জুলাই - আবু সাঈদ - মুগ্ধ - হাদি
আধুনিক মানুষের সকল কাজকর্মই অর্থনৈতিক। স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশে বারবার বিপ্লব হয়না। বাংলাদেশে বিগত সময়ে যত উন্নতিই হোক না কেন, অর্থনৈতিক ভাবে দেশের মানুষ সুখী ছিলনা বলেই বিপ্লব হয়েছে। এবং আবারও হবে।
রাজনীতিতে আপনি লোকজনকে তখনই বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাতে পারবেন যখন সে মনে করবে বর্তমান অবস্থানে সে সুখী নেই। বাংলাদেশের মানুষ সুখী নয়। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি অসুখী। এরা ২০২৪ এর সরকার পতনের পর এখনও বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে। যদিও দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখন আর ছাত্রদের তৈরি দলের উপর আর আস্থা রাখছে না। মূল কারন হয়ত দেশের পুরনো সকল প্রথা, পদ্ধতি এবং ইন্সটিটিউশনের বিরুদ্ধে কথা বলা।
অনভিজ্ঞ হাতে দেশ চালানো যায় না। অবধারিতভাবে ছাত্ররা ভূল করবে, তাদের ভুল পথে চালিত করা হবে এবং দেশে পুলিশিং এর যে অবস্থা বর্তমানে ছাত্রদের অবস্থাও সেরকম হবে।
মাঝখান থেকে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত লাফালাফির কারনে এদের বড় একটা অংশ পড়াশোনা এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দুটোই হারাবে।
জুলাইয়ের আন্দোলনের পর বেশ কয়েকজনকে দেশজুড়ে হিরো বানানো হয়েছে। আবু সাঈদ তাদের প্রথমজন, মুগ্ধ দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ হচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চের হাদি।
লাশের রাজনীতির বলি হয়ে এরা এখন অনেকের জন্য নমস্য। কিন্তু ইতিহাস এদের মনে রাখবে কিনা সেটা বড় একটা প্রশ্ন হয়ে গেছে। হাদির মুখের ভাষা রাজনৈতিক নেতার মত ছিল না। গালাগালি এবং চিৎকার দিয়ে জনসম্মুখে তিনি কি প্রমান করতে চাইতেন সেটা জানি না। আমি যৌক্তিক কথা না শুনলে বা যুক্তিতর্কের ধার না যাচাই করতে পারলে কাউকে বড় নেতা বলে মানতে রাজি না। তার দর্শনের সাথেও আমি একমত হই না।
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, প্রায় দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে, মসজিদ থেকে ফেরার সময় রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকায় হাদি গুলিবিদ্ধ হন।
২০২৪ এর জুলাইয়ের পরে হাদিকে চিনতাম না, খুব একটা মিডিয়াতেও দেখিনি। ২০২৫ এ তাকে হিরো বানিয়ে এবং পরে হত্যার পর তাকে প্রচুর মিডিয়া কাভারেজ দেয়া হচ্ছে। ঘটনাগুলোর পরম্পরা দেখলে মনে হবে কিছুদিন পর পর একজন করে মানুষকে তারা শহীদ বানানোর ধান্ধায় থাকেন। এরপর শুরু হয় তাকে নিয়ে রাজনীতি আর রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন।
শাহবাগ জায়গাটাকে মোটামুটি ভাবে পঁচিয়ে ফেলা হয়েছে। আওয়ামীলীগ আমলে গণজাগরণ মঞ্চের পর, মৌলবাদীরা এ জায়গাটাকে নিয়ে প্রচুর উপহাস করলেও বর্তমানে শাহবাগ হয়ে গেছে আন্দোলনের তীর্থভূমি। সম্প্রতি এটাকে হাদি চত্বর নাম দেয়া হয়েছে। কয়দিন আগে অবশ্য অন্য নাম ছিল। সে যাই হোক, শাহবাগ আগের জায়গাতেই আছে। মানব সন্তানদের লম্ফঝম্পে তার কিছুই যায় আসে না।
যখনই কোন প্রতিবাদের দরকার পড়ে, তখনই আমরা জানি শাহবাগ বন্ধ হবে আর আশেপাশের তিনটা হাসপাতালের রোগীদের অবস্থা খারাপ হবে এবং শহরবাসী বিশেষ করে পুরান ঢাকাবাসী সেদিন কষ্ট করবে।

ডানপন্থীরা একসময় শাহবাগ আন্দোলনকে নিয়ে প্রচুর গালিগালাজ করেছে। এখনও করে তবে পরিমানে কম, কারন এখন তারা নিজেরাই সেখানে বসে থাকে আন্দোলন করার জন্য। শাহবাগে ছেলেমেয়ে একসাথে আন্দোলনরত ছিল বলে মেয়েদের নিয়ে প্রচুর রং-তামাসার কথা তারা ছড়িয়েছিল সেসময়। নিয়তির কি পরিহাস, তারাও এখন রাতজেগে বা ঘুমিয়ে শাহবাগে কাটিয়ে দেয়।
কেউ যদি বলে বাংলাদেশে ডানপন্থী রাজনীতি নাই তবে সে ভুলের রাজ্যে আছে। এখানে চরম ডানপন্থার উত্থান হতে পারেনি কারন বাংলাদেশের একটা শক্ত সাংস্কৃতিক ইতিহাস আছে। ডানেরা কখনো এই বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে আপন করে নিতে পারেনি। মৌলবাদের উত্থানের জন্য তাই তাদের রমনা বটমূলে বোমাবাজি করতে হয়, ভয়ে যেন লোকজন পরের বছর থেকে এই সব অনুষ্ঠানে আর না যায়। উদীচী, ছায়ানটে হামলা এবং অগ্নি সংযোগ করা হয়েছে ২০২৫ সালে এসে। নাটকের মঞ্চে হামলা হয়েছে, শিল্পীকে গান গাইতে বাধা দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়, বাউল ধরে পেটানো হচ্ছে, মাজারগুলো ভেঙে দেয়া হয়েছে - ইত্যাদি নানা কিছু করার একটাই কারন, জাতিকে সংস্কৃতি থেকে সরিয়ে দেয়া।
ভারত বিরোধিতার ব্যাপারটা অনেক সময় অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায় ডানপন্থীদের কারনে। এক ফেলানীকে যে রকম হাইলাইট করা হয় রাজনৈতিক কারনে, দেশের ভেতরে এদের কারনে হয়ে যাওয়া খুন আর অগ্নিসংযোগ ততটা গুরুত্ব পায় না। রাজনৈতিক আন্দোলন করতে ইস্যু দরকার হয়। এরা ইস্যু তৈরি করে, তারপর আন্দোলন করে।
মধ্যমপন্থী দল হিসেবে বিএনপির সুনাম থাকলেও, বিগত দিনে জামাতের সাথে মিলে তাদের জোট করাকে অনেকেই ভাল চোখে দেখেনি। আর এবার জামাতের সাথে জোট ভাঙ্গাকে ডানপন্থীরা ভাল চোখে দেখছে না। আওয়ামীলীগ সেকুল্যার দল হিসেবে পরিচিত থেকেও তারা ডানপন্থীদের তোষন করেছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এবং তাদের পতনের পর এই মৌলবাদীরা দেশ জুড়ে ক্ষমতার তান্ডব দেখাচ্ছে। এদেরকে দুধ-কলা দিয়ে পুষে আওয়ামীলীগ দেশের এই একটা ক্ষতি অন্তত করে গেছে দীর্ঘ মেয়াদে।
আমি এখনও পর্যন্ত এদেশে এমন একটা রাজনৈতিক দল দেখিনি যারা জোর গলায় বলবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এখানে সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। রাজনীতি করতে হবে যুক্তি আর তর্ক দিয়ে, আবেগ আর লোভ থেকে নয়। ২০২৫ বিদায় নিচ্ছে, সামনে ভোট হবার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বাংলাদেশ বসে আছে জ্বলন্ত উনুনের উপর।
গণতন্ত্র সবচেয়ে আরাধ্য শাসন ব্যবস্থা হলেও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য এটি হিতে বিপরীত হয়। কারন একজন যোগ্য শাসক নির্বাচনের প্রক্রিয়াটাই এদেশের জনগণ জানে না। এখানে যে বেশি চিল্লায় আর মাঠ গরম রাখতে পারে সেই ভোটে নির্বাচিত হয়। যিনি সবচেয়ে দক্ষ বা যৌক্তিক তাকে রাখা হয় খেলার বাইরে।
২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
ঢাকা, বাংলাদেশ ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন