, সর্দি-কাশি এইগুলোতে ভুগি না। ছোটবেলায় এতবার অসুস্থ হয়েছি যে আমার ধারনা আমার বডিতে ইতিমধ্যে হাজার হাজার এন্টিবডি তৈরি হয়ে বসে আছে। নতুন করে ভাইরাস ঢুকতে গেলেই বলে - এই ব্যাটা তোকে তো চিনি। তুই আবার এসেছিস?

অসুস্থতা এবার কিছুটা উপভোগ করেছি। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। এই তিনদিনের বেশিরভাগ  সময়ই আমি ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি। কারন আমাদের শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা সবচেয়ে ভালো কাজ করে যখন আমরা ঘুমিয়ে থাকি। রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, প্রোটিন তৈরি করে আক্রান্ত স্থানের জন্য নতুন কোষ তৈরি, সেল রিপেয়ার ইত্যাদি নানা কাজে সে তখন মনযোগ দিতে পারে। ঘুম তাই উত্তম চিকিৎসা।

চিকেন গুনিয়ার নামে কেন "চিকেন" আছে এটা আমি জানি না। তবে মারাত্বক বিরক্তিকর একটা জ্বর। সারা শরীরের জয়েন্ট এ ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে। মানুষের আদি পুরুষের মত এই ভাইরাসও (CHIKV) আফ্রিকা থেকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়েছে।

ক্লায়েন্টের নতুন কোন কাজ ছিলনা। নিজের লেখালেখি থেকেও ছুটি। সেই সাথে বাইরে তুমুল বৃষ্টি আর জ্বরের ঘোরে একটা নেশাতুর অবস্থা, সব মিলিয়ে সোনায় সোহাগা যাকে বলে।  

"আমি সহজে অসুস্থ হই না" - এই কথাটা যতবার আমি বলি, আমার আশেপাশের বন্ধুবান্ধব খুব বিরক্ত হয়। তারা মনে করে আমি নিজেকে সুপারম্যান দাবি করছি। ব্যাপারটা আসলে সেরকম না। জীবন যাপনে আমি কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলি। আমি বিশ্বাস করি আমাদের বেশিরভাগ সমস্যা খাবার থেকেই শুরু হয়। আমি খুব পরিমিত আহার করি। বাধ্য না হলে আমি বাইরের খাবার খেতে চাই না। বুদ্ধি হবার পর থেকে রাস্তায় বানানো খাবার খাই না।

আমি চিনি খাই না। মিষ্টি জাতীয় যেকোন জিনিস থেকে আমি দশহাত দূরে থাকার চেষ্টা করি। ফ্রিজে কোন খাবার দুই দিনের বেশি থাকলে আমি আর সেটা খাই না। বাসার ফ্রিজে যদি কেউ খোলা পাত্রে খাবার রাখে, আমি সেটাও ফেলে দেই। ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাসের অভাব নাই আমাদের ফ্রিজে। এরা খুব আরামে থাকে ফ্রিজের তাপমাত্রায়। সেখানে খোলা পাত্রে খাবার রাখাটা একধরনের অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

এখন খেতে হলে আমি এখনই রান্না করার লোক। রান্না করে পরে খাবো এই চিন্তাটা আমাকে পীড়া দেয়। 

আমি আসলে অসুস্থ হতে চাই না। কয়দিন আগেই মাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াদোড়ি করতে হয়েছে সপ্তাহখানেক। হাসপাতালে আমাকে প্রতিমাসে অন্যদের জন্য এতবার যেতে হয় যে আমার হাসপাতাল ভীতি ধরে গেছে একরকমের। আমি জানি আমি অসুস্থ হলে আসলে আমাকে সেবা করার কেউ নেই। আমার কাজগুলো করার কেউ নেই। আমার খাবার বানিয়ে দেবার কেউ নেই, আমার আবদার রক্ষা করার লোক নেই।

বড় হবার একটা ভীষণ যন্ত্রনা আছে। আপনি স্বাধীনতা পাবেন কিন্তু সেটা অন্যেরা কেড়ে নেবে। আপনার সময় কেড়ে নেবে ভালোবাসার নামে। উপার্জিত অর্থ কেড়ে নেবে দায়িত্বের নামে। আমি তাই অসুস্থ হতে চাই না, কারন আমাকে দেখে রাখার কেউ নাই।

মৃদু জ্বর, মাথা ব্যাথা, সর্দি কাশি, পেট ব্যাথা, মন খারাপ ইত্যাদি তাই আমার কখনো হয় না। আমি সহজে অসুস্থ হইনা। অসুস্থ হবার মত বিলাসিতা আমার নেই। 

 

 

আমার একলা সময়

হুমায়ুন আজাদ এর একটা অসম্ভব সুন্দর কবিতা আছে। 

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্য মারা যাবো
ছোট ঘাসফুলের জন্যে
একটি টলোমলো শিশিরবিন্দুর জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো চৈত্রের বাতাসে
উড়ে যাওয়া একটি পাঁপড়ির জন্যে
একফোঁটা বৃষ্টির জন্যে

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
দোয়েলের শিসের জন্যে
শিশুর গালের একটি টোলের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো চোখের মণিতে
গেঁথে থাকা একবিন্দু অশ্রুর জন্যে
একফোঁটা রৌদ্রের জন্যে

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
এক কণা জ্যোৎস্নার জন্যে
এক টুকরো মেঘের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো টাওয়ারের একুশ তলায়
হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজাপতির জন্যে
এক ফোঁটা সবুজের জন্যে

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
খুব ছোট একটি স্বপ্নের জন্যে
খুব ছোট দুঃখের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো ঘুমের ভেতরে
একটি ছোটো দীর্ঘশ্বাসের জন্যে
একফোঁটা সৌন্দর্যের জন্যে। 

পুরোটা জুড়েই তিনি মৃত্যুর কথা বলে গেছেন। অথচ বোঝাতে চেয়েছেন বেঁচে থাকার জন্য আমাদের কত কত  সুন্দর কারন রয়েছে। একদল মানুষ ক্ষমতার লোভ, অর্থের অহংকার অর্জনের জন্য বেঁচে থাকে। অথচ আমাদের বেঁচে থাকাটাই এক বিস্ময়। 

ফুলের পাপড়ির উপর জমে থাকা একটা শিশিরবিন্দু দেখেও মন আপ্লুত হতে পারে। আকাশের মেঘ দেখে মন চাইতে পারে আরেকটু বেঁচে থাকি এই বর্ষার কদম দেখার জন্য।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমার মৃত্যুটা কেমন হবে! 

খুব সম্ভবত আত্মীয় পরিজন, পরিচিত মানুষ, চেনা মুখের বন্ধু ছাড়া নির্জন শীতল কোন ঘরে। যদিও খুব করে চাই মৃত্যুর আগে আমাকে ঘিরে থাকুক পরিচিত পরিবেশ আর প্রিয় কোন মুখ।

মৃত্যুকে রোমান্টিসাইজ করতে চাই না। একলা থাকতেও আমার ভয় নেই। তবু কোথাও যেন একটা অভিমান লুকিয়ে থাকে।

যা কিছু আছে বিলিয়ে যাই
আমার সময় নাই, সময় নাই
দেখা হয়নি, বলা হয়নি যা ছিল গোপন
একটা মানুষও পেলামনা আপন

জীবনটা খুব সুন্দর, অনেকদিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এত অল্প সময়ে কত কিছুই দেখা হয়না করা হয়না। শুধু সময় নষ্ট করে যাই। 

অতিরিক্ত তথ্যের যুগ

মানুষের জন্মের ইতিহাস কত বছরের?

একদম সঠিকভাবে বলা না গেলেও আমরা জানি আধুনিক মানুষ প্রায় ৩ লাখ বছর আগে আফ্রিকায় তাদের যাত্রা শুরু করেছিল। এই মানুষেরা Homo heidelbergensis বা একই ধরণের একটা প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হয়েছিল। এরপর তারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের বাকি যত প্রজাতি ছিল তাদের প্রতিস্থাপন করে।

এই তথ্য অনেকেই জানেন না। জানার আসলে দরকারও নেই। আপনার ব্যক্তিগত জীবন যাপনে এই তথ্য কোন কাজে আসবে না।

আমরা বাস করছি এমন একটা সময়ে যখন অতীত সব মানুষের থেকে আমরা সবচেয়ে বেশি জানি। বেশি জানি বলাটা মনে হয় ভুল। আমরা অতীতের মানুষের থেকে বেশি তথ্য ভান্ডারের সাথে যুক্ত আছি। 

পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা জায়গায়। ইন্টারনেট নামক ইনফরমেশন হাইওয়েতে যুক্ত হওয়াতে আমরা এখন এই তাবৎ জ্ঞান হাতের মুঠোফোনেই বা কম্পিউটার স্ক্রিনে পেয়ে যাচ্ছি নিমিষে।

চিন্তা করে দেখুন প্রতিদিন কি পরিমানে বেদরকারি তথ্য আপনি হজম করছেন। সব যে কাজে লাগছে বা মনে রাখতে পারছেন তা কিন্তু নয়। এর কিছু আপনার মনে থাকছে আর কিছু অযথাই আপনি পড়ছেন বা দেখছেন সময় নষ্ট করে।

মিলিয়নের মত বই, পডকাস্ট, ভিডিও, গান, গল্প হাতের মুঠোয় থাকায় কোনটা ছেড়ে কোনটা ধরবেন সেটা ঠিক করতে পারছেন না। অস্থির হয়ে পড়ছে মানসিকতা। এই যে একটা প্রজন্ম Information Overload এর মধ্যে পড়ে গেছে, এরা সত্যিকার অর্থে কিছু শিখছে না বা করছে না। 

অতিরিক্ত তথ্য প্রবাহের কারনে মানুষ আজকে মনোযোগ দিতে পারছে না সাধারণ কাজেও। মাল্টি টাস্কিং নামক একটা যন্ত্রনা নিজেদের জীবনে ঢুকিয়ে নেয়ায় কোন কাজেই তারা সফল হতে পারছে না। মানুষের মস্তিষ্ক একসাথে দুটো কাজে মনোযোগ দেয়ার জন্য তৈরি হয়নি। অতিরিক্ত এই তথ্যের যুগে সবাই মাল্টি টাস্কিং করতে গিয়ে গোলমাল পাকিয়ে ফেলছে ব্যাক্তিগত জীবনেও।

আপনি পড়ছেন বা লিখছেন আর একই সাথে গান শুনছেন, এই ধরনের কাজ করলে কোনটাই ঠিকমত হবে না। মোবাইলে স্ক্রীন খুললেই সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনীতি, রান্না, বিনোদন, ধর্ম, শিক্ষা ইত্যাদি সকল কিছুর একটা জগা খিচুড়ি মার্কা তথ্যের ফিড ভেসে আসছে।

ক্ষতিটা কি হল?

সময় নষ্ট হল, কিছু শিখলেন না। এই সময়ে নিজের যে কাজ করতেন সেটাও হল না। অনেক তথ্য হজম করতে গিয়ে মস্তিষ্ক কোনটাই ঠিকমত নিতে পারল না। নিজের কাজের দরকারি তথ্য বাদেই বেহুদা রাজনীতির প্যাচাল ঢুকে গেল মাথায়। অথচ জীবনে কোনদিন আপনি রাজনীতি করবেন না।

সোশ্যাল মিডিয়া থেকে তাই মাঝে মধ্যে দূরে থাকুন। অহেতুক নিজের মতামত দেয়া থেকে বিরত থাকুন। কারো পোস্টের কমেন্ট সেকশনে গিয়ে তাকে ভুল প্রমান করার কোন দরকার নেই। পারলে দিনের কয়েক ঘন্টা মোবাইল থেকে দূরে থাকুন।

হাজার হাজার বই পড়ারও আপনার দরকার নেই। পৃথিবীর সবকিছু জানতে হবে এমন দিব্যিও কেউ আপনাকে দেয়নি। অযথাই নিজের জীবনকে ব্যস্ত আর জটিল করে তুলবেন না।

আইনস্টাইন অনেক বড় বিজ্ঞানী ছিলেন। পৃথিবী বদলে দেয়া আবিষ্কার আছে তার। তারপরেও তিনি ভ্রমন করেছেন, বেহালা বাজাতেন, সাইকেল চালাতেন। যতটা পেরেছেন জীবনকে উপভোগ করেছেন। আপনি তার থেকে জ্ঞানী নন। 

জীবন উপভোগ করতে শিখুন। তার আগে শিখুন কিভাবে এই অতিরিক্ত তথ্যের যুগে নিজেকে নিরাপদ রাখবেন। 

 

২০২৫ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যর্থতা

গণতন্ত্র গড়ে ওঠে বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। যেখানে জনগন সরকার এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের উপর ভরসা রাখে, দেশের আইন আর বিচারে বিশ্বাস রাখে।

স্বৈরতন্ত্র গড়ে ওঠে ভয়ের উপর। জনগণ সারাক্ষন ভয়ে থাকে, এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে। একজন ব্যক্তি বা একটি দলই তখন সবধরনের সুযোগ সুবিধা পায়। তারা যা বলে দেশের আইন তাই করে। দরকারে তারা সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে।

স্বৈরতন্ত্রের পতন সাধারনত বিপ্লবের মাধ্যমে হয়। এরপর যদি দেশে শান্তি ফিরে না আসে এবং  জনগণের আস্থা আর বিশ্বাস আবার প্রতিষ্ঠা না করা যায়, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো স্বরূপে ফেরত না আসে তবে অবধারিতভাবে আরেকটি বিপ্লবের ভিত প্রস্তুত  হয়ে যায়।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে হাসিনা রেজিমের পতনের পর দেশে শান্তি ফিরে আসেনি। প্রতিষ্ঠানগুলো আগের থেকে খারাপ অবস্থায় চলে গেছে। কার্যত কোন ধরনের পুলিশ ব্যবস্থা নেই, অথবা নতুন বিপ্লবীরা পুলিশকে ডিক্টেট করার চেষ্টা করছে। অগনিত মিথ্যা মামলা আর মব ভায়োলেন্স চলছে। তৌহিদি জনতা নামক একটা উদ্ভট শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে। যাদের কাজ হচ্ছে ধর্মের নামে নানা ধরনের সহিংস অপরাধ জায়েজ করা। নারীদের নিরাপত্তা প্রশ্নাতীতভাবে কমেছে নতুন বাংলাদেশে।

যাদের চাকরি চলে গেছে তারা বলতে পারবে দেশ এগিয়েছে না পিছিয়েছে। সংস্কারের নামে যা চলছে তা কোনভাবেই কাম্য নয়। দৃশ্যত ইউনুস সরকার ফেইল করেছে গনতান্ত্রিকভাবে সমস্যার সমাধান করতে। তাই তারা এখন ভয় প্রতিষ্ঠার কাজ করছে। 

মোস্তফা সরোয়ার ফারুকি -যিনি সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা তাকে অপ্রিয় প্রশ্ন করায় সাংবাদিকের চাকুরি চলে গেছে। প্রফেসর ইউনুসকে নিয়ে কোন সমালোচনা করলেই বিচারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এরকমটা হচ্ছে কেন?

১৯৭১ কে মুছে দিয়ে কোন বাংলাদেশ থাকতে পারে না। আওয়ামীলীগের একচেটিয়া মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক ব্যবসাকে মুছে দিতে গিয়ে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আর মুক্তিযুদ্ধকে কলংকিত করাটাও এই সরকারের আমলেই হয়েছে। মোটাদাগে বলা চলে Yunus you have failed. 

যখন জনগন বুঝতে পারবে আপনি তৃতীয় কোন শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছেন, অথবা কোন ধরনের সংস্কার করতে পারেননি, তখন স্বাভাবিক ভাবেই আপনার জনপ্রিয়তা কমে যাবে। ক্ষমতার লোভে আপনি এবং আপনারা গদি আকঁড়ে ধরে থাকতে চাইলে আবার একটা স্বৈরাচারী সরকারের জন্ম দেবেন।

সবাই ভুলে যায় - No One Is Indispensable in a Democracy. There is always an alternative when it comes to politics.

দেশ চরম একটা অস্বস্তিকর অবস্থায় আছে এবং যেকোন সময় মৌলবাদের চরম উত্থান ঘটতে পারে। এদের নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হবে। স্বাভাবিক ভাবেই নতুন বিপ্লবের পথে হাঁটবে বাংলাদেশ। আর যেখানে ক্রমাগত বিপ্লব হয় সেখানে না থাকে শান্তি না থাকে প্রগতি। 

 

দাওয়াত

দাওয়াত ব্যপারটাকে আমি এড়িয়ে চলি। দাওয়াত একটা চেইন রিএকশনের মত। কারো বাসায় দাওয়াতে গেলে ভদ্রতা করে আপনাকেও তাদের দাওয়াত দিতে হবে। তার মানে শুধু একদিন সময় নষ্ট হবে না, আরেকদিন সময় নষ্ট করার জন্য আপনাকে তৈরি থাকতে হবে। 

বাঙালী সামজিকতা বেশিরভাগ সময়েই আমার ভাল লাগে না। এরা একসাথে হলেই নানা অনর্থক বিষয় নিয়ে বেহুদা ক্যাচাল করে। পারিবারিক দাওয়াতে না যাওয়ার আরেকটা প্রধান কারন হল, খাবার ভালো না হলেও মিথ্যে করে বলতে হয় খাবার মজা হয়েছে।

আমি যেখানে থাকি সেখানে বিরিয়ানি আর পোলাও এত ভাল পরিমানে পাওয়া যায় যে, কেউ আমাকে তার বাসায় নিয়ে এই দুটো খাইয়ে খুশি করতে পারবে না। তাই শুধু খাবার জন্য কোথাও যাওয়াটা আমার কাছে সময় নষ্ট মনে হয়। 

আর বাকি থাকল আড্ডা দেয়া। দাওয়াতে গেলে যদি এমন কেউ না থাকে যার সাথে আড্ডা দিয়ে মজা পাওয়া যায়, তবে মনে হয় ইচ্ছে করে কেউ একজন আপনাকে শাস্তি দিচ্ছে। একদল বেকুব লোকের সাথে কয়েক ঘন্টা একটা বদ্ধ জায়গায় কাটানো একটা বড় ধরনের শাস্তি।

কোন একটা দাওয়াতে গেছি, কারো সাথে কিছু একটা আলোচনা করতে গেছি, দেখলাম আমার সব কথাতেই তিনি হ্যাঁ বলছেন, সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছেন। বুঝলাম ভদ্রলোক আসলে আমার কথা মন দিয়ে শুনছেন না। আমার বক্তব্যের কোন পালটা যুক্তিও দিতে চাচ্ছেন না। এই ধরনের লোক পরে গিয়ে আমাকে বাচাল আর জ্ঞানপাপী বলবে।

আরেকদল লোক থাকে যারা অনবরত আপনার প্রশংসা করে যাবে। এরাও খুব বিরক্তিকর। প্রশংসা ভালো লাগে কিন্তু আমি নারসিসিস্ট নই যে অনবরত আমার কাজের প্রশংসা করে যেতে হবে। আমি যখন কারো সাথে সময় কাটাতে চাই, আমি এমন কাউকে খুঁজি যে যুক্তি দিয়ে আমার কথা খন্ডন করতে পারবে। তবেই একটা আলোচনা জমে।

আমাকে অসামাজিক বললেও আমার কিছু যায় আসে না। কারন আমার বেশিরভাগ বিপদের দিনেই আমি কোন ধরনের সাহায্য পাইনি এদের কাছ থেকে। না মানসিক, না আর্থিক কোনভাবেই। তাই এই অহেতুক সময়ক্ষেপন আমার করতে ভাল লাগে না।

একটা বয়সের পর আমি বুঝতে শিখেছি, কাউকে খুশি করার থেকে নিজেকে খুশি রাখাটা বেশি দরকার। লোকে কি বলবে এই ধারনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পৃথিবীতে যে অল্প সময় থাকব সেখানে আরেকজনকে বা সমাজকে খুশি করার আমার কোন দরকার নেই। আমি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নেতা নই। আমাকে ভণিতা করে চলতে হবে না। আমি ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি।

 

মোবাইলঃ অদৃশ্য শেকলের উত্থান

আমি যখন ছোট ছিলাম তখন মোবাইল ছিল না। আমি জানতাম টেলিফোনে দূরের মানুষের সাথে কথা বলা যায়। সেই টেলিফোন তার দিয়ে অনেক দূরের আরেকটা টেলিফোনের সাথে সংযোগ করা থাকে। এক্সচেঞ্জ হাউজের অস্তিত্ব তখন আমার কাছে ছিল না।

কলেজ ভর্তির পর প্রথম মোবাইল পাই। তাও সিমেন্সের একটা এনালগ সেট। সেখানে আজকের মত স্মার্ট দুনিয়ার হাতছানি ছিল না। এই প্রযুক্তি আমার কাছে সবসময়েই ফিউচারিস্টিক মনে হয়েছে। কখন যে সেই শুধু কথা বলার যন্ত্র বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠল সেটা বুঝতে পারিনি। 

এরপর একদিন দেখলাম তারে বাঁধা টেলিফোন মোবাইলে রুপান্তরিত হয়ে গেছে আর মানুষগুলো কি এক অদৃশ্য তারে বাঁধা পড়ে গেছে। এখন যেখানেই যায় মোবাইল সাথে নিয়ে যায়। এমনকি টয়লেটে গেলেও হাতে মোবাইল থাকে। ইশ্বরের উপসনা গৃহে গেলেও এই অদৃশ্য তার তার লেজের সাথে বাঁধা থাকে।

সব থেকে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে মোবাইল আসার পর চাইলেই যে কাউকে যে কোন সময় বিরক্ত করা যায়। দিন নেই রাত নেই মোবাইল বাজলেই আমরা আঁতকে উঠি। চট করে ফোন ধরার চেষ্টা করি। দূরে থাকলে দৌড়ে গিয়ে ফোন রিসিভ করার চেষ্টা করি।

সময় মত  আবার একে চার্জ দিতে হয়, টাকা খাওয়াতে হয়। কে কত দামি ফোন ব্যবহার করে সেটার একটা প্রতিযোগিতা আছে সবার মাঝে। কাছে থাকার চেষ্টায় সবাই একটা অদৃশ্য শেকলে বাঁধা পড়ে গেছে।

আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মোবাইল নামক এই প্রযুক্তিকে আমরা নিয়ন্ত্রন করছি না, বরঞ্চ এই যন্ত্র আমাদের নিয়ন্ত্রন কর্তা হয়ে গেছে।

আমি নিজে একজন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা লোক। তারপরেও মোবাইল নামক যন্ত্রটার কিছু জিনিস আমি মেনে নিতে পারিনা। এই যে যখন তখন যাকে তাকে ফোন দেয়া যায়। 

আমি নিজের জন্য কিছু নিয়ম তৈরি করেছি। খুব বেশি দরকার না হলে আমি মোবাইল হাতে রাখি না। কেউ ফোন দিলেই আমি ধরি না। আমি আমার ইচ্ছামত ফোন ধরি। চাইলেই আমার সাথে কথা বলা যাবে এই ধারনা থেকে আমার পরিচিত জনদের বেরিয়ে আসতে হবে। কথা বলতে চাইলে আগে থেকে টেক্সট করে জানাতে হবে।

এমনিতেও মানুষের সাথে আমার খুব বেশি কথা বলতে ভাল লাগে না। মোবাইলেতো আরো লাগে না। এর দুটো কারন আছে। মোবাইলে কথা বলার সময় মানুষের চোখ আর মুখ দেখা যায় না। অথচ ভাবের আদান প্রদানের জন্য এই দুটো বিষয় আবশ্যক বলে আমি মনে করি।

দ্বিতীয়ত, মোবাইলে অনায়াসে মিথ্যে বলে দেয়া যায়। শুয়ে থাকলে বলা যায় কাজ করছি, নিউমার্কেট থাকলে বলা যায় চিটাগং আছি। অপরপক্ষ জানতেই পারে না আপনি যন্ত্রের সহায়তায় মিথ্যে বলছেন।

আমাদের কি এমন হবার কথা ছিল?

প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রনে থাকার কথা ছিল, আমরা প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রনে কেন চলে গেলাম? 

চাইলেই মোবাইল নামক যন্ত্রটাকে জীবন থেকে বাদ দিতে পারব না। তবে একে নিয়ন্ত্রন করা খুব সম্ভব। অপ্রয়োজনে মোবাইল হাতে নেবেন না, অযথা কাউকে ফোন করবেন না। অপরিচিত হলে ফোন করার আগে টেক্সট করে সময় চেয়ে নিন।

মোবাইল নামক যন্ত্রের দাসত্ব বাদ দিন। পকেটে একটা কম্পিউটার থাকাটা প্রযুক্তির একটা বিস্ময়, আনন্দের বিষয়। কিন্তু  তার প্রেমে পড়ে যাওয়াটা মানুষ হিসেবে অকিঞ্চিৎকর, অপমানজনক।

 

 

Selling Hope is a Crime

মোটিভেশন বিক্রি করে বাংলাদেশে একদলের পেট চলত। তারা নিজেরা কিছু করত না কিন্তু অন্যরা করতে পারবে এই আশা দিয়ে জীবন কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল।

এটা একটা ক্রাইমের পর্যায়ে পড়ে। আমি নিজে যে কাজে দক্ষ নই, সে কাজে অন্যকে উৎসাহ কেন দিতে যাবো? একজন ডাক্তার একজন ছাত্রকে উপদেশ দিতে পারে কিভাবে ডাক্তার হওয়া যায় সে বিষয়ে। কিন্তু আমি নিজে ডাক্তার না হয়ে খালি উৎসাহ দিয়ে আরেকজনকে ডাক্তার বানিয়ে দেব, এটা চিন্তা করাটা মূর্খতা।

তুমি পারবে, এই কথাটা কাউকে বলার আগে তাকে দশবার বলা দরকার "তুমি হারবে। প্রতিদিন হেরে যাবে।" টাকার কাছে হারবে, মায়ার কাছে হারবে, আর সবার শেষে সময়ের কাছে হারবে।

অন্যদের জিতে যাবার গল্প দেখেই আহ্লাদিত হবার কিছু নেই। সেই সফলতার পেছনে হাজারবার হেরে যাবার গল্প আছে, বিশ্বাস ভঙ্গের বেদনা আছে। এই কথাটা কেউ বলতে চায় না।

নতুন ব্যবসা শুরু করে ফেললেন অন্য কাউকে দেখে। একবারও চিন্তা করলেন না এই ব্যবসা দাঁড় করাতে গিয়ে সফল লোকটা তার সময় বিক্রি করেছে অকাতরে, ভালবাসাকে পায়ে দলেছে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অনবরত বিফল হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত দাঁতে দাঁত চেপে যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে রয়েছিল। যে জিনিসটা তাকে সাফল্য এনে দিয়েছেল সেটা হচ্ছে হেরে গিয়ে শেখা। একবারও না হেরে, হার থেকে শিক্ষা না নিয়ে কেউ সফল হতে পারেনি। 

যে কাউকে মোটিভেটেড করার সাথে সাথে তাকে বাধা আর আশাভঙ্গের গল্পও বলে দেয়া দরকার। চলার পত্থে মানুষ হোঁচট খাবেই, কাজে অসফল হবেই। শুধু সফলতার গল্প বিক্রি করাটা তাই অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

হেরে যাবার গল্পগুলো বলুন দয়া করে। মানুষ জীবনের কাছে প্রতিদিন হেরে যায়। মাত্র অল্প কিছু লোক সফল হতে পারে। হেরে গেলে তাই মন খারাপ করবেন না। যদি লেগে থাকেন একদিন না একদিন কিছু হলেও ফেরত পাবেন। নয়ত অন্যদের জন্য শিক্ষার উপকরণ হবেন।

দয়া করে আশা বিক্রি করবেন না। মানুষ বেশিরভাগ সময়েই অসফল হবে। সবাই সব কিছু করতে পারবে না। এটাই সাধারণ আর সত্য। আরামদায়ক মিথ্যা বলার থেকে কষ্টকর আর অপ্রিয় সত্য বলুন। 

 

বৃষ্টি কাদার ঢাকা

 "If life gives you lemons, make lemonade" - যদিও সেই লেমনেড আমি নিজে বানাই না। আরেকজন বানায় দেয়। চা আমার পছন্দ না হইলেও লেমন চা এইরকম বৃষ্টির দিনে একটা মাস্ট বিষয়। বৃষ্টি আমার পছন্দের জিনিস, চাকুরীজীবী পাবলিকের ভোগান্তি দেইখা ভাল লাগতেসে।

রেইনকোট পইরা বাইর হইসিলাম, সেই্টা কোন কামে আসে নাই। জুতা, প্যান্ট, জামা, মানিব্যাগ, মোবাইল, রেইনকোট সব ভিজা চুপসাইয়া গ্যাছে। এরা কেউ অভিযোগ না করলেও, মোবাইল খালি একবার বলসে, "বস, USB পোর্টে মনে হয় লিকুইড গ্যাছে। পোর্ট ডিজেবল করে দিসি।"

কর আমার কি? ২০২৫ সালে আইসা যদি পানির ডরে মোবাইল বাইর কইরা বৃষ্টির ছবি না তুলি তবে কেমনে কি? তোরে IP67 সার্টিফিকেট কে দিসে? তোর শিক্ষা সমাপ্ত হয় নাই। তুই সার্টিফিকেট জমা দিয়া রাজনীতি কর গিয়া। এইটা দ্যাশে ভালো চলে। আর পোর্ট ডিজেবল করে কি করবি? পুরা দেশটাই একটা ডিজেবল জোন।



স্কুলের বাচ্চাদের জন্য খারাপ লাগতেসে কিছুটা। ভিজা অবস্থায় ক্লাস করা মুশকিল। তবে আজকে  কোরবানির আগে শেষ ক্লাস, বৃষ্টিতে জানালার পাশে বইসা থাকতে হয়, বন্ধু-বান্ধবীর সাথে আড্ডা দিতে হয়, বই খোলাটা একটা পাপ।

বৃষ্টির ফোটার ছবি তোলা যায় না, ভিডিও করলে তাও কিছুটা বোঝা যায়। আলোর প্রতিফলন আর প্রতিসরনের মারাত্বক খেলা চলে। গরম লেমনেড খাইতে খাইতে একহাতে এই ম্যানুয়াল সেটিংস করা দুষ্কর।

লাল রঙের শিমুল ফুলের গাছের ফাঁক দিয়া অঝোরে বৃষ্টি একটা চমৎকার দেখার বিষয়। যদিও ঢাকা নান্দনিক শহর না। এইখানে বৃষ্টি আসলে শহরটা আরো নোংরা হয়ে যায়। মনে হয় মানুষের মনের নোংরা গুলা বাইর হইয়া রাস্তায় গড়াইতেসে।


শান্তির দূতেরা



স্কুল যেমন হতে হয়

স্কুলে আমরা বাচ্চাদের পাঠাই শিক্ষা গ্রহন করবার জন্য। স্কুল একটা বাচ্চার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম ধাপ। কিন্তু আমরা কি জানি একটা স্কুল কেমন হতে হয়? অথবা আদর্শ স্কুল বলতে কি বোঝায়?

বাচ্চার স্কুলে দিনে দুবার যেতে হয় আমাকে। সকালে তাকে দিয়ে আসি, আবার দুপুরের একটু আগে তাকে গিয়ে নিয়ে আসি। মাঝখানের সময়টা নিজের কিছু কাজ করে নিতে পারি। স্কুল থেকে বাচ্চাকে আনতে গেলে সেখানে বেশ কিছু সময় আমি ব্যয় করি। আমার কাছে স্কুল ব্যাগ দিয়ে সে কিছুটা সময় মাঠে দৌড়াদৌড়ি করে। 

আমি নিজে যেই স্কুলে পড়তাম সেখানেও একটা মাঠ ছিল। যদিও ছুটির পরে সেখানে আমরা খেলতাম না। আমাদের খেলার জন্য কোয়ার্টারে বিশাল ২ টা মাঠ ছিল। কালে ভদ্রে স্কুল মাঠে খেলা হত। সকালের পিটি/সমাবেশ স্কুল মাঠে হত।

 

যে স্কুলে ক্লাস থেকে বের হয়ে বাচ্চারা সবুজ মাঠ দেখতে পায় না, ছুটির পরে ঘাসের উপর বসে একটু সময় আড্ডা দেয়া যায় না, সেটা কোন স্কুল নয়। একটা বাধ্যতামূলক নিয়ম করা দরকার আমাদের দেশে, যেখানে খেলার মাঠ নেই সেখানে স্কুল থাকবে না। একটা বিল্ডিং এর মাঝে কিছু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র লাগিয়ে দিয়ে সেটাকে স্কুল নাম দেয়া যাবে না।

স্কুলে আমতলা থাকতে হবে, বকুল ফুলের গাছ থাকতে হবে। বৃষ্টির দিনে যেন ঝুমঝুম শব্দ শোনা যায় এরকম কিছু টিনের চাল থাকতে হবে। বর্ষায় কাদামাটি মাখার জায়গা থাকতে হবে, ফুলের বাগান থাকতে হবে। তবেই সেটাকে আদর্শ স্কুল বলা চলে। একটা শিশু যেন স্কুলে গেলে অ্যাডভেঞ্চারের অনুভুতি পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

দশম শ্রেণী পাশ করেই কেউ বিদ্যার জাহাজ হয়ে যায় না। এই সময়টা তার চরিত্র আর স্মৃতি গড়ে ওঠার সময়। তাই স্কুলে এমন একটা পরিবেশ থাকা দরকার যেখানে মাটির গন্ধ লেগে আছে, ফুল, পাখি আর মমতার ছোঁয়া আছে।

স্কুলে গিয়ে যেন শিশুর মনে না হয় সে জেলখানায় আছে। স্কুল পাশ করার বহু বছর পরও যেন স্মৃতি হাতড়ে সে বলতে পারে, "আমার স্কুল, আমার শৈশব।"

আমরা বিদ্যা অর্জনের মূল লক্ষ্য জলাঞ্জলি দিয়ে পরীক্ষার নম্বর আর সার্টিফিকেটের পেছনে দৌড়াই। খুব ভুল একটা জীবনে ঠেলে দেই আমাদের শিশুদের। এরপর বড় হলে তার কাছ থেকে কি আশা করতে পারেন আপনি?

ভালো শিক্ষকের পাশাপাশি একটা সবুজ পরিবেশ না থাকলে, সেটা শুধুই একটা কোচিং সেন্টার, কোনভাবেই স্কুল বলা চলে না।

 

ব্যক্তিগত তথ্য

লেখালেখি করে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করা বাদে আমি খুব নিভৃতে থাকা মানুষ। আমি লোকজনের সাথে খুব একটা মিশতে চাইনা। যতবারই সোশ্যালাইজিং করার চেষ্টা করেছি, মানুষের অহংকার আর ভয়ংকর রকমের নির্বুদ্ধিতার পরিচয় তাদের সাথে মিশতে আমাকে বাধা দিয়েছে।

আমি ধনী-গরীব, উঁচু সরকারি বা রাজনৈতিক পদ, সামাজিক স্ট্যাটাস দেখে আড্ডা দেই না। শুধু নির্বোধের সাথে আড্ডা দিতে আমার আপত্তি আছে।

বাচ্চার স্কুলের সামনে এক ভদ্রলোক সেদিন আমাকে হটাত করে বললেন আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি দেখেছি মনে হচ্ছে। আমি নির্লিপ্তভাবে বললাম, এখানেই দেখেছেন। বাচ্চাকে নিতে আসি, দিতে আসি। 

এরপর তিনি জানতে চাইলেন, আপনি থাকেন কোথায়? এই ভদ্রলোকের সাথে আজকেই আমার প্রথম দেখা। আমার স্মৃতিশক্তি এতই খারাপ নয় যে তাকে আগে দেখে থাকলে ভুলে যাবো।

আমি কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললাম, ভাই এত কিছু জানার কি দরকার? এরপর আপনি, জানতে চাইবেন, আমি কি করি, আমার বাচ্চাকাচ্চা কয়জন, বউ কি করে, কয় ভাই-বোন আমরা... কি দরকার এত অপ্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে। 

তার মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল। আমি গ্রাহ্য করলাম না। একটা বয়সের পর মানুষ আর শেখে না। কিছুটা অপমান করে যদি এদের মাথায় ঢোকানো যায় অন্যের ব্যাপারে নাক গলানোটো ভদ্রতার পরিচয় নয়।

পাশেই আমার এক বন্ধুর মেয়ে ছিলো। তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই আমি বললাম, শোনো মা, তুমি এখন থেকেই শেখো, কেউ বিনা কারনে প্রশ্ন করে তোমার ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চাইলে তাকে সরাসরি না বলবে। আর কাউকে নিজের গায়ে হাত দিয়ে আদর করতে দেবে না। সে তোমার বাবার যত কাছের বন্ধুই হোক।

মানুষ তার স্বভাবেই অন্যের ব্যাপারে কৌতূহলী। কিন্তু একজন ব্যাস্ত মানুষ সেই কৌতূহল নিবৃত্ত করে তার নিজের কাজে মনোযোগ দেন। আরেকজনের জীবনে কি ঘটছে সেটা নিয়ে গালগল্প করার মানে আপনার নিজের জীবনে কোন ধরনের আনন্দ নেই, উত্তেজনা নেই। সেটার ঘাটতি কাটাতে আপনার অন্যের বিষয়ে ছোঁকছোক করতে হয়।

আগে আমার ধারনা ছিল এই কাজটা শুধু মেয়েরাই করে। এখন দেখলাম ছেলে মানুষেরও এই স্বভাব আছে। অদ্ভুতভাবে এরকম স্বভাবের যাদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে তাদের সবাই ধার্মিক লেবাস পরে ছিলেন।

আমরা বাঙ্গালীরা বুঝতেই চাইনা নিজের তথ্য সহজে কাউকে দিতে হয় না। আপনার বাসার ঠিকানা, এনআইডি নম্বর, পাসপোর্টের তথ্য, ব্যাংকিং ইনফরমেশন, পরিবারের সদস্যদের ছবি, ইত্যাদি সবই খুব সেনসিটিভ তথ্য বহন করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এগুলোর যথেচ্ছা ব্যবহার ঝামেলা বাদে ভালো কিছু ডেকে আনে না।

এখনতো অনেকে তাদের বেডরুমের খবর পর্যন্ত ভ্লগিং এর নামে অনলাইনে ছড়াচ্ছেন। স্বস্তা জনপ্রিয়তার লোভে বিক্রি করার চেষ্টা করছেন নিজের প্রাইভেসির শেষ অংশটুকু।

আমি পারতপক্ষে কাউকে আমার ফোন নম্বরও দিতে চাই না। অহেতুক মোবাইলে কথা বলাটা আমার কাছে একটা বিরক্তিকর বিষয়।

রেষ্টুরেন্টে খেতে গেলে বা দোকানে কিছু কিনতে গেলে মেম্বারশিপের নামে এরা নম্বর চায়। আমি দেই না। দিলেও এমন একটা নম্বর দেই যেটা আমি ব্যবহার করি না। আমার কোন দরকার নেই সারাদিন তাদের প্রমোশনাল মেসেজ আর ফোন কল রিসিভ করার।

এরপরও নানা কারনে আমাকে অনেক নির্বোধের কাছে নিজের তথ্য দিতে হয়েছে। যেটা আমার খুবই অপছন্দের ছিল এবং আমি জানি এগুলোর বাজে ব্যবহার হবে। যথাসম্ভব এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছি পারিনি। নির্বোধের কাছে নিজের গোপনীয় তথ্য দামি না হতে পারে কিন্তু আমি চেষ্টা করেও এই ব্যপারে নির্বোধ হতে পারছি না।

বাসায় বুয়া/হোম মেইড রাখার যে "বাঙালি" সংস্কৃতি সেটাও আমার পছন্দের না। আমি এখনও নিজের রান্না নিজে করতে পারি, অনালাইনে অর্ডার করতে পারি সময় না থাকলে। প্রযুক্তির সহায়তা থাকায় কাপড় ধোয়ার কাজেও সময় নষ্ট করতে হয়না। যেহেতু চব্বিশ ঘন্টার বিশ ঘন্টা আমি বাসায় থাকতে পারি, অন্যদের মত রাস্তার জ্যাম আর মানুষ ঠেলে, ধুলোবালি খেয়ে আমাকে অফিস করতে হয় না, তাই যথেষ্ট সময় থাকে নিজের কাজ নিজে করার।

বুয়া কালচার আমার অপছন্দ কারন এদের লাই দিলেই মাথায় ওঠে এবং ভাল ব্যবহার করলে তার সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে। সবচেয়ে বড় কথা এদের প্রবেশ আমার শোবার ঘর পর্যন্ত, খুব কাছের মানুষ না হলে যেখানে আমি কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেই না এবং এরা এক বাসার খবর আরেক বাসায় গিয়ে বলে, যেটা আমার খুবই অপছন্দের। 

যেই কাজ আমি নিজে করতে পারি সেটা অন্যকে দিয়ে করানোর আমি কোন মানে দেখি না। সবচেয়ে বড় কথা যেহেতু আমি বাসায় বসে কাজ করি, কাজের লোক বাসায় আসা মানে আমার দিনের একঘন্টা সময় নষ্ট হওয়া এবং লেখালেখিতে একটা অহেতুক বিরতি পড়া। এই বিরতি আমার বিশ্রাম এবং লেখার কাজে বাধ সাধে। এর থেকে নিজে কিছু কায়িক শ্রম করাটা আমার কাছে উত্তম মনে হয়।

যাদের আমরা উন্নত বিশ্ব বলি, যাদের দেশের ভিসা পেলে বাঙ্গালীর স্বর্গসুখ অনুভব হয় সেখানে কিন্তু সবাই নিজের কাজ নিজেই করে। নিজের গাড়ি নিজে ড্রাইভ করে, বাজার নিজে করে, বাগান পরিষ্কার করে, স্কুল বাস না থাকলে বাচ্চাকে নিজে স্কুলে নিয়ে যায় - বলা চলে তার একার পক্ষে যা কিছু করা সম্ভব সে তাই করে। আমি কোন ভাবেই মনে করিনা আমরা বাঙ্গালীরা তাদের থেকে খুব একটা ভালো জীবন-যাপন করি। 

এদের মধ্যে যারা বেশি সচেতন তারা আরো দুটো জিনিস করে, নিয়মিত শরীরচর্চা করে আর প্রচুর বই পড়ে। দিনশেষে এই দুটো জিনিসই আপনার নিজের কাছে থাকে

আমার মন খারাপের বিকেলে সন্ধ্যা নামে বাগানবিলাসের নিচে

খুব বেশি মন খারাপ হলে কি করি? 

মন ভালো করার অহেতুক চেষ্টা আমি করি না। আমার মন খারাপের কারন অন্যেরা না যতটা তার থেকে বেশি আমি নিজে। কারন অন্যদের কথায় আমি গুরুত্ব দেই। অন্যরা বলতে খুব কাছের মানুষেরা। তারা যা বলে সেটাই বিশ্বাস করতে চাই। এরপর যখন নিজে ভুক্তভুগি হই তখন মন খারাপ হয়।

না বলাটা আমার পছন্দ ছিল না এককালে। খুব কষ্ট করে সেটা আয়ত্ব করেছি। নিজের যা ভাল লাগে না, সেটাতেই এখন হুট করে না বলে দেই। এর পরেও কেউ খুব ঝোলাঝুলি করে। তখন আমি চুপ করে থাকি। অহেতুক কথা বলাটা আমার পছন্দ নয়। একসময় তারা রণে ভংগ দেয়। আমার নিরবতা জিতে যায়। আমার স্বভাবের কিছুটা বোধহয় আমার মেয়েটা পাচ্ছে।

মন খারাপ হলে আমি গান শুনি, বাংলা মেলোডিয়াস গান। কিছুক্ষনের জন্য হারিয়ে যাওয়া যায় সুরের ভুবনে। খুব অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে আমি স্লো মিউজিকের গান বাদে ইদানিং আর কিছু পছন্দ করি না। এটা মনে হয় বয়সের স্বভাবে হয়েছে। এত এত সুন্দর বাংলা গান আমাদের আছে ভাবতেই ভাল লাগে।

মানুষের সংগ এড়াতে, নিজেকে বাসায় বন্দি রাখতে আমার সমস্যা হয় না। কারন পৃথিবীর বিখ্যাত যে কোন বই আমার হাতের নাগালে থাকে আর অগুনিত সায়েন্স ফিকশন মুভি। প্রযুক্তি আমাকে এই নিঃসঙ্গ থাকার অধিকার দিয়েছে। মাঝে মধ্যে বাইক নিয়ে ঢাকার রাস্তায় অহেতুক ঘুরতেও ভাল লাগে। রাস্তায় নামলে বোঝা যায় মানুষের অনেক তাড়া, রাগ-ক্ষোভ। দেখতে ভালো লাগে।

একসময় অনেক আড্ডা দিয়েছি। রাত-দিন আড্ডার পেছনে বুঁদ থাকতাম। এখন মনের মত সঙ্গী না পাওয়ায় আর আড্ডা দিতে ভালো লাগে না। আমি সাহিত্য আর বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে চাই ঘন্টার পর ঘন্টা। সেরকম কাউকে খুঁজে পাই না। পুরনো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গেল অবধারিত ভাবে চলে আসে রাজনৈতিক আলাপ। কাঁহাতক আর একই একই বস্তা পঁচা আলাপ করা যায়?

ইদের সময় তাই এবার বাসা থেকে বের হইনি। খুব আনন্দের একটা সময় কেটেছে একাকি। ঢাকায় ছুটির দিনে বের হলেই মানুষের ভীড়ে হারিয়ে যেতে হয়। জীবন উপভোগ না করতে পারা মানুষেরা রাস্তায় অহেতুক ভীড় করে। এই শহরে যেহেতু আনন্দ কেন্দ্রের অভাব, তাই যত সামান্য রাস্তায়, ব্রিজে আর শপিং মল গুলোতে তাদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। 

একটা শহরের মানুষের প্রধান আনন্দ উদযাপনের প্রক্রিয়া হচ্ছে রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়া। কি অদ্ভুত অস্বাস্থ্যকর একটা নিয়ম বানিয়ে ফেলেছি আমরা। রেস্টুরেন্টের খাবার এমনিতেই আমার খুব অপছন্দের একটা বিষয়। জীবন বাঁচানোর জন্য যে ভাত-ডাল আর আলুভর্তা রান্না করতে হয় সেটা আমি নিজেই পারি। তবুও মাঝে মধ্যে রেস্টুরেন্টের খাবার খেতে হয় সময় বাঁচানোর জন্য। সেটা অবশ্যই শখ করে নয়। আমি হোম ডেলিভারি নেই। বাসায় বসে খাই। খেতে খেতে বিজ্ঞান বিষয়ক কোন একটা টকশো দেখি ইউটিউবে।

বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে নিজেকে যতই উন্নত করছি ততই একা থাকতে ভালো লাগছে। অহেতুক আলোচনা বিরক্তিকর মনে হয়, আর কাউকে ভূল সিদ্বান্ত নিতে দেখলে মন খারাপ হয়। 

আমি একসময় অনেক উপদেশ বিলি করতাম। সেটা অবশ্য খুব কাছের মানুষদের। এখন সেটাও করি না। ভূল না করলে কেউ শেখে না। কিছু কিছু ভূল আবার এত মারাত্বক যে তারা পয়েন্ট অব নো রিটার্ন পার হয়ে যায়। সাবধান করার পরেও যারা বোঝেনা, তাদের জন্য মায়া দেখাতে গিয়েও মন খারাপ হয়।

কিছু জিনিস শেখা সবার খুব দরকারঃ

- শিক্ষা কাউকে দেয়া যায় না, যদি না তার শেখার মানসিকতা থাকে। তাই অহেতুক উপদেশ দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
- নিজের থেকে কম বুদ্ধিমান কারো সাথে তর্ক করতে যাওয়া যাবে না। এরা আপনার সময় আর মানসিক শান্তি নষ্ট করবে।
- ধর্ম আর রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস যত কমাবেন নিজেকে তত স্বাধীন মনে হবে। দুইটাই আপনার চিন্তার প্রসারকে পরাধীন করে দেয়। ভুল সিদ্বান্ত নিতে উৎসাহী করে।
- টাকার থেকে বড় বন্ধু আপনার কেউ নাই। যারা আজকে আপনাকে মূল্যায়ন করছে বা সেলাম ঠুকছে তারা এই টাকার ক্ষমতার কারনেই দিচ্ছে।

এই লেখাটা যখন লিখছিলাম তখন বেশ মন খারাপ ছিল। লিখতে লিখতে সেটা ভালো হয়ে গেছে। মন খারাপ হলে তাই আমি লিখিতে বসি। মন ভাল থাকলেও লিখি। তবে লেখালেখি মন ভাল করে দেয়ার একটা অন্যতম উপায় আমার কাছে।

 

ধর্ষন মানসিকতা এবং বাঙালীর দৃষ্টিভঙ্গি

বাইক সার্ভিসিং করতে গিয়েছিলাম। সাধারনত আমি মেকানিককে সমস্যার কথা বলে ওয়েটিং প্লেস এ গিয়ে বসে থাকি। আমার থেকে সে তার কাজ ভালো বোঝে, তাকে বুদ্ধি দেবার কোন দরকার নেই। আজকে অস্থির লাগছিলো দেখে সার্ভিসিং এর জায়গায় গিয়ে ঘোরাঘুরি করছিলাম। দেখছিলাম কিভাবে কি করে! আরো কিছু লোকজন এসেছে তাদের বাইক সার্ভিস করতে। এর মধ্যে একজন আবার আমার জন্য নির্ধারিত মেকানিকের সাথে এসে গল্প জুড়ে দিলো। গল্পের মূল বিষয় টক অব দ্যা কান্ট্রি আছিয়া ধর্ষন এবং আসামীদের পরিণতি কি হওয়া উচিৎ। কথায় কথায় সে বলল এই রাষ্ট্র কোন কাজের না, এখন জামায়াতের হাতে ক্ষমতা দিয়ে দেয়া উচিৎ। আফগানিস্তানের মত শরীয়া আইন করা হলে এইরকম গর্হিত কাজ ঘটত না। আমি মনোযোগ দিতে না চাইলেও অনেকক্ষন শুনলাম। কিছু বললাম না।

আমি লোকজনের সাথে কথা বলতে পছন্দ করি না। আমার কথা বেশিরভাগের পছন্দ হয় না। কারন সবাই যখন ঘটনা এক দৃষ্টিকোন থেকে দেখে আমি ঘটনা দশদিক থেকে দেখতে পছন্দ করি। এই ছেলে জামায়াতের বা শিবিরের হতে পারে। তাতে অবশ্য আমার কিছু যায় আসে না। জেনজির বৃহৎ একটা অংশ জামায়াত প্রেমী।

সে বেশ কয়েকবার আমার দিকে তাঁকাল তার কথার ভ্যালিডেশনের আশায়। বারংবার, সে ধর্ষনের জন্য সাথে সাথে মৃত্যুদন্ড এবং জামায়াতের হাতে ক্ষমতা দেয়ার কথা বলছিল। শেষ পর্যন্ত তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম শরীয়া আইন নিয়ে সে কিছু জানে নাকি? শরীয়া আইনে একজন মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে এটা প্রমান করতে হলে কি সাক্ষ্য লাগবে সেটা কি সে জানে? আর শরীয়া আইনে শাস্তি কে পাবে সেটা সম্পর্কে তার ধারনা আছে নাকি?

ব্যক্তিটি অপারগতা জানাল। সে শরীয়া আইন সম্পর্কে খুব বেশি জানে না। এরপর জিজ্ঞেস করলাম, আফগানিস্থানের বর্তমান অবস্থা, তাদের ব্যাংকিং, আমদানি রপ্তানি, চিকিৎসা, খাদ্যের মজুদ ইত্যাদি নিয়ে তার কোন আইডিয়া আছে কিনা? এই যুবক সেটাও খুব ভালো জানে না।

সে অনেক কিছুই জানে না, কিন্তু সে একটা মতামত প্রচার করছে এই দেশে অন্যদেশের মত আইন হলে ভালো হবে। এদের আমি খুব সাধারণ মানুষ হিসেবে ধরি। এটা আমাদের দেশের আর দশটা সাধারণ মানুষের মতামত। আমি ফেইসবুক খুললেই হরহামেশা এই ধরনের সাধারণ লোকজন দেখি। যে কোন ইস্যুতে এরা খুব দ্রুত মতামত দিয়ে দেয়। কারন চিন্তাভাবনা করাটা খুব কষ্টের একটা কাজ। এরা যে কারো কমেন্টের নিচে গিয়ে গালাগালি দিয়ে আসে। অপরিচিত লোকের সাথে বেহুদা তর্কে জড়ায়। সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি এহেনও বিষয় নাই যেটা তারা জানে না।

ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট বা মৃত্যুদন্ড বড়সড় একটা জাজমেন্ট। এর ভাল খারাপ উভয় দিকই আছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে আমরা যারা বড় হয়েছি। প্রতিনিয়ত দেখেছি অপরাধীদের বুক ফুলিয়ে আদালত প্রাঙ্গন ত্যাগের দৃশ্য, তাদের কাছে মনে হতে পারে প্রকাশ্যে মৃত্যদন্ড দিলেই বাংলাদেশে খুন, ধর্ষন, কালোবাজারি, প্রশ্নফাঁস, খাদ্যে ভেজাল সব কিছুর সমাধান চলে আসবে। এই ধারনাকে কগনিটিভ ডিস্টরশন (cognitive distortions) বলে।

cognitive distortions এ মানুষের চিন্তা-ভাবনা তার অতীতের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক শিক্ষা, ধর্মীয় বোধ, নেতিবাচক চিন্তা ইত্যাদি দিয়ে প্রভাবিত থাকে। এই সমস্যায় ভোগা মানুষেরা সঠিক সিদ্বান্ত নিতে পারে না। এমনকি যে কোন ঘটনার বিচারক হিসেবেও এরা খুব আপত্তিকর সিদ্বান্ত দেয়।

ধর্ষনের যে সাইকোলজিকাল কারন আছে তার মধ্যে এই cognitive distortions একটি। একজন ধর্ষক বা সম্ভাব্য ধর্ষকও এই cognitive distortions এ ভোগে। সে মনে করে নারীর উপর বল প্রয়োগ করা তার সহজাত অধিকার, নারীটি খারাপ প্রকৃতির, তার থেকে দূর্বল, সে পাপী, অবলা ইত্যাদি। 

পৃথিবীর আর কোন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের কোথাও ধর্ষন হয় না এই ধারনাটাও ভুল। সৌদিতে বাংলাদেশ থেকে যে সকল গৃহকর্মী যায়, তাদের বেশিরভাগের সাথে কি ঘটে আমরা সেটা জানি। আপনি শুধু গুগল করুন। আমি সেই পরিসংখ্যান দিয়ে এই আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে চাই না। সেখানে কিন্তু শরীয়া আইন আছে। তারপরেও অপরাধ সংঘটিত হয়।

পরিসংখ্যানের কিন্তু মজার একটা দিক আছে। কোন অপরাধ সংঘটিত হবার পর যদি তা রিপোর্ট করা না হয়, তবে তা পরিসংখ্যানের আওতাভুক্ত হয় না। কোন দেশে ধর্ষনের পরিসংখ্যান কম, এর মানে কিন্তু সেখানে ধর্ষন হয় না এমনটা না। বরঞ্চ আপনি ধরে নিতে পারেন সেখানে ধর্ষন প্রমান করা কঠিন বা অপরাধের লিপিবদ্ধতা নেই।

ধর্ষিত না হয়েও ধর্ষনের মামলা করার নজীর আমাদের দেশে অনেক আছে। তাই হুট করে যদি আমি বলে ফেলি ধর্ষনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে এবং তা ৯০ দিনের মধ্যেই কার্যকর করতে হবে তবে আমি cognitive distortions এর মধ্যে পড়ে যাবো। তদন্ত ৯০ দিনের মধ্যে করতে হবে এই দাবি যৌক্তিক। এর থেকে আগে করা গেলে আরো ভালো। কিন্তু ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট এর জন্য এটাকে জায়েজ করা হলে, যদি একজন নিরপরাধও ভুলক্রমে মৃত্যুদণ্ড পায় এবং তা কার্যকর হয়, তবে এর থেকে বড় ব্যর্থতা আইনের জন্য আর নাই।

এবার আছিয়ার কথায় ফেরত আসি। তাকে ধর্ষন করা হয়েছে এটা একটা অপরাধ, সে একজন মাইনর (শিশু) ছিল, এটা দ্বিতীয় আরেকটা অপরাধ। এরপর সে হাসপাতালে মারা যায়, তিন নম্বর অপরাধ মানে তাকে খুন করা হয়েছে। এখানে রাষ্ট্র চাইলেই এই তিন মামলার একটিতে অপরাধীকে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট দিতে পারে। কোনটির জন্য দেবে সেটা কি বুঝতে পারছেন?

রেইপ কি আমেরিকায় হয়? সেখানেতো আইন অনেক কড়া। তাহলে?

হ্যাঁ, সেখানেও রেইপ হয়। জনসংখ্যার পরিমান আর রিপোর্টেড কেইস হিস্ট্রির পরিসংখ্যানে হয়ত আমাদের থেকেও বেশি। কারন অপরাধ হলে তারা রিপোর্ট করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে একটা অদ্ভুত বিষয় আছে, তাদের আইনে পটেনশিয়াল রেইপিস্ট এবং চাইল্ড এবিউজারদের শাস্তির ব্যবস্থা আছে। মাঝেমধ্যেই তাদের Child Protection Services (CPS) সাঁড়াশি অভিযান চালায় এই সকল কালপ্রিটদের ঘটনা ঘটার আগেই ধরার জন্য।

আমি যতদূর জানি, আমেরিকান জেলে চাইল্ড এবিউজরাদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট চোখে দেখে বাকি অপরাধীরা। এবং সুযোগ পেলেই তাদের সাথে ওই কাজটা করে, যেটা তারা একটা বাচ্চার সাথে করেছে বা করতে চেয়েছে। 

আমার লেখার প্রথমদিকে উল্যেখিত ব্যাক্তিকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি কি রাস্তায় কাউকে একা পেলে ধর্ষন করবেন? সে মাথা নেড়ে না বলেছিল। সে এই শিক্ষা পায়নি এবং এটা অনৈতিক সে দাবি করেছিল। আমি তখন তাকে বললাম, তাহলে একবার চিন্তা করুন আপনি কেন এই খারাপ কাজ করবেন না, আর ওই রেপিস্ট কেন করছে? সমস্যাটা খুঁজে বের করুন। নয়ত শরীয়া আইন, বা মৃত্যুদণ্ড কোনটাই কাজে আসবে না।

আমাদের বাংলাদেশী পুরুষেরা যে মানসিকতায় বড় হয়, তাদের বড় একটা অংশই পটেনশিয়াল রেইপিস্ট। নয়ত কোনভাবেই তারা ধর্ষনের মত একটা খারাপ কাজকে জায়েজ করতে পারে না। আপনি নিশ্চই শুনেছেন ধর্মবেত্তারা বলে বেড়ায় মাহরাম ছাড়া নারী বাইরে গিয়েছে কেন? মেয়েটা হয়ত ঠিকমত পর্দা করেনি, তার চলাচল খুব শ্লীল ছিল না, ইত্যাদি।

মোরাল পুলিশিং এর দোহাই দিয়ে এরা অপরিচিত নারীকে মাথায় কাপড় দিতে বলে, ওড়না বুকের উপর টেনে দিতে বলে, রাতে একা বের হয়েছে কেন এ ধরনের উদ্ভট প্রশ্ন করে। এদের সবাই পটেনশিয়াল রেপিস্ট। আপনি কোনভাবেই আরেকজনের ব্যাক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। 

ব্যক্তি স্বাধীনতার সীমা কতটুকু? যতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করলে রাষ্ট্রীয় কোন আইন (পেনাল কোড) লঙ্গিত হবে না, ঠিক ততটুক। এর কোন সীমা নেই। যতক্ষন পর্যন্ত না একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রের কোন আইন ভংগ করে ততক্ষণ পর্যন্ত তার পোষাক, চলাফেরা, খাবার গ্রহন, মনোরঞ্জন, কথা বলা বা লিখা ইত্যাদি বিষয়ে বাধা দেয়া যাবে না। একটা মেয়ে যদি ওড়না বাদে হেঁটে যায় আপনার কোন অধিকার নেই তাকে ওড়না পরার শিক্ষা দেবার। তেমনি কেউ যদি হিজাব পরে হাঁটে, আপনার কোন অধিকার নেই তাকে হিজাব খুলতে বলার। কোন ভাবেই আপনি অন্যকারো ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারেন না, এটা দন্ডনীয় অপরাধ।

এরপর আমি আড্ডা দিতে গেলাম কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের সাথে। এদের কয়েকজন সরকারি চাকুরি করেন। এদের একজন হুট করে বলে বসলেন, আছিয়াকে অনেক সম্মান দিয়েছে রাষ্ট্র। আমি জানতে চাইলাম, কিভাবে? তিনি বললেন, এই যে তাকে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হল। আমি প্রচন্ড বিতৃষ্ণায় বললাম, এইরকম সম্মান এই মেয়েটার কোন দরকার ছিলো না। যে পদ্ধতিতে মেয়েটা মারা গেছে সেটা খুব বেদনাদায়ক। আপনার কাছে কেন মনে হল তাকে খুব সম্মান দেয়া হয়েছে?

আমি এই লোকের চেহারা আর কোনদিন দেখতে চাই না। তার চিন্তা-ভাবনা খুব স্থুল। তিনি যদি ধর্ষকের বিরুদ্ধে কিছু গালি দিতেন বা মৃত্যুদণ্ড দাবি করতেন তাও কিছুটা সম্মান আমি তার জন্য জমা রাখতে পারতাম। এই ভদ্রলোককে আমি পরবর্তী প্রশ্ন করেছিলাম যদি রাস্তা দিয়ে একটা সুন্দর মেয়ে হেঁটে যায়, দেখতে খুব স্মার্ট এবং টাইট জিন্স বা টি-শার্ট পরা থাকে, তবে আপনার কি সাহস হবে তার সাথে গিয়ে কথা বলার বা বন্ধুত্ব করার? তিনি জানালেন "না।" এরকম মেয়ের সাথে কথা বলার সাহস তার হবে না। 

বললাম, যার সাথে কথা বলার সাহস হবে না, তাকে রেইপ করার বা জোর করার সাহসও আপনার হবে না। তার মানে যে সকল মেয়েরা ড্যাম কেয়ার ভাবে চলাফেরা করে এই সকল পটেনশিয়াল রেপিস্টরা তাদের শিকার করতে যায় না। তারা সবসময় খুঁজে বেড়ায় দূর্বল এবং অর্থনৈতিক ভাবে অস্বচ্ছল মেয়েদের। কারন আমাদের দেশে আইনের অধিকার পাবার জন্য আপনাকে টাকা খরচ করতে হবে। এবং এই সকল রেপিস্টরা জানে আইন তারা কিনতে পারবে কোন না কোন ভাবে।

আমরা জানি সমস্যাটা কোথায়। কিন্তু শুধু মলম লাগিয়ে তার সমাধান চাইছি। সমস্যা বাঙ্গালীর মানসিকতায়। যে মাইন্ডসেট নিয়ে বাঙ্গালী পরিবারে একটা ছেলে বেড়ে ওঠে, সে মেয়েদেরকে শুধুই সম্ভোগের পন্য, কিংবা ঘরে বন্দি আত্মা হিসেবে দেখে, সে রাস্তায় তার থেকে স্মার্ট সুদর্শনা কাউকে দেখলে আপত্তি তুলবেই। কখনো ভীড়ের মাঝে তার গায়ে হাত দেবে, বাসে জায়গা থাকলেও গা ঘেঁষে বসার চেষ্টা করবে। অফিসে কলিগ হলে বাজে মন্তব্য ছুড়ে দেবে। কারন এইগুলো তাকে ছোট থেকে শেখানো হয়েছে।

বিপরীত লিঙ্গের প্রতি সম্মান প্রদর্শন আমাদের সংস্কৃতির অংশ হতে পারেনি। যদি হত তবে আমরা মোর‍্যাল পুলিশিং দেখতে পেতাম না। মেয়েদের কখনো তেতুলের মত, ঢাকনা না দেয়া দুধের মত ইত্যকার নানা বিশেষনে বিশেষায়িত করা হতনা। 

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম, কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হবার পর তাকে বলা, তুমি টাকা পকেটে নিয়ে একা একা বের হয়েছো কেন, তোমার সাথে গার্ড নেই কেন? ছিনতাইকারীতো ছিনতাই করবেই...। এরা অপরাধকে জায়েজ করার চেষ্টা করছে ভিক্টিম ব্লেইমিং করে।

পোষাকের স্বাধীনতার কথায় একটা কথা মনে পড়ে গেল, আমাদের স্কুলে কিন্তু বাচ্চাদের পোষাকের স্বাধীনতা নেই। সেখানে তাকে নির্দিষ্ট একটা ড্রেস পরে যেতে হয়। আর্মিতে নেই, পুলিশে নেই - সেখানেও তাদের জন্য নির্দিষ্ট একটা ইউনিফর্ম ঠিক করা থাকে।

ধর্মেও কিন্তু এই স্বাধীনতা নেই। সেখানেও কিন্তু একটা নির্দিষ্ট ধরনের পোষাক পরিধান না করলে আপনাকে হেনস্থা হতে হবে। আপনাকে আগে থেকেই বলে দেয়া হয়েছে এই ধরনের পোষাক না পরলে আপনি খারাপ। শাস্তির পরিমান লঘু বা গুরু হতে পারে। নির্ভর করে আপনি অর্থনৈতিকভাবে কতটা স্বচ্ছল তার উপর।

---

শিশুরা ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রেই এবিউজের শিকার হয় তাদের পরিচিত পরিজন দ্বারা। প্রথমত, শিশুরা দূর্বল, এরা প্রতিবাদ করার ক্ষমতা রাখে না, এবং দ্বিতীয়ত, তারা মনে করে সম্মানের ভয়ে শিশুর পরিবার অভিযোগ দায়ের করবে না। চাইল্ড এবিউজের তালিকায় কিন্তু ছেলে শিশুরাও আছে। আমি খুব করে আমার পরিচিত সবাইকে বলে দেই, নিজের বাচ্চাকে যেন চাচা, ফুপু, খালা-খালু, কাজিন এদের সাথে একা একা ছেড়ে না দেন। বিশেষ করে বৃহৎ ফ্যামিলিতে মায়েদের এই দিকে নজর দিতে হবে। কোন একটা লেখায় আমি পড়েছিলাম ছেলে শিশুরা তাদের প্রথম যৌনতা শেখে পরিবারের খালা, ফুপু এদের কাছ থেকে। তখন এই কথাটার মানে আমি হুট করে ধরতে পারিনি। এখন কিছুটা বুঝি।

আপনার বাচ্চাকে কারো কোলে বসতে দেবেন না, চুমু খেতে দেবেন না - এই অভ্যাসটা ছোটবেলা থেকেই করবেন। 

একদিনে আমাদের সমাজ বদলে যাবে কিছু আইনের মারপ্যাঁচে পড়ে একথা আমি বিশ্বাস করি না। আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক, আমাদের ধর্মও তাই। এখানে আইন যারা বানিয়েছেন, ধর্ম প্রচারক যারা আছেন সবাই পুরুষ। নারীদের জন্য নারীরা আইন বানায়নি। নারীরা কিভাবে চলবে, কি পরবে, কি খাবে সেই স্বাধীনতা তাদের দেয়া হয়নি। পুরুষেরা যেভাবে নারীদের দেখতে চেয়েছে, রাখতে চেয়েছে, আইন এবং ধর্ম সেভাবেই সাজানো হয়েছে।

 ----

নোটঃ আমাকে নারীবাদী ভাবার কারন নেই। আমার অন্যান্য লেখা পড়লে আপনি হয়ত জানতেন আমি নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাস করি না। পৃথিবীতে এরা একে অপরের প্রতিযোগী নয় বরঞ্চ সহযোগী। যে কাজ পুরুষ করতে পারবে তা নারীও করতে পারবে এটা আমি যৌক্তিকভাবে বিশ্বাস করি না। সমাজে দুই দলের কাজ ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু কেউ কারো দাস নয়। Equality এর চেয়ে সমাজে Equity এর বেশি প্রয়োজন।

Leave the table if respect is no longer served

সম্মান খুব ঠুনকো একটা জিনিস। কারন এটা ব্যক্তির নিজের উপর নির্ভর করে না। করে তার আশেপাশের মানুষের উপর, তার বসবাসকৃত সমাজের উপর। একজন লেখক যদি অশিক্ষিত একটা সমাজে বসবাস করেন, তবে তিনি খুব বেশি সম্মান পাবেন না। একজন বিজ্ঞানী যদি বাংলাদেশে বসে তার কাজ করেন তবে তিনি আশানুরুপ পুরষ্কৃত হবেন না। মেধাকে মূল্যায়ন করার মত মানসিকতা যদি আপনার আশেপাশের মানুষের না থাকে, তবে আপনার সৃষ্টিশীল কাজের জন্য কোন ধরনের সম্মান পাবেন না। 

এই কারনেই মেধাবীরা দেশে থাকতে চায় না। মেধাকে লালন-পালন করতে হয়, আদর যত্ন দিত্তে হয়, যেটা আমাদের সংস্কৃতিতে নাই। একটা সময় ছিল যখন রাজারা নিজেদের সভায় কবি-সাহিত্যিক, চিত্রকর, শিল্পী এদের বেতন দিয়ে লালন পালন করতেন। তাদের কাজ ছিল শুধু নিজের সময় আর মেধা ব্যয় করে নতুন সৃষ্টিশীল কাজ উপহার দেয়া। এই সকল মেধাবীদের লালন-পালন, নিরাপত্তা আর বাসস্থানের ব্যবস্থা রাজার তরফ থেকে করা হত। কেউ অসাধারন কোন কিছু নিয়ে রাজদরবারে এলে মিলত বিশাল অংকের পুরস্কার আর সম্মান। অসাধারন সব শিল্পকর্ম, সংগীত আর স্থাপত্য কর্মের সৃষ্টি হয়েছিল সেসময়।

সময় বদলেছে, শাসন ব্যবস্থার সংজ্ঞায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান রাষ্ট্র মেধাবীদের লালন-পালন করে না। এখনকার বিজ্ঞানীরা, শিল্পীরা, স্থাপত্য কলাবিদরা কর্পোরেট বেনিয়াদের বেতনভুক। ফলে পুঁজিবাদী সমাজে সকল আবিষ্কারের পেটেন্ট করা হয়। ব্যবসায়িক ফায়দা লোটা হয়। মাঝেমধ্যে রাষ্ট্রের কোন দরকারে কিছুদিনের জন্য এদের ভাড়া করা হয়। এরা কাজ শেষে আবার নিজের প্রতিষ্ঠানে ফেরত যান। 

এই দেশের বেশিরভাগ কবি-সাহিত্যিক এবং শিক্ষকরা রাজনৈতিক দলের দাস। পদ-পদবি, পুরস্কার আর উচ্চতর বেতনের লোভে নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে এরা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পদলেহনে ব্যস্ত থাকেন। ক্ষমতা কে খুশি রাখাতেই তাদের তুষ্টি। তারা তাদের মগজ বিক্রি করে দিয়েছেন জনপ্রিয় হবার ধান্দায়। আবার কিছু আছেন যারা মার খাবার ভয়ে চুপ করে থাকেন এবং রাষ্ট্রের সকল অনৈতিক কাজেরও বৈধতা দিয়ে থাকেন। এদের দিয়ে পৃথিবী বদলে দেয়া কোন দর্শন অথবা আবিষ্কার সম্ভব নয়।

এইরকম বুদ্ধিজীবী বা শিক্ষকদের যারা ছাত্র তারাও এই ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে যায় ছাত্রাবস্থায়। এরা জানে বর্তমানের বাংলাদেশে সম্মান পাওয়ার দুটো সহজ উপায় আছে- একটা হচ্ছে পয়সা বানালে, আরেকটা হচ্ছে সরকারি বড় চাকুরি করলে। কারন এইসব পদে গেলে ক্ষমতা এবং টাকা দুটোই পাওয়া যাবে। আর এই দুটোই আমাদের বর্তমান সমাজে সম্মানের মাপকাঠি। পড়াশোনা শেষ করে তাই সবার একমাত্র লক্ষ্য থাকে বড় সরকারি চাকরি অথবা বিসিএস ক্যাডার হওয়া।

আমাদের সমাজে একটা কথা খুব প্রচলিত- "নিজের সম্মান, নিজের কাছে।" মানে আপনাকে আপনার সম্মান রক্ষা করতে হবে। অন্য কেউ সেটা রক্ষার চেষ্টা করবে না। বরঞ্চ তারা সবসময় চেষ্টায় থাকবে কিভাবে আপনাকে ছোট দেখানো যায়। যাদের মেধা বা স্কিল নেই, তারা মেধাবীকে ছোট করে নিজেরা বড় হতে চায়। যেহেতু একটা দেশের বেশিরভাগ জনগণ অজ্ঞানতার চর্চা করে, জ্ঞানের দিক থেকে পিছিয়ে আছে। তাদের মূল কাজ থাকে বুদ্ধিজীবী সমাজের কাউকে দেখলেই তাকে ছোট করে দেখা। শোরগোল করে তার কণ্ঠরোধ করা। তাতে যদি নিজেকে কিছুটা জ্ঞানী বলে জাহির করা যায়।

এই কারনে মেধাবীরা যখন দেশ ছেড়ে চলে যায়, আমি দোষের কিছু দেখি না। যৌক্তিক হচ্ছে যখন বুঝবে একটা জায়গায় তোমার কাজের বা মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না, তখন যত দ্রুত পারো সেই স্থান ত্যাগ করবে। গোলাপের মূল্য, সৌন্দর্য আর ঘ্রান ফুল প্রেমির কাছে হয়। যাদের নাকে গোলাপের গন্ধ পৌছায় না, যাদের মাথাভর্তি নর্দমার মত চিন্তা-ভাবনা, তারা গোলাপের মূল্য দেবে না।

 

বইমেলা ২০২৫

২০২৫ এর বইমেলায় যাইনি। ঢাকায় ছিলাম অথচ বইমেলায় যেতে ইচ্ছে করেনি এটা আমার কোনদিন হয়নি। স্কুলে থাকতে বন্ধুদের নিয়ে যেতাম, কখনো একাই যেতাম আর পরে নিজের বাচ্চাকে সাথে নিয়ে গিয়েছি। আমি চাইতাম বই পড়ার বয়স না হলেও বাচ্চাটা দেখুক এই দেশে বই নামক জিনিসটার একটা মেলা হয়। মানুষ স্বেচ্ছায় সেখানে আসে- বই নেড়েচেড়ে দেখে, বই কেনে, গান হয়, ছবি আঁকে, আড্ডা হয়। জগতের ভালো জিনিসের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার একটা ইচ্ছা ছিল আমার।

এবার যাইনি দুটো কারনে, মেলাটা বইয়ের মেলা না হয়ে খাবারের মেলা হয়ে গিয়েছে আর সেখানে তৌহিদি জনতার আনাগোনা বেড়েছে। যারা জ্ঞান চর্চায় বাঁধা দেয়, তারা বইমেলায় কেন যায়? কোন লেখক কি লিখবে সেটা ঠিক করে দেয়ার দায়িত্ব কে কাকে দিয়েছে?

আপনি কি বই পড়বেন সেটা জোর করে কেউ আপনার উপর চাপিয়ে দিচ্ছে না। কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়ার জন্য আমি যেমন আপনাকে জোর করব না, আপনিও আমাকে জোর করবেন না আপনার অখাদ্য মতবাদ, বানান ভূল সর্বস্ব প্রেমের কবিতা বা রগরগে চটি গল্প পড়ার জন্য। তবুও আপনি লিখুন, প্রকাশ করুন। 

আমি চাই সবাই স্বাধীনভাবে লিখুক। সময় ঠিক করে দেবে কে টিকবে আর কে টিকবে না। আইন করে বই প্রকাশ অথবা বিক্রিতে বাঁধা দেয়া যাবে না। শিক্ষার মানদন্ডে আমরা এমনিতেই তলানির দিকের দেশ। পাঠ্যবইয়ের বাইরে এই সকল মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞান আর শিল্প সাহিত্যের বইয়ের মেলা তাই জাতির জন্য বাতিঘরের মত। সেটাই নিভে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।

কোন প্রকাশক বা লেখকের উপর কোন কারনেই হামলা চালানো যাবে না। নৈতিকতার মানদন্ডে এবং রাষ্ট্রীয় আইনে কোনভাবেই এটা মেনে নেয়া যায় না।

বই প্রকাশ করা কি বাক-স্বাধীনতার অংশ নয়? এই রাষ্ট্রে বাক-স্বাধীনতা শুধুমাত্র একটা  কেতাবি কথা হয়ে গেছে। বিশ্ব যখন সামনের দিকে আগাচ্ছে, আমরা দৌড়াচ্ছি উল্টো দিকে।

বইমেলায় খাবারের দোকান দিয়ে ভরিয়ে ফেলাটা আরেকটা অসুস্থতা। এটা কর্পোরেট কালচারের অংশ, টাকা বানানোর ধান্দা। যারা বইমেলায় খাবার খেতে যায়, তারা বই কেনে না, বই পড়ে না। 

আমি কোন লেখকের বই না পড়েই তার সমালোচনা করি না, অথবা কারো লেখা ভালো বলি না। না পড়েই কাউকে বাতিলের দলে ফেলে দেয়ার আমি ঘোরতর বিরোধী। যুক্তির জবাব যুক্তিতে হবে, পেশীতে বা চাপাতিতে নয়।

কারো মতামতের বিরোধিতা করতে হলে লিখুন। তার আগে পড়ুন, জানুন। একটা সমাজের বৃহৎ অংশ যখন অজ্ঞানতার চর্চা করে, তখন সেখানে গণতন্ত্র, নৈতিকতা আর বাক-স্বাধীনতা টেকে না। যত বেশি পড়বেন তত বেশি পরমত সহিষ্ণুতা বাড়বে।

মেলায় যাইনি কিন্তু বই কিনেছি ঘরে বসেই। ফেইসবুক থেকে দূরে আছি এটাও একটা স্বাস্থ্যকর দিক। এ জায়গাটাও অস্বাস্থ্যকর সব জাদুকরী টোটকায় ভরে যাচ্ছে। সারাদিন গুজব আর মারামারির খবর। খুব বেশিক্ষন সহ্য করা যায় না।

বাংলাবাজার বুকস নামক একটা পেইজ থেকে বই অর্ডার করেছিলাম গত বছর। সেটা এই বছর ডেলিভারি দিয়েছে! ঠিক করেছি, আমি কোনদিন বই প্রকাশ করলে সেটা পিডিএফ হিসেবে বিলি করব অতি অবশ্যই। ছাপার অক্ষরের থেকে খরচ ও কম আর দ্রুত পাঠকের কাছে পৌছানো যাবে।

 

 

আধুনিক দাস ব্যবসা

বাংলাদেশে পড়াশোনা শেষ করতে করতে একটা ছেলের বয়স ২৭ পেরিয়ে যাওয়াটা অদ্ভুত নয়। এরপর চাকরি পেতে পেতে আরো এক-দু বছর। বাঙালীর গড় আয়ু হিসেব করলে জীবনের অর্ধেকটা সে ব্যয় করে ফেলে একটা নিরানন্দ মূলক কাজে। যারা পড়াশোনার মূল লক্ষ্য ধরে নিয়েছিল চাকরি পাবার আশায়, তাদের কৈশোর এবং যৌবনের একটা বড় অংশ চলে যায় অন্যের হয়ে দাসত্ব করতে গিয়ে।

আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা আসলে দাস তৈরির কারখানা। নতুন কিছু শেখার আনন্দ থেকে শিশুদের এটা বঞ্ছিত করে। এদিক থেকে হিসেব করতে গেলে যারা ফেল মেরে জীবনের অন্যান্য কাজে বা ব্যবসায় মনোযোগ দেয় তারা বেশ ভাগ্যবান। তবে যারা বড় হয়েছে শুধুমাত্র একটা সরকারি বা বেসরকারি চাকরি করে জীবন পার করে দেবার জন্য, তারা মূলত আধুনিক দাস।

একটা সময় ছিল যখন পৃথিবীতে দাস ব্যবসা অনেক লাভজনক ছিল। জাহাজে করে আফ্রিকা থেকে কালোদের কিংবা যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে আসা হত ইউরোপ, আমেরিকা এবং আরবে। মানুশকে পন্য হিসেবে বিক্রি করে দেয়া তখন সভ্য সমাজের একটা ব্যবসা ছিল। দাসেদের কোন ইচ্ছা ছিল না। বেঁচে থাকার বিনিময়ে তারা খাবার এবং বাসস্থান পেত। বিনিময়ে তাদের যেকোন কাজ করতে হত। রাস্তা বানানো, শহর বানানো, মনোরঞ্জনের জন্য হত্যা, সৈনিক হিসেবে - মোটামুটি সব কাজেই তাদের নিয়োগ করা হত। দাসদের কোন অভিজ্ঞতার দরকার ছিল না। মার খেতে খেতে শিখে যেত কিভাবে কাজ করতে হয়।

যুগ বদলেছে। মানুষ যন্ত্র আবিষ্কার করেছে। মানবাধিকার নামে একটা কাল্পনিক বিষয়ের অবতারনা হয়েছে। চাইলেই কেউ আর এখন একটা মানুষ কিনে নিতে পারে না। এখনকার পুঁজিবাদি সমাজের কাজ করিয়ে নিতে কিছুটা শিক্ষিত আর ভদ্র দাসের দরকার। এরা যেন সহজে বিদ্রোহ না করে, স্বেচ্ছায় কাজ করে আর সময় মত কর্মস্থলে হাজিরা দেয় - ইত্যাদি বিষয় নিশ্চিত হওয়া দরকার।

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাটা  তৈরি হয়েছে সেরকম দাস বানাবার জন্য। এখানে যারা শিখতে আসে তাদের জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দেয়া হয় যেনতেন ভাবে একটা চাকরি পাওয়াকে। পড়াশোনা শেষে চাকরি পেলে তাই সে খুশিতে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয়, মিষ্টি খাওয়ায়।

আধুনিক দাসদের বন্দি করে রাখতে হয় না। তাকে মাস শেষে নির্দিষ্ট পরিমানে টাকা দিলে সে সময়মত পরিপাটি হয়ে, সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ঠিক ঠিক চলে আসে নির্দিষ্ট জায়গায়। তাকে যাই বলেন সে মাথা পেতে নেয় ইয়েস বস বলে। সহজে বিদ্রোহ করেনা, কারন তাতে কাজ চলে যাবার ভয়। কাজ চলে গেলে বাসা ভাড়া, বাচ্চার স্কুলের বেতন, বাসার রেশন, ইলেক্ট্রিসিটি বিল এসব সে দিতে পারবে না। সভ্য সমাজে সে আর থাকতে পারবে না।

কি অদ্ভুত একটা প্রক্রিয়া না? শুধু সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, শেকলে বাঁধা দাসের শেকল এখন আর দেখা যায় না। কিন্তু দিনের আলো সে বিক্রি করে দেয় আরেকজনের কাছে। তার পারিবারিক জীবন বলতে ঐ ছুটির দু'দিন।

যারা গবেষণা করার জন্য পড়াশোনা করে, কবি বা সাহিত্যিক হয়, বড় চিত্রকর হয়, সঙ্গীত কে ভালোবেসে জীবন কাটিয়ে দেয় এরা সমাজের খুব ছোট একটা অংশ। এরা আমার হিসেবের বাইরে।

সেদিন এক বন্ধুর সাথে কথায় কথায় বই পড়া নিয়ে কিঞ্চিত ঝগড়া হয়ে গেল। তাকে বলেছিলাম নিজের ধর্মগ্রন্থ বাদে কিছু বিজ্ঞানের বই, দর্শনের বই পড়তে। সে সাফ জানিয়ে দিল, এসব বই পড়ে বিজ্ঞানমনস্ক লোকজন যারা সাধারনত নাস্তিক হয়। তার এত বই পড়ার কোন ইচ্ছা নেই।

বই পড়ে মানুষ জ্ঞান অর্জনের জন্য, নিজের চিন্তাকে পরিশীলিত করার জন্য, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবার জন্য। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটাই এমন সেটা বাচ্চাদের ছোট থেকেই বই পড়ার প্রতি অনীহা তৈরি করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। এরা এমনকি নিজের ধর্মের ব্যপারেও খুব কম জানে। এদের ধর্মীয় জ্ঞানের বেশিরভাগই আসে অন্যের করা ওয়াজ থেকে। 

যে বাচ্চাটা ঘাসের রঙ সবুজ কেন? আকাশে বিজলি কেন চমকায়? সূর্য কি আসলে জ্বলছে? - এরকম প্রশ্ন করত একসময়, স্কুল থেকে বের হয়ে সে বুঝে যায় জীবনে বড় হতে হলে বিসিএস পরীক্ষা দিতে হবে। 

দাসেদের কারখানা একবার চালু হয়েছে, এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন দাস উৎপাদন করেই যাচ্ছে।

আমাদের মতন রাষ্ট্রের আসলে বুদ্ধিমান মানুষের দরকার নেই। তার দরকার সু-নাগরিক তৈরির একটা কারখানা। যেখান থেকে বছর বছর ট্যাক্স দিতে পারবে, আইন মেনে চলবে আর "যা বলব তাই শুনবে" এমন লোকজন বের হয়। তাই একটা তথৈবচ শিক্ষা ব্যবস্থায় ঢেকে দেয়া হয়েছে সবজায়গা। যারা পালিয়ে বাঁচতে পেরেছে তারাই জীবনটাকে কিছুটা উপভোগ করতে পারছে।

পড়াশোনা করে শিক্ষিত হবার লক্ষ্যটা কি, সেটা বাচ্চাদের নতুন করে শিখিয়ে দেয়া দরকার। জীবনের লক্ষ্য উপভোগ করা, দাস হিসেবে নিজেকে স্বেচ্ছায় বিক্রি করে দেয়া নয়।

 

 

লেজকাটা শেয়াল এবং মনস্তত্ত্বের খেলা

শেয়ালের গল্পটা মনে আছে? সেই যে তার লেজ কাটা বলে সে অন্যদেরও ফুসলিয়ে নিয়ে যায় লেজ কাটার জন্য। তার আগে সে বর্ননা করে লেজ কাটা থাকার মাহাত্ব্য কত প্রকার এবং কি কি?

বাংলাদেশীদের চরিত্র অনেকটা এই শেয়ালের মত। সে কোন কাজে যদি অসফল হয় তাহলে সে চায় তার সবচেয়ে কাছের ব্যাক্তিরাও অসফল হোক। তাতে তার নাক বাঁচে। বন্ধুদের মাঝে কেউ ভালো কিছু করলে বা চাকুরিতে প্রমোশন পেলে তাই তার হিংসা হয়। নিজে ফেল করলে সমস্যা নাই, কিন্তু বন্ধু পাশ করে গেলে অনেক বেশি দুঃখ হয়।

মনে মনে তারা ভাবে - যদি আমি ভুল করি তবে অন্যরা বাদ যাবে কেন? কেউ ভালো কিছু করতে গেলে পেছন থেকে টেনে নামানোও এই একই মনস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের নিন্দা করে, সমালোচনা নয়। সমালোচনা করতে গেলে সেখানে খারাপ এবং ভালো দুটো নিয়েই আলোচনা করতে হয়। কিন্তু আমি যতদিন দেখেছি এরা যখনই হাতে মাইক পায় শুরু হয় বদনাম করা। নিজেদের স্তুতির সাথে সাথে প্রতিপক্ষকে যেনতেন ভাবে সবার সামনে উলঙ্গ করাই এদের প্রধান কাজ।

স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে একটা সেক্যুলার সিস্টেম। সেখানে সব কিছু পড়ানো হবে, কোন ধর্মের বইয়ের সাথে মিললো সেটা দেখার বিষয় নয়। অথচ এই সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থাকে ডিক্টেট করতে চায় লেজকাটা শেয়ালেরা। বাচ্চারা কি পড়বে না পড়বে সেটা ধার্মিকেরা কেন তৈরি করবে? ধর্মীয় শিক্ষার জন্য মাদ্রাসা আছে, মক্তব আছে, হেফজখানা আছে। যার দরকার ইসলামিক লাইনে পড়াশোনা করার সে সেখানে গিয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহন করবে। এমনিতেই দেশের পাঠ্যবইয়ে ভুল এবং আদিম তথ্যে ভরা। তার উপর যদি মোল্লাতন্ত্রের খড়গ চলে এবং ধর্ম ঠিক করে দেয় কি পড়ানো যাবে আর কি পড়ানো যাবে না, তবে আমাদের বর্তমান অন্ধকার আরো ঘন হবে।

কে কি পড়বে না পড়বে সেটা এই যুগে এসে ঠিক করে দেয়াটাই এক ধরনের মূর্খতা। পৃথিবীর জ্ঞান হতে হবে উন্মুক্ত। তুমি মুর্খ বলেই আরেকজনকেও কেন মূর্খ বানাতে হবে?

লেজকাটা শেয়ালেরা জীবন উপভোগ করে না। তারা মনে করে পৃথিবীতে আনন্দ করা নিষিদ্ধ এবং জ্ঞান অর্জন করা পাপ। শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষার প্রচলন করেই এই জনপদে সকল ধরনের শান্তি এবং উন্নতি আনা যাবে। এরা এখন দলবদ্ধ হয়ে মাইকে রাজনৈতিক নেতাদের মত হুংকার দিচ্ছে। মেয়েদের ফুটবল খেলায় বাধা দিচ্ছে, কনসার্ট-নাটকে হামলা চালাচ্ছে, হোটেলে গিয়ে নিজেরাই অভিযান চালাচ্ছে কেন সেখানে গরুর মাংস বিক্রি করা হয় না এই অপরাধে! একটা সাধারণ মানের খাবার হোটেল কি বিক্রি করবে আর কি করবে না, সেটা এরা ঠিক করে দিচ্ছে। এরা যখন স্বৈরতন্ত্রর অধীনে থাকে, তখন বাক স্বাধীনতার কথা বলে, সমানাধিকারের কথা বলে, কিন্তু গোয়াল থেকে ছাড়া পেলেই বাকি সবার স্বাধীনতা হরনে নেমে যায়।

শুধুমাত্র গরু জবাই করে পিকনিক করাকে এরা স্বাধীনতা উপভোগ করার মাধ্যম হিসবে বেছে নিয়েছে। কি অদ্ভুত! বাঙ্গালী প্রতিবছর লাখে লাখে গরু জবাই করে খায়। কেউ এটাকে বিশেষ কিছু মনে করে না। কিন্তু শেয়ালেরা ভাবে বিশ কোটির সবাই মনে হয় তাদের মতই চিন্তা ভাবনা করে। তাই জায়গায় বেজায়গায় তারা এখন এই গরু জবাই করে খাওয়া-দাওয়া করছে। দেশের বিশেষ কোন উপকার না হলেও এরা এটাকে বিজয়ের আনন্দ হিসেবে উদযাপন করছে।

এই গোষ্ঠীকে আপনি মব বলেন আর তৌহিদি জনতাই বলেন, এরা আদতে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অকালকুষ্মাণ্ড রাজনৈতিক শেয়ালদের স্বেচ্ছাচারিতারই ফল। রাজনৈতিক শেয়ালেরা কখনই চায়নি দেশের জনগন শিক্ষিত হোক। শিক্ষিত হলে তাদের ভোটবাক্সে টান পড়বে। শোষন করার মত ভেড়ার পাল পাওয়া যাবে না। এরা একটা ভেড়ার পাল তৈরি করেছে।

ভোটের জন্য মাথা দরকার, বুদ্ধিমান দরকার নাই। কেউ ধর্ম বেচেছে, কেউ আবেগ আর চেতনা - সব একই রকম শেয়াল। নিজেদের লেজ কাটা বলে অন্যদেরও এরা তাই করেছে। একটা অপদার্থ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে যারা দেশের সম্পদ নয়, বরঞ্চ বোঝা।

নারীরা সমাজের একটা বিশাল অংশ। যে কোন ভাবেই হোক তাদের ঘরের মাঝে বন্দী রাখতে পারলেই এই শেয়ালদের লাভ। তাই পর্দার নামে আপাদমস্তক ঢেকে ফেলাটাকে এরা আবশ্যকীয়তার পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এরপর এই ব্রেইন ডেডদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে জনতার মাঝে। তাই কখনো এরা আন্দোলন করে বিনা ফটোর এনআইডি কার্ডের জন্য, অথবা প্রচারনা চালায় বহুবিবাহের সুফল নিয়ে। এই সব শেয়ালদের শিকার মূলত নতুন প্রজন্মের নারীরা।

বহুবিবাহে পুরুষের লাভ আছে। সে অনেক সম্ভোগের সাথী পায়। কিন্তু নারীদের কিছু পাবার নেই সেখান থেকে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে কোন কাজে অংশগ্রহন করতে গেলে আপনার ফটো আইডি লাগবে। সেটা এনআইডি, ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা পাসপোর্ট সব ক্ষেত্রেই একই নিয়ম। সেখানে ছবি বাদে আইডি বানানোর দাবি করা মানে এই সকল কর্মকান্ডে এই নারীরা আর অংশগ্রহন করতে পারবে না। সম্পত্তির উত্তরাধিকার পেতেও সমস্যা হবে এই নারীদের। কারন রাষ্ট্র তাদের ছবি বাদে আইডি দেবে না। এরা অবাঞ্ছিতই থাকবে।

 

স্থায়ী ঠিকানা

একজন মানুষ তার জীবদ্দশায় কতবার বাসস্থান পরিবর্তন করে?

এই তথ্য আমাদের দেশে সংগ্রহ করা হয় না। আমি একটা অনুমান নির্ভর কথা বলতে পারি, প্রতি পাঁচ বা ছয় বছর পর পর মানুষ তার বাসা পরিবর্তন করে। বাসা পরিবর্তনের সাথে ব্যাক্তির পেশা বেশি জড়িত। গ্রামাঞ্চলের লোকজন যারা কৃষিকাজের সাথে জড়িত তারা সাধারনত বাসা পরিবর্তন করে না। নিজের কেনা সম্পত্তিতে বা বাসায় যারা থাকেন তারাও সহজে বাসস্থান পরিবর্তন করেন না।

বাসসস্থান পরিবর্তনের মূল কারন শিক্ষা এবং চাকরি। দেখা গেছে ছেলেকে পড়াশোনা করানোর জন্য বাবা তার বসত ভিটা ছেড়ে শহরে এসে বাসা ভাড়া নিয়েছেন। নতুন চাকুরি পাওয়ার পর বা চাকুরিতে বদলি হলে নিজের এলাকা ছেড়ে অন্য জায়গায় সরে যেতে হচ্ছে লোকজনকে। 

বাসা ভাড়াও বাসস্থান পরিবর্তনের কারনগুলোর একটা। শহরের পশ (posh) এলাকাগুলোতে বাসা ভাড়া বেশি। সেখানে রিকশাভাড়া, বাজারের খরচ এবং আনুষঙ্গিক খরচও বেশি হয়। মধ্যবিত্তরা সাধারণত সে এলাকায় বাসা ভাড়া নিতে পারেন না। সে সকল এলাকায় যারা থাকেন তাদের লাইফস্টাইল সম্পূর্ন আলাদা। যেমন আমাদের পুরান ঢাকা আর গুলশান এলাকায় বাসা ভাড়ার আকাশ পাতাল তফাত। দুই এলাকার সংস্কৃতিতেও পার্থ্যক্য আছে। পুরান ঢাকায় বা গ্রামাঞ্চলে মেয়েরা কফিশপে বসে আড্ডা দেয়না, ছেলে বন্ধুর সাথে বসে স্মোক করে না, ধর্ম মেনে চলা বা না চলাটা তার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। পোষাকের কারনে তাকে অযথা হেনস্থা হতে হয় না ইত্যাদি। একই শহর অথচ দুটো জায়গায় আপনি আলাদা রকমের স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবেন।

যারা সাধারনত একবার নিজের বাসা ছেড়ে চাকরি, ব্যবসা বা শিক্ষার কারনে অন্য জায়গায় থাকতে বাধ্য হন, তাদের দুইটা ঠিকানা থাকে। একটাকে তারা স্থায়ী আবাস, আরেকটাকে বর্তমান ঠিকানা বলেন। স্থায়ী আবাস বলতে মানুষ মূলত যেখানে জন্মগ্রহন করেছে বা বাপ-দাদারা থাকতেন সেই ঠিকানাটাকে বোঝাতে চান। যদিও আমি এই দুই ঠিকানার ঘোরতর বিরোধী।

বছরের তিনশত পয়ষট্টি দিনের তিনশ দিনই যদি চাকরি বা অন্য কারনে আপনাকে একটা নির্দিষ্ট স্থানে থাকতে হয় তবে সেটাই আপনার স্থায়ী আবাস। আপনার বাপ-দাদার ভিটাতে আপনি কদাচিৎ যান, সেখানে থাকেন না। আবার যখন যান তখন নিজেকে আর সেখানকার সংস্কৃতির সাথে মেলাতেও পারেন না। অতিথির মত যান আর কয়েকটা দিন থেকে ফেরত আসেন। সেটাকে শুধু এনআইডি আর পাসপোর্টে জন্মস্থান হিসেবে ব্যবহার করেন, এই জায়গা কোনভাবেই আপনার স্থায়ী ঠিকানা হতে পারেনা।

মানুষের আসলে স্থায়ী কোন ঠিকানা হয় না। আমি নিজেই আমার প্রতিটা পাসপোর্টে আমার স্থায়ী ঠিকানা একবার করে পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছি। বেঁচে থাকতে যে আবার করবনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

খুব কম মানুষই আছেন যারা খুব পরিকল্পনা করে নিজের বাসস্থান বেছে নেন। বেশিরভাগ সময়েই তার চাকুরি বা ব্যবসাবৃত্তি তাকে বাধ্য করে একটা নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস করতে। অনেকে আবার আবেগের কাছে হেরে যান এবং নিজের আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব এবং পরিচিত এলাকার মায়ার টানে পড়ে একই এলাকায় পড়ে থাকেন বছরের পর বছর।

বয়স ত্রিশ হবার আগেই আপনাকে যে সিদ্বান্তগুলো নিয়ে ফেলতে হবে তার একটা হচ্ছে "আপনি কোথায় থাকতে চান।" সেখানে ভাড়া বসায় থাকুন বা নিজের ফ্ল্যাটে, অথবা জমি কিনে বাড়ি বানিয়ে, যাই করেন না কেন - আগে থেকেই ভেবেচিন্তে ফেলুন। কারন বাসস্থানের উপর নির্ভর করে আপনার তিনটা প্রধান চাহিদা পূরণ হবে, আপনার আয়, সন্তানের শিক্ষা এবং দরকারি স্বাস্থ্য সেবা।

এমন একটা এলাকায় থাকুন যেখান থেকে এই তিন সেবা এবং কর্মকান্ড আপনি সহজে পরিচালনা করতে পারেন। স্থায়ী ঠিকানার মোহে পড়ে থাকবেন না। যেখানে বছরে মাত্র অল্প কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে যাবেন সেটা কাগজে কলমে আপনার স্থায়ী ঠিকানা হলেও, নিজের মনে সেটাকে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে বিশ্বাস করা বাদ দিন। 

আমি এমনকি উপদেশ দেই, যেখানে আপনি সারাবছর থাকেন না সে এলাকার কর্মকান্ডে কোন ধরনের ইনভেস্টমেন্টে না যেতে। যদি গ্রামে না থাকেন সারাবছর, সেখানে জমি কেনা বন্ধ করুন, সেখানে একতলা টিনের ঘরকে পাকা বানানো বন্ধ করুন। এই অর্থ ব্যবসা বা অন্যকোন জায়গায় খাটান।

এমন অনেকের সাথে কথা বলেছি, যারা ব্যবসা করেন শহরে, পরিবার নিয়ে এসেছেন এখানে থাকার জন্য, বাচ্চারা শহরের স্কুলে পড়ে, এখানকার সংস্কৃতিতে বড় হচ্ছে, কিন্তু গ্রামে তাদের অব্যবহৃত বাড়ি পড়ে আছে। অনেক জায়গা জমি আছে এবং বছর বছর সেই ব্যাক্তিরা বিভিন্ন মামলা মোকদ্দমা আর ঝগড়ায় জড়াচ্ছেন এই সকল সম্পত্তি নিয়ে। আয়ের থেকে ব্যয় আর সময় নষ্ট বেশি হচ্ছে এই সম্পত্তি সামাল দিতে গিয়ে।

এগুলো আসলে আপনার সম্পত্তি নয়, লায়াবিলিটি। যে ইনভেস্টমেন্ট বা প্রপার্টি আপনাকে আয় দেবে না সেটাই আপনার লায়াবিলিটি। বুদ্ধিমানেরা লায়াবিলিটি বাড়ায় না, মায়ায় পড়েও না। যে বিজনেস লাভের মুখ দেখছে না সেটা বন্ধ করে দেয়াটাই উত্তম। আবেগে পড়ে হাতি পোষার কোন মানে হয় না। 

এই দেশে অবশ্য একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে, স্থায়ী বাসস্থানের ঠিকানা বলে একটা অবান্তর জিনিস কাগজপত্রে উল্লেখ করতে হয়। এই নিয়মের পরিবর্তন করা দরকার। একজন ব্যাক্তির স্থায়ী ঠিকানা হবে তার দেশ। বৃহৎ পরিসরে আমি অবশ্য মানুষের তৈরি বর্ডার আর জাতীয়বাদী চিন্তারও বিরোধিতা করি।


 

বাংলাদেশ ২০২৪ - ২০২৫

খাবার খাওয়ার সময় আগে আমি মুভি দেখতাম। অনেক দিনের অভ্যাস। একটা মুভির চারভাগের একভাগ দেখে ফেলতাম দুপুর বা রাতের খাবার খেতে খেতে।

এখন আমি ইউটিউবে বাসি টকশো দেখি। যেহেতু পত্রিকা পড়ি না, টিভি দেখি না, তাই এই টকশো গুলোই হচ্ছে আমার দেশের পরিস্থিতি মাপার প্রধান উপায়। বিনোদনের সাথে সাথে দেশের বুদ্ধিজীবী মহলের এবং নিজের রাজনৈতিক জ্ঞান ঝালাই করা হয়ে যায় এই সময়ে।

মোটাদাগে, টকশো দেখে আর ফেইসবুক থেকে আমি বুঝতে পারছি "বর্তমান বাংলাদেশ" একটা অস্থিতিশীল দেশ। জনগন প্রচন্ড রকমভাবে রাজনীতি সচেতন হলেও তারা আদতে রাজনীতিতে অজ্ঞ। এখানে ইউটিউব আর ফেইসবুক সেলিব্রিটিদের একটা চরম প্রভাব আছে জনমত তৈরিতে। দেশের বাইরে বসে কিছু লোকজন অনবরত দেশ নিয়ে উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে আর আমজনতা সেই ফাঁদে পা দিয়ে গন্ডগোল পাকাচ্ছে।

যে সুদিনের আশায় বিপ্লব হয়ে গেলো দেশে, একটা দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচনহীন সরকার সরে যেতে বাধ্য হল, সেই সুদিন আদতে আসেনি। যারা বিপ্লব করেছিল তারা নিজেরাই এখন স্বৈরশাসকের অসম্পূর্ন ভুমিকায় অভিনয় করতে চাইছে।

সবাই সংস্কার চাইছে, অন্তত সংস্কারের কথা বলছে। কিন্তু কারো মাথায় এটাই ঢোকে না- যে দেশে পনের বছর ধরে কোন সুষ্ঠ নির্বাচন হয় না, সেখানে সব দলের অংশগ্রহনে নির্বাচন হয়ে যাওয়াটাই একটা বড় ধরনের সংস্কার। আবার নির্বাচিত সরকার না হলে অনেক সংস্কারই মূল্যহীন হয়ে যাবে।

আওয়ামীলীগকে নিষিদ্ধ করার কথা শুনছি কদিন থেকে। ব্যাপরটা বেশ হাস্যকর লেগেছে আমার কাছে। স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধীতা করা দল জামায়েতে ইসলাম যদি তিপান্ন বছর পরেও এদেশে রাজনীতি করে, তবে আওয়ামীলীগ এদেশে আরও অনেকদিন রাজনীতি করে যাবে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে এদেশে বিএনপি আর আওয়ামী লীগ এখনো শীর্ষে। শুধুমাত্র গলার জোরে চিৎকার করে দ্বিতীয় স্বাধীনতা এনেছি বললেই সমন্বয়কেরা দেশের মালিক বনে যায় না। তাদের অহেতুক আস্ফালন তাই একসময় স্তিমিত হয়ে যেতে বাধ্য।

আওয়ামী লীগ দেশের স্বাধীনতার সাথে সরাসরি জড়িত দল, সে হিসেবেও ইতিহাসে তার নাম লেখা থাকবে। এই বিপ্লবকে যুদ্ধ বলে চালানো গেলে হয়ত জামায়েতের মত আওয়ামী লীগকেও যুদ্ধাপরাধী বলে চালানো যাবে। এই আইডিয়াটা অবশ্য মন্দ না। কিছুদিন ধরেই স্বাধীনতার অনেক পরে জন্ম নেয়া শিবিরের ছেলেদের টকশোতে এসে বলতে শুনেছি ৭১ এর স্বাধীনতা আসলে ভুলে হয়েছে, ওটা ভারতের ষড়যন্ত্র ছিল। তারা এই স্বাধীনতা চায়নি। 

যেহেতু ভারত সাহায্য করেছে তাই তারা এমনটা চায়নি বলে আসলে ৭১ এ জামায়েত ইসলামের ভূমিকাকে জায়েজ বানানোর একটা চেষ্টা করা হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এরা যখন জন্মগ্রহন করেনি তখনকার যুদ্ধটা এদের চাওয়া না চাওয়াতে কি বদলানো যাবে? বৈজ্ঞানিক ভাবে তো না। গায়েবি উপায় আমার জানা নেই। 

রাতারাতি উপদেষ্টা বনে যাওয়া একজন, যে অনেক বছর ছাত্রলীগের ডানার নিচে লুকিয়ে ছিল, সে তার বালক সুলভ চপলতায় বঙ্গবন্ধু কে জাতির জনক মানতে নারাজ। ব্যক্তিগতভাবে সে চাইলেই তা না মানতে পারে। এটা তার চিন্তার আর বাক-স্বাধীনতার বিষয়। কিন্তু শেখ মুজিব যখন বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন এবং যখন তাকে জাতির জনক উপাধি দেয়া হয় তখন এদের অনেকের জন্মই হয়নি। 

এই ধরনের স্টেইটমেন্ট তাদের চিন্তার অপরিপক্কতা প্রকাশ করে।

পিনাকি নামে একজন ইউটিউবার এর প্ররোচনায় এরা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙচুর করে গুড়িয়ে দেয়। এই পিনাকি একটা ইতর বিশেষ। খুব অদ্ভুত ভাবে হিন্দু ধর্মালম্বি হয়েও সে এদেশের মোল্লাদের ত্রাতা হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। কি সেলুকাস! 

এই লোকটা ঔষধ কেলেংকারির সাথে জড়িত ছিল একসময়। প্রাক্তন শাহবাগী হিসেবেও তার সুনাম আছে। বাংলাদেশের মুমিন বান্দারা যেভাবে তাকে পীর হিসেবে মেনে নিয়েছে সেটা প্রমান করে এদের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যতা আর চিন্তার অসুস্থতা চিরকালীন।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত আরো অনেক স্থাপনা ভাঙ্গা হয়েছে। এতে লাভ হয়েছে আওয়ামী লীগের। তাদের ভাষ্য সত্য বলে প্রমানিত হচ্ছে।

সাংবাদিক মাসুদ কামালের কথা আমি শুনি, এ লোকটা ফ্যাক্ট দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন। কার পক্ষে গেল তার ধার ধারেন না। তার ভাষা খুব মার্জিত। পিনাকির মত অশ্লীল না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে তিনি যথেষ্ট পরিপক্ক।

আওয়ামী লীগ যখন ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসে তখন যে তারা খুব আহামরি ভালো কিছু করে জিতে যায় এমনটা নয়। তারা ক্ষমতায় আসে বাকি দলগুলোর মূর্খের মত কাজকর্মে। এবার তৌহিদি জনতার উত্থান দেখে, দেশের মোল্লারা যে আদতে মৌলবাদি চিন্তা-ভাবনায় আচ্ছন্ন এবং আওয়ামী লীগ না থাকলে দেশটা জঙ্গিবাদে ভরে যাবে  - এ ধরনের একটা ন্যারেটিভ ইতিমধ্যে দাঁড়া হয়ে গেছে সাধারনের মনে। "আগেই ভালো ছিলাম" - এই মনোভাবের লোকের সংখ্যা তাই দিনদিন বাড়ছে।

আরব বসন্তের পর পর সে দেশগুলোতে মৌলবাদের একটা উত্থান ঘটেছে। তারা কেউ ভালো নেই। বাংলাদেশ সেই পথেই হাঁটছে। এখানে বাক-স্বাধীনতার কথা বললেও সবাই অন্তরে একেকজন স্বৈরাচার।

আমাদের সমস্যা শিক্ষায়। ওয়াজ মাহফিল যাদের ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের উৎস, তাদের দিয়ে যেকোন দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলানো সম্ভব।

ক্ষমতার শীর্ষে যারা থাকেন তারা সাধারনত একাকি হয়ে যান। আশেপাশে মোসাহেব ভরা থাকে। দেশের বাস্তব চিত্র বুঝতে পারেন না। আর হঠাৎ করে কেউ ক্ষমতা পেয়ে গেল সে সাধারনত স্বৈরাচারী হয়ে যায়। ইউনুস সরকার সেই পর্যায়ে আছে। এখান থেকে কিছুটা মান-সম্মান নিয়ে বেইল আউট করতে গেলে প্রফেসর ইউনুসের উচিৎ নির্বাচন দ্রুত দিয়ে গাধাদের শাসনভার তাদের নেতার হাতেই ছেড়ে দেয়া।


বিশ্ব সাহিত্য ভাষন -১ ( মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি)

 
মহিউদ্দিন মোহাম্মদ এর লেখা প্রথম বই পড়েছি "আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র", এবং তখনই তার ক্ষুরধার মস্তিষ্ক আর প্রাঞ্জল লেখার প্রমান পাই। পাঠককে খুশি করার বদলে তাদের মস্তিষ্ককে ধাক্কা দেয়ার প্রবনতা তার মধ্যে আছে। আমি তাকে একজন যৌক্তিক লেখক হিসেবে পেয়েছি। এজন্যই তার লেখা অবশ্য পাঠ্য। আমার ক্ষমতা থাকলে হয়ত তার কিছু লেখা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে বলতাম।

এবার বইমেলায় যাবো কিনা সিদ্বান্ত নেইনি। প্রকাশনীগুলো অবশ্য এখন বাসাতেই বই ডেলিভারি করে। তাই বই হাতে পেতে কোন সমস্যা নেই।
 
ফেইসবুক মারফত জানতে পারলাম জালালুদ্দিন রুমিকে নিয়ে তার লেখা একটা বই এসেছে। রুমিকে নিয়ে কমবেশি ফ্যাসিনেশন আমার আছে। অথচ রুমির কাজের যতগুলো বাংলা অনুবাদ আমি পড়েছি সব মোটামুটি অখাদ্য।
 
কিন্তু মহিউদ্দিন মোহাম্মদ আমাকে নিরাশ করেননি।

বাক-স্বাধীনতার খাঁচা

পাখি দুই রকমের, একটা উড়তে পারে আরেকটা উড়তে পারে না। যারা উড়তে পারে না, তারা আবার খুব জোরে দৌড়াতে পারে। কোন না কোন ভাবে তাকে খাবার এবং আত্মরক্ষার ব্যবস্থা প্রকৃতি করে দিয়েছে। 

এরা স্বাধীন পাখি। এদেরকে তোতা পাখির মত কথা শেখানো কঠিন বিষয়। কাছে গেলেই এরা উড়ে যায়। গাছের উঁচু ডাল থেকে নানা সুরে ডাকডাকি করে। মানুষের তোয়াক্কা করে না। আপনার শেখানো বুলি কোনভাবেই সে বলবে না। এরা বাকস্বাধীনতা উপভোগ করে।

কিছু পাখি আছে মানুষের খাঁচায় বসবাস করে। মূলত নিজের শখ পূরন করার জন্যই মানুষ তাকে বন্দী বানায়। নিজের মত খাবার দেয়, রংবেরঙের খাঁচা বানায়, বুলি শেখায়। তারপর জীবে প্রেম করেছে ভেবে খুব আহ্লাদ বোধ করে।

খাঁচার পাখি মাঝে মধ্যে ডানা ঝাঁপটায়, কপট রাগ দেখায়। কিন্তু তাকে তাই বলতে হয় আর করতে হয় যতটুকু তার খাঁচার মালিকের ইচ্ছা হয়। আর মাঝে মধ্যে শেখানো বুলি আওড়ে সে মালিককে খুশি রাখার চেষ্টা করে, যাতে ভালো খাবার পাওয়া যায়। এরা হচ্ছে বাক-পরাধীন পাখি। ডাকতে পারলেও খাবারের জন্য শেখানো বুলি বলতে হয় তাকে। নিজের ভাষার বদলে তাকে অন্য ভাষা রপ্ত করতে হয়।

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা হচ্ছে এই খাঁচায় বন্দী পাখির মতন। এরা মাঝে মধ্যে ডানা ঝাপটে কপট স্বাধীনতা উপভোগ করলেও মূলত বন্দী জীবন যাপন করে। সরকারের সীমার মধ্যে থেকেই সুশীলতা দেখায় আর নীতির চর্চা করে।

আপনার মনে কি প্রশ্ন জাগে, কেন আমাদের দেশের সাহিত্যিকেরা বিশ্বজয়ী সাহিত্যকর্ম তৈরি করতে পারে না? কারন বন্দি থাকা অবস্থায় তার আকাশে ওড়াওড়ি বন্ধ। কলমের গণ্ডি বেঁধে দেয়া আছে। কি লিখতে পারবে আর পারবে না সেটা যদি সীমারেখা টেনে দেয়া থাকে তবে সেখানে সাহিত্য চর্চা হয় না। যেটা হয় সেটা বাচ্চাদের গরু রচনা লেখার মত।

কিছু গৃহপালিত কবি-সাহিত্যিক অবশ্য প্রেমের গল্প আর কবিতা লিখেই জীবন পার করে দেয়। সমাজের দর্পন হবার বদলে তারা মিনমিনে সাহিত্য রচনা করে নারীকুলের ভালোবাসা অর্জন করে।

আবার কেউ কেউ যা হচ্ছে তা বলতে না পারার এই অদম্য বেদনায় পালিয়ে যায়, পৃথিবীর  অন্যপ্রান্তে গিয়ে নির্বাসিত জীবন যাপন শুরু করে।

বাক-স্বাধীনতার চর্চা করার জন্য বাংলাদেশ কখনোই উপযুক্ত ছিলো না।এখানে কবি-সাহিত্যিকের কলমকে ক্ষমতাসীনরা চরম ভয় পায়। সংবাদপত্রে কোনটা প্রকাশ হবে আর লেখকেরা কি লিখতে পারবে সেটা যদি ঠিক করে দেয়া থাকে তবে সেখানে উৎকৃষ্ট চিন্তার প্রতিফলন হয় না।

আমাদের দেশে অবশ্য জনগনই অনেক সময় এই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। লেখালেখির জন্য এখানে হামলা, মামলা এবং শেষ পর্যন্ত খুন করার নজীর আছে।

অথচ বয়ান বাজিতে সবাই বলে বেড়ায় খুব বাক-স্বাধীনতা উপভোগ করছি। গৃহপালিত বুদ্ধিজীবীর ভীড়ে আসল লেখকেরা তাই হারিয়ে গেছেন। 

নয়ত অনেক আগেই আপনি পত্রিকা আর ফেইসবুক ভরা দেখতেন, "যা হচ্ছে তা ভালো হচ্ছে না"। লেখকেরা যদি সমালোচনা না করতে পারেন সমাজের, তবে সেই সমাজ পরিবর্তনের আশা করাটা বাতুলতা।

অপ্রিয় সত্য কথা বলতে পারাটাই বাক স্বাধীনতা। আপনার যা পছন্দ শুধু তাই যদি বলে যান লেখকেরা, তবে সেটা সৃষ্টিশীল নয়। সেখানে উঁচু মানের সাহিত্য রচনা হবে না।

এই চর্চা এদেশে আদৌ হচ্ছে কি? লেখককে প্রানে মেরে ফেলার হুমকি না দিয়ে এদেশের মানুষ কি তাদের লেখা পড়তে বা সমালোচনা শুনতে প্রস্তুত?

 

নোনতা দুঃখ

একটা শব্দ গত তিনদিন ধরে মাথার ভেতরে ঘুরছে। কোনভাবেই যাচ্ছে না। ঘুম থেকে উঠি আবার ফেরত আসে।

সাধারনত এরকম কিছু হলে আমার খুব অশান্তি লাগে। আমি তখন কাগজ কলম নিয়ে বসে পড়ি অথবা কীবোর্ডের সামনে বসে সেটাকে ঘষামাজা করি।

Out of favor, out of luck
I became the shadow in your dark.
Don't find me; don't ring me to say "hello."
Deep inside I became hollow
There is no pearl in my eyes, only salty sorrow.

 

না, আমি ইংরেজী কবিতা লিখছি না। ইংরেজী কবিতা লেখার জন্য ইংরেজী ভাষাটাকে যেভাবে অনুভব করা দরকার সেটা এখনও পারি না। যেকোন ভাষায় কবিতা লেখার জন্য সেই ভাষার দুঃখ আর কৌতুকগুলো ভাল করে হৃদয়ের মাঝে, মানে মগজে গেঁথে নিতে হয়। ইংরেজী জোকস বুঝতে পারলেও, তাদের দুঃখ আমি এখনও বুঝতে পারি না।

কবিরা শব্দের সবচেয়ে বড় জাদুকর হয়ে থাকেন। হয়ত কোন একদিন আমি বাংলা ভাষাতেও এইরকম জাদু দেখাতে পারব।

ওহ... যে শব্দটা মাথার ভেতরে ঘুরছিল সেটা হচ্ছে, "Salty Sorrow" - বাংলায় "নোনতা দুঃখ"। হুমায়ূনের ভাষায় বেদনার রঙ মনে হয় নীল। "নীল অপরাজিতা" নামে তার একটা বই আছে। আমার কাছে বেদনার কোন রঙ নেই, তবে স্বাদ আছে। সেটা চোখের পানির মত নোনতা। খুব আরাম করে গিলে খেয়ে ফেলা যায়।




না

কিছু মানুষ না শব্দটা শুনতে পারেন না। বা শুনেও না শোনার ভান করেন। বাচ্চার স্কুলে নিয়মিত যাওয়া-আসার সুবাধে কিছু মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। এরা মাঝে মধ্যে আমাকে অদ্ভুত কিছু অনুরোধ করেন। কারো পাসপোর্টের ফর্ম কিংবা ভিসার ফর্ম ফিলাপ করে দেয়া টাইপের। আমি প্রথম দিকে "তারা পারেন না" এই মর্মে করে দিতাম। ইদানিং দেখলাম, তারা নিজের কাজ বাদেও অন্যদের কাজও আমাকে দিয়ে করিয়ে নিতে চাচ্ছেন।

মূলত এইটা আমার কাজ না। আমি আমার প্রফেশন আর লেখালেখি নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত থাকি। এর মধ্যে বাচ্চাকে সময় দেয়া, রান্না করা, বাজার করা ইত্যাদি কাজও আমাকে করতে হয়। সেখানে অন্য কারো জন্য ভদ্রতার খাতিরে ফ্রি সময় বের করা আমার জন্য খুব কষ্টের।

তো একটা মাত্র উপায়, সেটা হচ্ছে না বলে দেয়া। এই "না" বলতে না পারলে আমাকে বেশ ভুগতে হয়। আবার কিছু মানুষকে না বলার পরও তারা বুঝতে পারেন না। অথবা বুঝতে চান না। 

শুধু আমি পারি বলেই যে কোন কাজ করতে আমি বাধ্য নই। তাই আমি এদের এড়িয়ে চলা শুরু করেছি। যে সময়টা আমি সোশ্যালাইজিং নামক একটা অদ্ভুত জিনিস করতাম সেটা এই মাস থেকে বাদ দিয়েছি। এখন সময় পেলেই আমি বাসায় বসে বই পড়ি অথবা নিজে নিজে একা ঘুরতে বের হই। 

যথেষ্ট নেটওয়ার্কিং হয়েছে, এবার থামতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটা কথা খুব প্রযোজ্য, বান্দরকে লাই দিলে সে মাথায় উঠে বসে। নতুন কারো সাথে পরিচিত হওয়াটা আমার কাছে এখন একটা আতংকের নাম।

আমার এক বন্ধু আমাকে একবার উপদেশ দিয়েছিল, যে কাজটা তুই ভালো পারিস সেটা কখনো ফ্রিতে করে দিবি না, বাঙ্গালিকে তো আরো বেশি করে না।

আমি নিভৃতচারী মানুষ, সেভাবেই থাকাটা আমার জন্য বাঞ্ছনীয়। আমি ফ্রিতে কারো কাছ থেকে কিছু আশা করি না, আমি চাই আমার কাজের সময় অন্যরাও আমাকে একইরকম ভাবে বিরক্ত না করুক।

প্রযুক্তির ব্যবহার যদি আপনি শিখতে না পারেন তবে ঝরে যাবেন। সামান্য কম্পিউটারের কাজ যেটা সবার জানার কথা এই যুগে এসে, সেটাও ঢাকা শহরের মত জায়গায় বসে অন্যকে দিয়ে করিয়ে নেয়ার মানে আপনি যুগের সাথে তাল মিলাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

আপনার জন্য সামনে আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।


বানিয়ালুলু - শিবব্রত বর্মন

মাঝে মধ্যে কিছু বই পড়লে হুট করে আমার ইউরোপিয়ান সাহিত্যের কথা মনে পড়ে যায়। ওদের গল্প বলার ঢঙটা আলাদা রকমের। বানিয়ালুলু নামের এই সায়েন্স ফিকশন অথবা ফ্যাণ্টাসি বই পড়ে আমার সেরকম একটা অনুভুতি হল। 

আমি পাঁড় সায়েন্স ফিকশন ভক্ত। সেটা মুভিই হোক আর বই। ব্ল্যাক মিররের মত সাইফাই ফ্যান্টাসি তাই আমাকে খুব নাড়া দিয়ে যায়। শিবব্রত বর্মনের বানিয়ালুলু অনেকটা সেরকম লাগতে পারে আপনার কাছে। গল্পগুলো একটা নির্দিষ্ট সীমায় বাঁধাটা কঠিন। কখনো মনে হবে পরাবাস্তুব আবার কখনো মনে হবে বিজ্ঞানের সীমার মাঝেই আছে।



অর্থহীন আলাপ

দেখব বলেই অনেক কিছু দেখা হয় না। ঘুমাই, খাই-দাই, আবার ঘুমাই। জীবনের সীমিত সময় চলে যায় আনন্দ উপকরণ জোগাড় করতে গিয়ে। এখন মেনে নিয়েছি যে অনেক কিছুই এই জীবনে করা হবে না। অনেক দেশই দেখা হবে না। আগে মনে হত সব করতে পারব। এখন দায়িত্বের ভারে মাথা নুয়ে আসে বারবার। যাদের এখনও বয়স অনেক কম তাদেরকে হিংসে হয়। তাদের দায়িত্বের বোঝা অনেকের থেকে কম।

আমার মত স্বাধীনতা অনেকের নাই, আবার আমার মত শেকলও কেউ পরে নাই। আমরা সবাই আলাদা। 

একজন আত্মীয় সেদিন আমাকে বললেন, তিনি ফেইসবুকে আমার লেখা পড়েছেন। আমি মুচকি হাসলাম। কোন লেখাটা জিজ্ঞেস করাতে আর বলতে পারেন নাই। এমনই হয়... হুট করে কিছু একটা পড়ে ভাল লাগে, কিন্তু তারপর আর মনে থাকে না। বর্তমান হচ্ছে "ইনফরমেশন ওভারলোডেড" এর সময়। তথ্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, এর যথেচ্ছা ব্যবহার হচ্ছে। তথ্য সন্ত্রাস ঘটছে প্রতিদিন। দিনকে রাত, আর সাদাকে কালো বানিয়ে দিতে পত্রিকা, ফেইসবুক আর টিভির জুড়ি মেলা ভার।

ফেইসবুকে আমি আমার লেখার নব্বই ভাগই শেয়ার করি না। এই জায়গাটা পঁচে গেছে। সস্তা কোমর দোলানো উলঙ্গ প্রজন্মের কাছে অর্থবহ লেখার কোন মানে নেই। নিজের জন্য তাই নিজেই একটা নোটবুক বানিয়ে নিয়েছি। এখানেই লিখি যত হাবিজাবি। যাদের একান্তই সময় আছে আমার মাথার ভেতরে উঁকি দেবার তারা এখানে এসেই আমার লেখা পড়বেন, দরকার হলে মন্তব্য করবেন। লেখালেখি কোন স্কুলের প্রতিযোগিতা নয় যে আমাকে সারাক্ষন সব কিছুতেই মতামত দিয়ে যেতে হবে। ফেইসবুক আর সোশ্যাল মিডিয়া হচ্ছে সবজান্তার জায়গা। সেখানে সবাই সবকিছু নিয়ে মতামত দেয়। আমার ভাল লাগে না। অনেক আগে যখন ফেইসবুক শুরু হয়েছিল তখন অনেক ব্যক্তিগত জিনিসই সেখানে শেয়ার করতাম। এখন আর করি না। অভিজ্ঞতা হয়েছে, চুল পেকে গেছে, আগের মত তারুন্য নেই। এখন বেশি পড়ি কম বলি।

রাজনীতি নিয়ে নিজের কিছু পর্যবেক্ষন আছে সেটাও এদেশে বলা যাবে না। সবাই চায় আপনি কোন না কোন দলকে বা মতকে সাপোর্ট করেন। মানুষ হিসেবে আমি সবার প্রতি ভদ্র আচরন করার চেষ্টা করি, কিন্তু সবার প্রতি বা সব মতের উপর আমার শ্রদ্ধা আছে, এটা আমি কোনদিন বলব না। 

আমি নিহিলিস্ট মানুষ, এটা অবশ্য অনেক পরে বুঝেছি। এই শব্দটার সাথেও পরিচিত ছিলাম না। জগতের বেশিরভাগ কাজই আমার কাছে অর্থহীন। সেই সাথে মনে হয় কিছুটা সেপিওস্যাক্সুয়ালও বটে। একারনেই অনেকের সাথে আমার জমে না। অযৌক্তিক কিছু দেখলেই ইচ্ছে করে কষে একটা চড় মেরে আসি। কিন্তু ক্ষমতা সীমিত, তাই নিজেকে নিবৃত্ত করি।

বাঙ্গালী হিসেবে জন্মেছি বলে আমার মাঝে আলাদা করে কোন অহংকার বা আবেগ কাজ করে না। বরঞ্চ পদে পদে ঝামেলায় জড়াতে হয় দেখে আফসোস হয় মাঝে মধ্যে। কুয়োর ব্যাঙ হতে পারলে ভালো হত। যারাই ভাল কিছু করতে চায়, তারা দেশ ছেড়ে ভেগে যায়। আমার সামর্থ্য থাকলে হয়ত আমিও  থাকতাম না এই নরকের মত শহরে।

এই শহরে নিজের একটা ছোট্ট আবাস করে নেয়ার চেষ্টায় এখনও পরিশ্রম করে যাচ্ছি, অথচ বয়স চলে যাচ্ছে। জগতের আনন্দের অনেক কিছুই দেখতে পারলাম না। আফসোস হয়। এখানে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, অথচ মানুষের লোভের শেষ নাই।

ঢাকার কোন জিনিসটা আমার কাছে বেশি খারাপ লাগে, এটা জানতে চাইল বলব - এখানে লোকেরা ভদ্রতাকে দূর্বলতা ভাবে। গালি দিয়ে নিজের শক্তি যাচাই করতে চায়।

দূরে চলে যেতে মন চায় মাঝে মাঝে, সবকিছু ছেড়ে দিয়ে অনেক দূরে।






সালতামামি ২০২৪

সূর্যের চারিদিকে একবার নিজের কক্ষপথ ভ্রমন করে আসলে এই গ্রহের মানুষেরা নববর্ষ উৎযাপন করে। ২০২৪ সাল চলে গিয়েছে, ২০২৫ এর দ্বিতীয় দিন আজ।

আমি গতবছরে এই সময়ে ছিলাম ভারতে। সেখানে ঢাকার আতশবাজি উৎসব দেখতে পারিনি। এবার দেখেছি, কিছুটা ভাল লেগেছে পরিচিত উন্মাদনা দেখে। মধ্যরাতের দশ মিনিট আগে শুরু হওয়া এই পটকাবাজি দেখে আপনি নিশ্চিত হয়ে যাবেন দেশের মানুষ এখনও খেতে পরতে পারছে। অহেতুক আনন্দ উল্লাস করছে।

আনন্দ সবসময়ই অর্থহীন। আমি একে কখনও খারাপ-ভালো কোন চোখে দেখি না। মানুষ যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী উৎসবে যোগ দেবে।

২০২৪ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ঘটনাবহুল একটা সময়। সরকার পতন এবং রাজনীতির গোলমেলে সময়ে, মানুষের ভাগ্য না বদলালেও, আমরা বদলে গেছি অনেক। একটা সত্য যে নানারকম ভাবে প্রকাশ করা যায়, এর যে ভিন্ন ভিন্ন চেহারা থাকতে পারে, তা এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস না পড়লে বুঝতে পারবেন না।

আমাদের গণতন্ত্র নাই, অথচ বুক ফুলিয়ে সব রাজনৈতিক দল এককভাবে এর দাবি করে। সবাই একই দাবি করে অথচ কেউ গণতন্ত্রের পথে হাঁটে না।

আমার নিজের জন্য এ বছরটা খুব একটা ভালো যায়নি। অর্থনৈতিক এবং পারিবারিক সবদিকেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। স্ত্রীর অসুস্থতা আর নিজের কাজে ফিরতে না পারা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানসিকভাবেও অনেকদূর পিছিয়ে গেছি। নতুন কোন গল্প লেখা হয়নি। কবিতারা মাঝে মধ্যে উঁকি দেয়।

দেশের ব্যপারে আমি যে খুব বেশি মাথা ঘামাই তাও নয়। ছাগলের তিন নম্বরের বাচ্চা হবার থেকে চুপচাপ সব দেখে যাওয়াটাই উত্তম। তবে ২০২৪ সালে আমি শিখেছি - রাজনীতিবিদেরা আসলে জনগনের থেকে বেশি বোঝেন না। তারা যেটা বোঝেন সেটা আবার সাধারণ জনগন বোঝে না এবং মানেও না।

Politics is more about influence, than ideal - আদর্শের থেকে প্রভাব বিস্তার করাটাই রাজনীতিতে মূখ্য। সাধারণ জনগন এই জিনিসটাই বোঝে না। তারা নিজেরা চোর হলেও একজন আদর্শবান নেতা চায়। তিনি হবেন ফেরেস্তার মত। মাঝে মধ্যে দুষ্টামির জন্য একটু আধটু শাস্তি দেবেন মাত্র।

এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মনে প্রানে সাম্প্রদায়িক। এরা ভোটের সময় চায় গনতান্ত্রিক পদ্ধতি আর শাসন ব্যবস্থা চায় খিলাফতের মত করে। 

ছাগলের কাছে কোয়ান্টাম ফিজিক্স ব্যাখ্যা করার মত করে দেশের টকশো ব্যবসায়ী চ্যানেল আর দেশীয়  বুদ্ধিজীবিরা প্রতিনিয়ত বকে যাচ্ছেন। পত্রিকায় আর কেউ নিউজ পড়ে না। বাঙালি আসলে পড়াশোনাটাই কম করে। এখন ইউটিউব আর ফেইসবুকে রাজনৈতিক বিশ্লেষন চলে। সেখান থেকেই আমরা বেছে নেই, কে ভালো আর কে খারাপ।

শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সবথেকে বড় রাজনৈতিক নেতা থাকলেও আওয়ামীলীগের বর্তমান ব্যর্থতার কারনে ডি-ফেইমের শিকার হচ্ছেন। এমনকি তার ৭ই মার্চের ভাষনকেও এখন অনেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা বলে মানতে নারাজ।

জিয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং শেখ মুজিবের হয়ে স্বাধীনতার সংগ্রামের ঘোষনা পাঠকারী হলেও পরবর্তীতে গণতন্ত্রের পথে হাঁটেননি। 

আমাদের বিগত প্রধানমন্ত্রী যিনি পিতার কথা বলে সবসময় কেঁদে বুক ভাসাতেন, তিনিও একসময় ভোটে কারচুপি করলেন। হয়ে গেলেন স্বৈরাচারী।

স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার আগেই যারা যুদ্ধ শুরু করেছিল ২৫ তারিখেই তারা হচ্ছে পুলিশ। পুলিশ পাক-আর্মির কাছে আত্মসমর্পন না করে বিদ্রোহী হয়ে যুদ্ধ করাটাকেই শ্রেয় মনে করেছিল। অথচ এরাও একসময় দেশের জনসাধারনের উপর গুলি চালিয়েছে।

মাঝেমধ্যে বর্তমান অতীতকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে।

এই জনপদে যেই নেতা হচ্ছে সেই পথভ্রষ্ট হচ্ছে। ক্ষমতার ধর্মই হচ্ছে তা নষ্ট হবে। এই কারনেই শাসনব্যবস্থা আর সংবিধানের এমন হওয়া দরকার যাতে কেউই খুব বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে না পারে।

২০২৪ বাংলাদেশের জন্য একটা দুঃসময়।

২০২৪ এ অনেক কিছু শিখেছি। 

শিখেছি, টাকা মানুষের সবথেকে বড় বন্ধু। টাকা দিয়ে তুমি এমন সব আনন্দ কিনতে পারবে যেটা সাধারনের দৃষ্টিতে অধরা অথবা হারাম। জগতের বেশিরভাগ সুখ আসলে পাপে।

- টাকা থাকলে তুমি তোমার সমস্যা সমাধান করতে না পারলেও আশেপাশের মানুষের সমস্যার সমাধান করতে পারবে।

- অতিরিক্ত অর্থ বলে কিছু নেই।

- ফাঁকা কলসি বাজে বেশি এবং গনতান্ত্রিক চোরেরা সবার থেকে বড় সাধু।

- এদেশের মেধাবীরা পড়াশোনার থেকে ক্ষমতা পাওয়াটাকে বেশি বড় করে দেখে। এজন্য দার্শনিক বা বৈজ্ঞানিক হবার থেকে তারা বিসিএস ক্যাডার অথবা রাজনৈতিক নেতা হওয়াটাকে প্রাধান্য দেয় বেশি। বিগত পঞ্চাশ বছরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সেটাই শিখিয়েছে এদের।

- ধর্ম শুধুমাত্র একটা নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা। এর এপিঠ ওপিঠ বলে কিছু নেই। তুলনা শুধুমাত্র দুইটা ধর্মের মাঝে হতে পারে। ধর্ম আর বিজ্ঞানের মাঝে তুলনা করে অর্বাচীন।

- পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানের কোন বিকল্প নেই।

- যে কোন ধরনেই জাতীয়তাবাদি চেতনাই সমাজ, দেশ এবং পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকর। 

- দান করলে তুমি বড়লোক হবে, এইটা একটা মিথ্যা প্রচারনা। 

২০২৪ সালে সব থেকে কঠিনভাবে উপলব্ধি করেছি, সুখে থাকতে গেলে তোমাকে স্বার্থপর হতে হবে। যে নিজে সুখি না, সে কোনভাবেই আরেকজনকে সুখে থাকতে দেবে না। এ ধরনের মানুষ অতি প্রিয়জন হলেও তাকে ত্যাগ করতে হয়।