শবে বরাত এর স্মৃতি
শবে বরাতের দুই তিন দিন আগে থেকে আমাদের এলাকায় গোপনে সাজ সাজ রবে পড়ে যেত। তখন বুয়েট কোয়ার্টারে থাকতাম। এলাকার বড় ভাইয়েরা "মোররা" নামক একটা আতশবাজি বানাতো। এইটার মাথায় আগুনে দিলে সেটা রকেটের মত সামনের দিকে ছুটে যেত। এই মোররা আবার দুই প্রকার ছিল। একটা সাধারন আরেকটা অসাধারণ। অসাধারণ মোররা ছিল শক্তিশালী, আগুন দিলে উজ্জ্বল কমলা রঙের ফুলকি ছুটত। এর ট্রাভেল ডিস্টেন্স ছিল অনেক বেশি। একে আমরা ইলেক্ট্রিক মোররা বলে ডাকতাম।
মোররা বানাতে কি কি লাগত সেটা আমরা ছোটরা জানতাম না। আমরা নানারকম ফন্দিফিকির করলেও সেই কয়লা, গরুর ভুড়ির ঝিল্লি আর বারুদের পরিমান জানতাম না। আমরা আতশবাজি কিনে আনতাম চকবাজার থেকে। মাঝে মধ্যে ছোট ছোট পটকা। বড়রা যখন মোররা দিয়ে রাতের বেলা মারমারি করত আমরা সেটা উপভোগ করতাম।
মনে হয় এখনকার জেনারেশন এই আগুনের রকেটের কথা জানে না। আমি অন্তত অনেকদিন মোররা নামক জিনিসটা দেখিনি।
সবচেয়ে আনন্দের ছিল নামাজের নাম করে রাতে বাইরে থাকতে পারার ব্যপারটা। এশার পরে বাসায় গিয়ে ভরপেট গরুর মাংস দিয়ে ভাত বা রুটি ক্ষেয়েই নেমে পড়তাম হুল্লোড় করতে। একটা ছোটখাট গ্যাংয়ের মত তৈরি হয়ে যেত সে সময়।
আম্মু আর আব্বু বাসায় অনেক রাত জেগে নফল নামাজ আর কুরান পড়ত। রাতে ক্ষিদে লাগলে তাই বাসায় গিয়ে খেয়ে আবার নামতাম। এইরকম একটা স্বাধীনতা ওই বয়সে পাবার অপার্থিব একটা আনন্দ ছিল।
মসজিদে গিয়েও যে খুব একটা নামাজ পড়তাম সেটাও না। তবে সবাই মিলে আড্ডা আর ঘোরাঘুরি হত এলাকায় আর তার আশেপাশে। মাঝেমধ্যে হলের সামনে রাস্তায় আগুন জ্বালানো হত মাঝরাত্তিরের দিকে। এর তত্ত্বাবধানে অবশ্য একজন বড়ভাই উপস্থিত থাকত।

এই রাতজেগে থাকার একটা অবসম্ভাবী কারন ছিল পুরান ঢাকার দিকে যাবার জন্য। ফজরের সময় সেখানকার মসজিদগুলোতে তখন তবারক হিসেবে বিরিয়ানি দেয়া হত। আমরা কয়েকজন খুব চেষ্টা করতাম এক মসজিদ থেকে বিরিয়ানি নিয়ে আবার অন্য মসজিদে গিয়ে আরেক প্যাকেট নেয়ার জন্য। যদিও চেষ্টা সবসময় সফল হত না। কারন নামাজ প্রায় একই সময়ে শেষ হত। তবে বিরিয়ানি নিয়ে বাসায় ফিরে আসার মধ্যে একটা বিজয় ছিল।
পলাশী থেকে আজিমপুরের কবরস্থান পর্যন্ত পুরো রাস্তায় ফুটপাত জুড়ে তখন সিজনাল ফকিরেরা জায়গা দখল করে বসত। অনেক কিছু বদলে গেলেও এই ট্রেডিশন এখনও আছে সেটা গতকাল দেখলাম। কারন এই পথেই সবাই কবরস্থানে যায়।
গতকালই একজনের সাথে শবেবরাত নিয়ে কিঞ্চিত বাদানুবাদ করলাম। তার কথামতে এই রুটি-হালুয়া এইগুলা বিদাত। এইসব আনন্দ করা, রাস্তায় ঘোরাফেরা করা, কবরস্থানে যাওয়া এইগুলা করা যাবে না।
আমি অবশ্য অতশত মারপ্যাঁচে মানুষের উৎসব আটকে রাখতে চাইনা। ধর্ম এমনিতেই মানুষকে অনেক আনন্দ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সেখানে কিছু মানুষ যদি একদিন রাতে বের হয়ে ঢাকা শহরে ঘোরাঘুরি করে, খাদ্য দ্রব্য কেনে বা সবাই মিলে আড্ডা দেয় তবে আমি কোন সমস্যা দেখি না। সব কিছুতেই ধর্মের ব্যাকরণ আর নিয়ম মেনে চললে আমাদের রোবটের মত থাকতে হবে। আমি রোবটের মত জীবন-যাপনে রাজি না। যে কোন উৎসব দেখতেই ভাল লাগে।
শবে বরাতের বন্ধুরা আর নেই। জীবনের হাঁটে সওদা করতে গিয়ে সবাই হারিয়ে গেছে। কিন্তু স্মৃতিগুলো অম্লান আছে। নতুন প্রজন্ম যদি একটা দিনকে উৎসব বানিয়ে কিছু স্মৃতি বানাতে চায়, তবে করুক। একদিন এরাও বুড়ো হয়ে যাবে। অফিসের চেয়ারে হেলান দিয়ে ডুব দেবে স্মৃতির সাগরে আর ক্ষনেক্ষনে মুচকি হাসবে।
আহা কৈশোর!



