পোস্টগুলি

নির্বাচন, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

২০২৬ এর সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। খোলা চোখে দেশের মানুষ বেশ উৎসাহ নিয়ে ভোট দিয়েছে এবছর। দীর্ঘ একটা সময় ধরে আওয়ামীলীগ সরকার দেশের মানুষের এই গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করতে দেয়নি। এবার উদ্দীপনাটা একটু বেশিই ছিল তাই সবার মাঝে।

যদিও শতভাগ ভোট কাস্টিং হয় না কোন নির্বাচনেই, এবারও হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রমতে প্রায় ৬০ ভাগ ভোট কাস্টিং হয়েছে। আওয়ামীলীগ এর একটা বিশাল অংশ ভোট দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। আর যারা ভোট দিয়েছে তাদের বেশিরভাগ বিএনপি-কে ভোট দিয়েছে।

এবারের ভোটে অন্যবারের থেকে আলাদা কারন, এই ভোটের সাথে গণভোট নামক আরেকটা জিনিস যোগ করা হয়েছে। এই গণভোটে প্রায় ৮৪ টির মত ধারা ছিল। এতে হ্যাঁ / না দিতে হয়েছে ভোটারকে।

আমার কাছে পুরো বিষয়টা একটা ছেলেখেলার মত লেগেছে। যারা গণভোট দিয়েছে তাদের বেশিরভাগ পুরো ৮৪টা পয়েন্ট সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। এতগুলো বিষয়ের উপর শুধুমাত্র হ্যাঁ এবং না'তে উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। 

সকল দল-মতের (Inclusive) অংশগ্রহণে যে নির্বাচনের আশা আমরা করেছিলাম সেটা না হলেও মোটামুটি মানের একটা নির্বাচন হয়েছে। গণতন্ত্র চলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে আবার চলা শুরু করেছে। গণতন্ত্র একটা চলমান প্রক্রিয়া। সেখানে ভোটাধিকার না থাকলে সাধারণের অংশগ্রহণ থাকে না। স্বৈরতন্ত্রের শুরুটা সেখান থেকেই হয় (আওয়ামীলীগ এর শেষের ১০ বছরের শাসনামল দ্রষ্টব্য)।

ইন্টেরিম বা প্রফেসর ইউনুসের এনজিও মডেলের সরকার আমাদের এখানে কাজ করেনি। ধর্মীয় মৌলবাদ আর মব ভায়োলেন্সে অতিষ্ঠ দেশবাসী তাই এই ভোট হয়ে যাওয়াটাকে স্বাগত জানিয়েছে। অল্প কিছু নির্বাচন বাদে নির্বাচনের স্বচ্ছতা কোনকালেই এই জনপদে ঘটেনি। ২০২৬ এর এই নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে। তবে আমি এই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি আবার শুরু হওয়ায় আনন্দিত।

জামায়েতে ইসলামি প্রকাশ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল না, ২০২৬ সালে এসেও তারা তাদের সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি। প্রকাশ্যে ৭১ কে অস্বীকার করা এবং ভুলভাল ইতিহাস বর্ননা করার জন্য তারা নতুন প্রজন্মের অনেককে রাস্তায় নাময়েছিল। শিক্ষিত (!) দেখতে ব্যারিস্টার ক্যাটাগরির কিছু লোককে তাদের প্রপাগন্ডার জন্য ব্যবহার করেছে। কিন্তু আদতে এতে হিতে বিপরীত হয়েছে। আওয়ামীলীগ বিহীন নির্বাচনে তারা বিরোধী দল হতে পেরেছে এটাই বড় কথা।

বাংলাদেশের জন্মের বিরোধীতাকারী একটা দল বাংলাদেশের সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে এটাই এদের সবচেয়ে বড় পাওয়া। জামায়েতের হাতধরে এদেশে গুপ্ত রাজনীতির উত্থান ঘটেছে। এরা আরেক দলের কর্মী হিসেবে যোগদান করে আত্মপ্রকাশ করে শিবির/জামায়েত হিসেবে। নিজেরা যে সকল সেক্যুলার কাজ করতে পারবে না ধর্মভিত্তিক দল হবার কারনে সেগুলো করার জন্য এনসিপি নামক দল এবং কিছু মহিলা স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ক্ষমতায় ভোটে আসতে পারবে না জেনে প্রচুর পরিমানে টাকা ব্যয় করেছে ভোট কেনার জন্য এবং অনেক জায়গায় টাকা সহ জামায়াতের লোকজন ধরা খেয়েছে।

অপ্রকাশ্য তথ্যমতে জামায়েতের আমীর শফিকুর রহমান নিজ আসনে জেতার জন্য প্রচুর ভোটার মাইগ্রেট করে নিজ এলাকায় এনেছিলেন। বিএনপি মূলত জিতে গেছে জামায়েতের এই সকল ৭১ বিরোধী এবং নারী বিদ্বেষী কর্মাকান্ডের জন্য। খুব অদ্ভুতভাবে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান হতে গিয়েও আবার থেমে গেছে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়ায়।

বুদ্দিজীবী মহল বিএনপি কে অকুণ্ঠ সমর্থন না দিলেও, দৃশ্যত জামায়েতকে ত্যাগ করেছে। 

কিছু নতুন শব্দ আমদানী করার চেষ্টা করা হয়েছে এই দেড় বছরে ইনসাফ, ইনকিলাব, আজাদী - ইত্যাদি। এমন না যে এই শব্দগুলো আমরা ব্যবহার করি না। কিন্তু জোর করে ভাষায় কোন কিছু ঢোকানো যায় না। এই শব্দগুলো আমরা ন্যায়, বিপ্লব, স্বাধীনতা - ইত্যাদি শব্দে প্রকাশ করতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করি। এইখানে একটা কালচারাল কনফ্লিক্ট ঘটানোর চেষ্টা চলেছে যেটা মাঠে মারা গেছে।

যেই জেনজিরা ৭১ এর ইতিহাস জানত না, এবার তারা সে সম্পর্কে কিছু হলেও জেনে গেছে। অদূর ভবিষ্যতে আমরা আবারও এই ধরনের বিপ্লব দেখব যদি না আমাদের সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করে আর ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করতে পারে।

 

 ( এই লেখাটায় আমি ২০২৬ এর নির্বাচন এবং তার পূর্ববর্তী অবস্থার কিছু ইতিহাস ধরে রাখার চেষ্টা করেছি মাত্র।) 

 

 

শবে বরাত এর স্মৃতি

শবে বরাতের দুই তিন দিন আগে থেকে আমাদের এলাকায় গোপনে সাজ সাজ রবে পড়ে যেত। তখন বুয়েট কোয়ার্টারে থাকতাম। এলাকার বড় ভাইয়েরা "মোররা" নামক একটা আতশবাজি বানাতো। এইটার মাথায় আগুনে দিলে সেটা রকেটের মত সামনের দিকে ছুটে যেত। এই মোররা আবার দুই প্রকার ছিল। একটা সাধারন আরেকটা অসাধারণ। অসাধারণ মোররা ছিল শক্তিশালী, আগুন দিলে উজ্জ্বল কমলা রঙের ফুলকি ছুটত। এর ট্রাভেল ডিস্টেন্স ছিল অনেক বেশি। একে আমরা ইলেক্ট্রিক মোররা বলে ডাকতাম।

মোররা বানাতে কি কি লাগত সেটা আমরা ছোটরা জানতাম না। আমরা নানারকম ফন্দিফিকির করলেও সেই কয়লা, গরুর ভুড়ির ঝিল্লি আর বারুদের পরিমান জানতাম না। আমরা আতশবাজি কিনে আনতাম চকবাজার থেকে। মাঝে মধ্যে ছোট ছোট পটকা। বড়রা যখন মোররা দিয়ে রাতের বেলা মারামারি করত আমরা সেটা উপভোগ করতাম।

মনে হয় এখনকার জেনারেশন এই আগুনের রকেটের কথা জানে না। আমি অন্তত অনেকদিন মোররা নামক জিনিসটা দেখিনি।

সবচেয়ে আনন্দের ছিল নামাজের নাম করে রাতে বাইরে থাকতে পারার ব্যপারটা। এশার পরে বাসায় গিয়ে ভরপেট গরুর মাংস দিয়ে ভাত বা রুটি ক্ষেয়েই নেমে পড়তাম হুল্লোড় করতে। একটা ছোটখাট গ্যাংয়ের মত তৈরি হয়ে যেত সে সময়।

আম্মু আর আব্বু বাসায় অনেক রাত জেগে নফল নামাজ আর কুরান পড়ত। রাতে ক্ষিদে লাগলে তাই বাসায় গিয়ে খেয়ে আবার নামতাম। এইরকম একটা স্বাধীনতা ওই বয়সে পাবার অপার্থিব একটা আনন্দ ছিল।

মসজিদে গিয়েও যে খুব একটা নামাজ পড়তাম সেটাও না। তবে সবাই মিলে আড্ডা আর ঘোরাঘুরি হত এলাকায় আর তার আশেপাশে। মাঝেমধ্যে হলের সামনে রাস্তায় আগুন জ্বালানো হত মাঝরাত্তিরের দিকে। এর তত্ত্বাবধানে অবশ্য একজন বড়ভাই উপস্থিত থাকত।


এই রাতজেগে থাকার একটা অবসম্ভাবী কারন ছিল পুরান ঢাকার দিকে যাবার জন্য। ফজরের সময় সেখানকার মসজিদগুলোতে তখন তবারক হিসেবে বিরিয়ানি দেয়া হত। আমরা কয়েকজন খুব চেষ্টা করতাম এক মসজিদ থেকে বিরিয়ানি নিয়ে আবার অন্য মসজিদে গিয়ে আরেক প্যাকেট নেয়ার জন্য। যদিও চেষ্টা সবসময় সফল হত না। কারন নামাজ প্রায় একই সময়ে শেষ হত। তবে বিরিয়ানি নিয়ে বাসায় ফিরে আসার মধ্যে একটা বিজয় ছিল।

পলাশী থেকে আজিমপুরের কবরস্থান পর্যন্ত পুরো রাস্তায় ফুটপাত জুড়ে তখন সিজনাল ফকিরেরা জায়গা দখল করে বসত। অনেক কিছু বদলে গেলেও এই ট্রেডিশন এখনও আছে সেটা গতকাল দেখলাম। কারন এই পথেই সবাই কবরস্থানে যায়।

গতকালই একজনের সাথে শবেবরাত নিয়ে কিঞ্চিত বাদানুবাদ করলাম। তার কথামতে এই রুটি-হালুয়া এইগুলা বিদাত। এইসব আনন্দ করা, রাস্তায় ঘোরাফেরা করা, কবরস্থানে যাওয়া এইগুলা করা যাবে না।

আমি অবশ্য অতশত মারপ্যাঁচে মানুষের উৎসব আটকে রাখতে চাইনা। ধর্ম এমনিতেই মানুষকে অনেক আনন্দ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সেখানে কিছু মানুষ যদি একদিন রাতে বের হয়ে ঢাকা শহরে ঘোরাঘুরি করে, খাদ্য দ্রব্য কেনে বা সবাই মিলে আড্ডা দেয় তবে আমি কোন সমস্যা দেখি না। সব কিছুতেই ধর্মের ব্যাকরণ আর নিয়ম মেনে চললে আমাদের রোবটের মত থাকতে হবে। আমি রোবটের মত জীবন-যাপনে রাজি না। যে কোন উৎসব দেখতেই ভাল লাগে।

শবে বরাতের বন্ধুরা আর নেই। জীবনের হাঁটে সওদা করতে গিয়ে সবাই হারিয়ে গেছে। কিন্তু স্মৃতিগুলো অম্লান আছে। নতুন প্রজন্ম যদি একটা দিনকে উৎসব বানিয়ে কিছু স্মৃতি বানাতে চায়, তবে করুক। একদিন এরাও বুড়ো হয়ে যাবে। অফিসের চেয়ারে হেলান দিয়ে ডুব দেবে স্মৃতির সাগরে আর ক্ষনেক্ষনে মুচকি হাসবে।

আহা কৈশোর!  

উদরপূর্তি

সকালটা খুব সুন্দর ছিল। কুয়াশা থাকলেও মেঘ ফুড়ে সূর্যের অল্প কিছু আলো গায়ে এসে লাগছে। বাতাসের কারনে অবশ্য ঠান্ডার পরিমান কমেনি। তাপমাত্রা প্রায় ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মত। লং-ড্রাইভে যাওয়ার মত চমৎকার একটা সময়।

আমি অবশ্য খুব বেশি দূরে যাই না। কন্যাকে স্কুলে দিয়ে স্টারে বসে সকালের নাস্তা সারি। এদের চিকেন স্যুপ, খাসির পায়া আর অল্প তেলে ভাজা পরোটা সকালবেলা খুবই উপাদেয় লাগে। সকালবেলা স্টারে লোকজন কম থাকে। কিছু কপোত-কপোতী আর আমার মত দূর্ভাগারা যাদের নাস্তা বানিয়ে দেবার কেউ নাই তারা এখানে খেতে আসে।

স্টারে নাস্তা খেতে ঘন্টা লাগিয়ে দিলেও কেউ কিছু বলে না। আর স্টারই একমাত্র চলনসই রেস্টুরেন্ট যেখানে ভাত-ডাল পাওয়া যায়। আরাম করে বসা যায় দুপুরবেলাতেও।

আমি ভোজন রসিক মানুষ। কেউ যদি একবেলা আমাকে সুস্বাদু খাবার খাওয়ায়, আমি কৃতজ্ঞ হয়ে যাই। নিজেও মাঝে মধ্যে টুকটাক রান্নার চেষ্টা করি। শুধু ডিমভাজা না, আমি ভাত, ডাল, মাংস সবই রান্না করতে পারি। বেঁচে থাকার তাগিদে শিখতে হয়েছে। সারভাইবাল স্কিলের মধ্যে রান্না শেখা সব মানুষের কর্তব্য বলে আমি মনে করি।

সেদিন ইউটিউব থেকে একটা নতুন ডিম ভাজার রেসিপি শিখলাম। 

একটা ডিম ছোট একটা বাটিতে নিতে হবে। বড় এক চামচ মেয়োনিজ সেটাতে যোগ করতে হবে। সল্টেড না হলে ভালো। অল্প একটু ঘি বা তেল সেটার সাথে নিয়ে ভালো করে মেশাতে হবে। এরপর বাটিটা ওভেনে ৪০ থেকে ৬০ সেকেন্ডের জন্য দিয়ে দিতে হবে।

ব্যাস তৈরি হয়ে যাবে অসাধারন এক অমলেট। প্রতিদিন কি আর সেই তেলেভাজা ডিম পোচ খেতে ভাল লাগে? আমি নিজে একবার এই রেসিপি ট্রাই করে দেখলাম। স্বাদ মন্দ না। হয়ত কিছু গ্রিন চিলি ছোট করে কেটে সাথে দিয়ে দিলে জিনিসটা স্পাইসি হোত।

রান্না হচ্ছে একটা ফিউশন আর্ট। একজনের রেসিপির সাথে আপনি নিজের মনের মত মশলা মেশাবেন। তাতে মাঝে মধ্যে স্বাদ বাড়বে, অথবা জিনিসটা অখাদ্য হবে। কিন্তু আপনাকে এক্সপেরিমেন্ট করতেই হবে। আমাদের জীবনটাও একই রকম। আরেকজনের রেসিপিতে আপনার চলবে না। নিজের বিচার-বুদ্ধিতে আপনাকে সেখানে মশলা মেশাতে হবে। নয়ত আপনি অন্যের মত করেই বেঁচে থাকবেন আজীবন।

এইখানে বলে রাখা ভালো, আমি জীবন থেকে একটা শিক্ষা পেয়েছি। সেটা হচ্ছে, বাসার খাবার যতই অখাদ্য হোক সেটাকে কখনো খারাপ বলা যাবে না। খাবারের বদলে বিষতো আর দিচ্ছে না! রেস্টুরেন্টের শেফ একজন প্রফেশনাল ব্যক্তি। তার হাতের কাজ আর সিজনাল শেফের কাজে তফাত থাকতেই পারে।

খাবারের কথায় আরেকটু বলি, আমি একা খেতে পছন্দ করি। এমনকি রেস্টুরেন্টেও আমি একা যেতে চাই। যদিও বেশিরভাগ সময়েই সেটা হয়ে ওঠে না। মূল কারন মনে হয়, আমি খাবার খাওয়ার সময় অহেতুক কথা বলা পছন্দ করি না সেটা। তবে সঙ্গী যদি বুদ্ধিমান হয় তবে আলোচনা চলতে পারে দর্শন, সাহিত্য কিংবা বিজ্ঞান নিয়ে। 

ভালো খাবারের মত, ভালো জ্ঞানও সহজে পাচ্য হয়। পৃথিবীর সবকিছু জানার দরকার নেই, সব বিষয়ে পন্ডিত হতে হয় না। আমি যখনই কারও সাথে নাস্তা করতে বসি তিনি রাজনৈতিক জ্ঞান কপচানো শুরু করেন যেটা আমার খুবই অপছন্দের। এই জ্ঞান আবার ফেইসবুক লব্ধ জ্ঞান। বিভিন্ন জনের মতামত থেকে সংগ্রহ করা। অনেকটা পাঁচমিশালি আঁচারের মত। সবার তৈরি আঁচার খেতে ভালো হয় না। মশলার অনুপাত সবাই বোঝে না।

খাবার সময় তাই কম কথা বলাই ভালো।

জুলাই - আবু সাঈদ - মুগ্ধ - হাদি

আধুনিক মানুষের সকল কাজকর্মই অর্থনৈতিক। স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশে বারবার বিপ্লব হয়না। বাংলাদেশে বিগত সময়ে যত উন্নতিই হোক না কেন, অর্থনৈতিক ভাবে দেশের মানুষ সুখী ছিলনা বলেই বিপ্লব হয়েছে। এবং আবারও হবে।

রাজনীতিতে আপনি লোকজনকে তখনই বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাতে পারবেন যখন সে মনে করবে বর্তমান অবস্থানে সে সুখী নেই। বাংলাদেশের মানুষ সুখী নয়। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি অসুখী। এরা ২০২৪ এর সরকার পতনের পর এখনও বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে। যদিও দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখন আর ছাত্রদের তৈরি দলের উপর আর আস্থা রাখছে না। মূল কারন হয়ত দেশের পুরনো সকল প্রথা, পদ্ধতি এবং ইন্সটিটিউশনের বিরুদ্ধে কথা বলা। 

অনভিজ্ঞ হাতে দেশ চালানো যায় না। অবধারিতভাবে ছাত্ররা ভূল করবে, তাদের ভুল পথে চালিত করা হবে এবং দেশে পুলিশিং এর যে অবস্থা বর্তমানে ছাত্রদের অবস্থাও সেরকম হবে।

মাঝখান থেকে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত লাফালাফির কারনে এদের বড় একটা অংশ পড়াশোনা এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দুটোই হারাবে।

জুলাইয়ের আন্দোলনের পর বেশ কয়েকজনকে দেশজুড়ে হিরো বানানো হয়েছে। আবু সাঈদ তাদের প্রথমজন, মুগ্ধ দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ হচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চের হাদি।

লাশের রাজনীতির বলি হয়ে এরা এখন অনেকের জন্য নমস্য। কিন্তু ইতিহাস এদের মনে রাখবে কিনা সেটা বড় একটা প্রশ্ন হয়ে গেছে। হাদির মুখের ভাষা রাজনৈতিক নেতার মত ছিল না। গালাগালি এবং চিৎকার দিয়ে জনসম্মুখে তিনি কি প্রমান করতে চাইতেন সেটা জানি না। আমি যৌক্তিক কথা না শুনলে বা যুক্তিতর্কের ধার না যাচাই করতে পারলে কাউকে বড় নেতা বলে মানতে রাজি না। তার দর্শনের সাথেও আমি একমত হই না।

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, প্রায় দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে, মসজিদ থেকে ফেরার সময় রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকায় হাদি গুলিবিদ্ধ হন। 

২০২৪ এর জুলাইয়ের পরে হাদিকে চিনতাম না, খুব একটা মিডিয়াতেও দেখিনি। ২০২৫ এ তাকে হিরো বানিয়ে এবং পরে হত্যার পর তাকে প্রচুর মিডিয়া কাভারেজ দেয়া হচ্ছে। ঘটনাগুলোর পরম্পরা দেখলে মনে হবে কিছুদিন পর পর একজন করে মানুষকে তারা শহীদ বানানোর ধান্ধায় থাকেন। এরপর শুরু হয় তাকে নিয়ে রাজনীতি আর রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন।

শাহবাগ জায়গাটাকে মোটামুটি ভাবে পঁচিয়ে ফেলা হয়েছে। আওয়ামীলীগ আমলে গণজাগরণ মঞ্চের পর, মৌলবাদীরা এ জায়গাটাকে নিয়ে প্রচুর উপহাস করলেও বর্তমানে শাহবাগ হয়ে গেছে আন্দোলনের তীর্থভূমি। সম্প্রতি এটাকে হাদি চত্বর নাম দেয়া হয়েছে। কয়দিন আগে অবশ্য অন্য নাম ছিল। সে যাই হোক, শাহবাগ আগের জায়গাতেই আছে। মানব সন্তানদের লম্ফঝম্পে তার কিছুই যায় আসে না।

যখনই কোন প্রতিবাদের দরকার পড়ে, তখনই আমরা জানি শাহবাগ বন্ধ হবে আর আশেপাশের তিনটা হাসপাতালের রোগীদের অবস্থা খারাপ হবে এবং শহরবাসী বিশেষ করে পুরান ঢাকাবাসী সেদিন কষ্ট করবে।

 

ডানপন্থীরা একসময় শাহবাগ আন্দোলনকে নিয়ে প্রচুর গালিগালাজ করেছে। এখনও করে তবে পরিমানে কম, কারন এখন তারা নিজেরাই সেখানে বসে থাকে আন্দোলন করার জন্য। শাহবাগে ছেলেমেয়ে একসাথে আন্দোলনরত ছিল বলে মেয়েদের নিয়ে প্রচুর রং-তামাসার কথা তারা ছড়িয়েছিল সেসময়। নিয়তির কি পরিহাস, তারাও এখন রাতজেগে বা ঘুমিয়ে শাহবাগে কাটিয়ে দেয়।

কেউ যদি বলে বাংলাদেশে ডানপন্থী রাজনীতি নাই তবে সে ভুলের রাজ্যে আছে। এখানে চরম ডানপন্থার উত্থান হতে পারেনি কারন বাংলাদেশের একটা শক্ত সাংস্কৃতিক ইতিহাস আছে। ডানেরা কখনো এই বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে আপন করে নিতে পারেনি। মৌলবাদের উত্থানের জন্য তাই তাদের রমনা বটমূলে বোমাবাজি করতে হয়, ভয়ে যেন লোকজন পরের বছর থেকে এই সব অনুষ্ঠানে আর না যায়। উদীচী, ছায়ানটে হামলা এবং অগ্নি সংযোগ করা হয়েছে ২০২৫ সালে এসে। নাটকের মঞ্চে হামলা হয়েছে, শিল্পীকে গান গাইতে বাধা দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়, বাউল ধরে পেটানো হচ্ছে, মাজারগুলো ভেঙে দেয়া হয়েছে - ইত্যাদি নানা কিছু করার একটাই কারন, জাতিকে সংস্কৃতি থেকে সরিয়ে দেয়া।

ভারত বিরোধিতার ব্যাপারটা অনেক সময় অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায় ডানপন্থীদের কারনে। এক ফেলানীকে যে রকম হাইলাইট করা হয় রাজনৈতিক কারনে, দেশের ভেতরে এদের কারনে হয়ে যাওয়া খুন আর অগ্নিসংযোগ ততটা গুরুত্ব পায় না। রাজনৈতিক আন্দোলন করতে ইস্যু দরকার হয়। এরা ইস্যু তৈরি করে, তারপর আন্দোলন করে।

মধ্যমপন্থী দল হিসেবে বিএনপির সুনাম থাকলেও, বিগত দিনে জামাতের সাথে মিলে তাদের জোট করাকে অনেকেই ভাল চোখে দেখেনি। আর এবার জামাতের সাথে জোট ভাঙ্গাকে ডানপন্থীরা ভাল চোখে দেখছে না। আওয়ামীলীগ সেকুল্যার দল হিসেবে পরিচিত থেকেও তারা ডানপন্থীদের তোষন করেছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এবং তাদের পতনের পর এই মৌলবাদীরা দেশ জুড়ে ক্ষমতার তান্ডব দেখাচ্ছে। এদেরকে দুধ-কলা দিয়ে পুষে আওয়ামীলীগ দেশের এই একটা ক্ষতি অন্তত করে গেছে দীর্ঘ মেয়াদে।

আমি এখনও পর্যন্ত এদেশে এমন একটা রাজনৈতিক দল দেখিনি যারা জোর গলায় বলবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এখানে সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। রাজনীতি করতে হবে যুক্তি আর তর্ক দিয়ে, আবেগ আর লোভ থেকে নয়। ২০২৫ বিদায় নিচ্ছে, সামনে ভোট হবার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বাংলাদেশ বসে আছে জ্বলন্ত উনুনের উপর।

গণতন্ত্র সবচেয়ে আরাধ্য শাসন ব্যবস্থা হলেও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য এটি হিতে বিপরীত হয়। কারন একজন যোগ্য শাসক নির্বাচনের প্রক্রিয়াটাই এদেশের জনগণ জানে না। এখানে যে বেশি চিল্লায় আর মাঠ গরম রাখতে পারে সেই ভোটে নির্বাচিত হয়। যিনি সবচেয়ে দক্ষ বা যৌক্তিক তাকে রাখা হয় খেলার বাইরে। 

২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
ঢাকা, বাংলাদেশ । 

The Wind of Change - হাওয়া বদল

সকল সাম্রাজ্যের একদিন শেষ হবে। ক্ষমতার পালাবদল হবে। 

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে দীর্ঘ পনের বছর পর। আওয়ামীলীগ আর ক্ষমতায় নেই। কিন্তু এখন দেশ কারা চালাচ্ছে সেটা বোঝাটা খুব দূরহ হয়ে গেছে। জামায়াত নাকি বিএনিপি - কে আসবে ক্ষমতায় এটা নিয়ে চলছে বিতর্ক। টকশোগুলোতে গরম গরম বক্তৃতা রেখে যাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ক্ষমতার অত গহীনের মারপ্যাঁচ বোঝাটা সাধারণের জন্য খুব কষ্টের।

ক্ষমতার শূন্যস্থান তৈরি হলে সেখানে সবসময়ই উগ্রবাদ স্থান নেয়। বাংলাদেশের বর্তমান সংবাদগুলো দেখলে অন্তত তাই মনে হচ্ছে। মাজার পোড়ানো হয়েছে, মেয়েদের ফুটবল খেলায় বাধা দেয়া হয়েছে, বাউলদের ধরে পেটানো হচ্ছে, বিরোধী মতের কাউকে পেলে জবাই করে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছে। একটা সভ্য সমাজ বলতে আদতে যা বোঝায় সেটার কোন অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না।

কারো কথা ভালো লাগে না বলে তাকে স্বৈরাচার বলার একটা ট্রেন্ড চালু হয়েছে। মোদ্দা কথা চরম ডানপন্থার উত্থানের যা যা উপসর্গ তার সবকিছুই বর্তমান বাংলাদেশে বিদ্যমান।

ধর্মের নামে কারা অধর্ম চালায় সবাই তা জানে। কিন্তু মুখ ফুটে বলে না। কারন বাকস্বাধীনতার থেকে জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। ধর্ম-ছাগলদের রোখার তাই কেউ নাই। এরা বিভিন্ন দলে ভাগে হয়ে একসময় সবাইকে আক্রমন করে বসবে।  হয়ত এমন একদিন আসবে যেদিন ছবি আকাঁর জন্য বা কবিতা লেখার জন্যও ধরে ধরে সবাইকে পেটানো হবে।

ওহ... আমি মনে হয় ভুল বললাম। লেখালেখির জন্য ইতিমধ্যেই এদেশে অনেকের জীবন গেছে, বাকিরা পালিয়ে বেঁচেছে। এদেশেই কবিতা লেখার জন্য দেশান্তরি হতে হয়েছে কবিকে, ধার্মিকের কোপ খেতে হয়েছে। ছবি আঁকার জন্য কার্টুনিস্ট জেলে গেছে।

ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি করবে, কিন্তু এদেশের শাসকেরা সেখান থেকে শিখবে না। জ্ঞানের পরিচর্যা না করে যেখানে অন্ধবিশ্বাসকে তোষন করা হয় - সেখান থেকে বড় বড় বিপ্লবী তৈরি হবে, বিজ্ঞানী নয়। 

হয়ত তিরিশ বছর পরে এই সময়টার কথা যখন কেউ পড়বে সে ভাববে দেশে তখন খুব বড় একটা সংস্কার  চলছিল। ব্যপারটা আসলে সেটাও নয়। একটা গোলমাল চলছে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ঠিক করা নিয়ে, কিন্তু আমি খুব আশাবাদী যে সত্য একদিন জিতে যাবে। সত্য খুব কঠিন আর অপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু আপনাকে শেষ পর্যন্ত তার দ্বারস্থ হতেই হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় - ১৯৭১ কে মুছে ফেলার একটা আপ্রান চেষ্টা চলছে জেনজি প্রজন্মের হাত ধরে। ইতিহাস মুছে ফেলা না গেলেও তাকে বিকৃত করা বা তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ২০২৪ কে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। এ চেষ্টা নতুন নয়। যদিও এটা সফল হবে না। 

অশিক্ষিতের দেশে গণতন্ত্র সবসময় একটা দূর্বল শাসন ব্যবস্থা। সেই দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে সবাই বাংলাদেশকে নিয়ে খেলছে। কে যে আসল বন্ধু সেটা চেনাটাই দুষ্কর। তবুও আমাদের গণতন্ত্র আকঁড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে, খেলাফত, স্বৈরতন্ত্র কিংবা রাজতন্ত্র নয়।

আশা রাখি একদিন আবার বাউলের দেশে একতারা কথা বলবে। লালন বা নজরুলকে কেউ রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে দাঁড় করাবে না। মানুষ যুক্তি আর বিশ্লেষণের পথে হাঁটবে।

 

২৫ নভেম্বর, ২০২৫
ঢাকা ।

 

 

ক্ষমতা

ক্ষমতা হচ্ছে দায়িত্বের মত। আপনি যখনই ক্ষমতা পেয়ে তার অপব্যবহার করবেন, এটা কবর পর্যন্ত আপনাকে তাড়া করবে।

 


আমাদের কৈশোরের স্রষ্টার মৃত্যু

রকিব হাসান মারা গেছেন। আমাদের কৈশোরে তার ছবি দেখে আমরা তাকে চিনতাম না। তিন গোয়েন্দার বইয়ে শুধু তার নাম থাকত। নব্বই দশকের কয়েকটা প্রজন্মের কাছে তার নামটাই একটা কাল্টের মত ছিল। রকিব হাসানের নামেই যে কোন বই চলত।

২০২২ এ মারা গেলেন কাজী আনোয়ার হোসেন, তার একবছর আগে শেখ আবদুল হাকিম আর এখন রকিব হাসান। কয়েক প্রজন্মকে যারা বইপড়া শিখিয়েছিলেন তারা একে একে চলে গেছেন। আমাদের কৈশোরের সুপারহিরোরা সবাই অতীত হয়ে গেছেন। মূলত মধ্যবিত্ত বাঙালী বলতে আমরা যাদের বুঝি তাদের মানসিক বিকাশে এই তিনজনের অবদান অসীম। আমরা এখন মধ্য বয়সে আছি। আমাদের বয়স এখন চল্লিশ বা তার বেশি। বিয়ে-থা করে সবাই থিতু হয়েছে নিরামিষ জীবনে। কিন্তু যতদিন আমরা বেঁচে থাকব আর এই নামগুলো শুনব, আমরা ফিরে যাব রঙিন কৈশোরে।

আমি রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল চেনার আগে এদের চিনেছিলাম। তিন গোয়েন্দার কাল্পনিক অভিযানে কতবার নিজেকে কল্পনা করে হারিয়ে গিয়েছিলাম লস এঞ্জেলস রকি বিচে। মাসুদ রানার সাথে ঘুরে বেড়িয়েছি পৃথিবী। বুনো পশ্চিমে চালিয়েছিলাম ঘোড়া।

আমাদের সময় ইন্টারনেট ছিলো না। তথ্যের অবাধ প্রবাহ ছিলনা বলে আমাদের মনযোগ বিক্ষিপ্ত ভাবে সবকিছুতে ছড়িয়ে পড়ত না। আমাদের মনোরঞ্জনের প্রধান মাধ্যম ছিল বই। উত্তেজনা আর কল্পনার মিশেলে গড়া একটা অদ্ভুত দুনিয়া।

বর্তমানের কিশোরেরা যাদের টিকটকে নাচানাচি আর রেস্টুরেন্টে ঘুরে বেড়ানোটা নেশা, তারা আমাদের এই আবেগ বুঝতে পারবে না।

মানুষ জন্মায় আবার মরে যায়, কিন্তু কজন মানুষ ইতিহাসের অংশ হতে পারে? রকিব হাসান আপনি ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবেন। স্রষ্টার মৃত্যু হয় বারবার কিন্তু তার সৃষ্টির মাঝেই তিনি বেঁচে ওঠেন আবার।