নির্বাচন, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
২০২৬ এর সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। খোলা চোখে দেশের মানুষ বেশ উৎসাহ নিয়ে ভোট দিয়েছে এবছর। দীর্ঘ একটা সময় ধরে আওয়ামীলীগ সরকার দেশের মানুষের এই গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করতে দেয়নি। এবার উদ্দীপনাটা একটু বেশিই ছিল তাই সবার মাঝে।
যদিও শতভাগ ভোট কাস্টিং হয় না কোন নির্বাচনেই, এবারও হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রমতে প্রায় ৬০ ভাগ ভোট কাস্টিং হয়েছে। আওয়ামীলীগ এর একটা বিশাল অংশ ভোট দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। আর যারা ভোট দিয়েছে তাদের বেশিরভাগ বিএনপি-কে ভোট দিয়েছে।
এবারের ভোটে অন্যবারের থেকে আলাদা কারন, এই ভোটের সাথে গণভোট নামক আরেকটা জিনিস যোগ করা হয়েছে। এই গণভোটে প্রায় ৮৪ টির মত ধারা ছিল। এতে হ্যাঁ / না দিতে হয়েছে ভোটারকে।
আমার কাছে পুরো বিষয়টা একটা ছেলেখেলার মত লেগেছে। যারা গণভোট দিয়েছে তাদের বেশিরভাগ পুরো ৮৪টা পয়েন্ট সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। এতগুলো বিষয়ের উপর শুধুমাত্র হ্যাঁ এবং না'তে উত্তর দেয়াও সম্ভব নয়।
সকল দল-মতের (Inclusive) অংশগ্রহণে যে নির্বাচনের আশা আমরা করেছিলাম সেটা না হলেও মোটামুটি মানের একটা নির্বাচন হয়েছে। গণতন্ত্র চলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে আবার চলা শুরু করেছে। গণতন্ত্র একটা চলমান প্রক্রিয়া। সেখানে ভোটাধিকার না থাকলে সাধারণের অংশগ্রহণ থাকে না। স্বৈরতন্ত্রের শুরুটা সেখান থেকেই হয় (আওয়ামীলীগ এর শেষের ১০ বছরের শাসনামল দ্রষ্টব্য)।
ইন্টেরিম বা প্রফেসর ইউনুসের এনজিও মডেলের সরকার আমাদের এখানে কাজ করেনি। ধর্মীয় মৌলবাদ আর মব ভায়োলেন্সে অতিষ্ঠ দেশবাসী তাই এই ভোট হয়ে যাওয়াটাকে স্বাগত জানিয়েছে। অল্প কিছু নির্বাচন বাদে নির্বাচনের স্বচ্ছতা কোনকালেই এই জনপদে ঘটেনি। ২০২৬ এর এই নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে। তবে আমি এই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি আবার শুরু হওয়ায় আনন্দিত।
জামায়েতে ইসলামি প্রকাশ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল না, ২০২৬ সালে এসেও তারা তাদের সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি। প্রকাশ্যে ৭১ কে অস্বীকার করা এবং ভুলভাল ইতিহাস বর্ননা করার জন্য তারা নতুন প্রজন্মের অনেককে রাস্তায় নাময়েছিল। শিক্ষিত (!) দেখতে ব্যারিস্টার ক্যাটাগরির কিছু লোককে তাদের প্রপাগন্ডার জন্য ব্যবহার করেছে। কিন্তু আদতে এতে হিতে বিপরীত হয়েছে। আওয়ামীলীগ বিহীন নির্বাচনে তারা বিরোধী দল হতে পেরেছে এটাই বড় কথা।
বাংলাদেশের জন্মের বিরোধীতাকারী একটা দল বাংলাদেশের সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে এটাই এদের সবচেয়ে বড় পাওয়া। জামায়েতের হাতধরে এদেশে গুপ্ত রাজনীতির উত্থান ঘটেছে। এরা আরেক দলের কর্মী হিসেবে যোগদান করে আত্মপ্রকাশ করে শিবির/জামায়েত হিসেবে। নিজেরা যে সকল সেক্যুলার কাজ করতে পারবে না ধর্মভিত্তিক দল হবার কারনে সেগুলো করার জন্য এনসিপি নামক দল এবং কিছু মহিলা স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ক্ষমতায় ভোটে আসতে পারবে না জেনে প্রচুর পরিমানে টাকা ব্যয় করেছে ভোট কেনার জন্য এবং অনেক জায়গায় টাকা সহ জামায়াতের লোকজন ধরা খেয়েছে।
অপ্রকাশ্য তথ্যমতে জামায়েতের আমীর শফিকুর রহমান নিজ আসনে জেতার জন্য প্রচুর ভোটার মাইগ্রেট করে নিজ এলাকায় এনেছিলেন। বিএনপি মূলত জিতে গেছে জামায়েতের এই সকল ৭১ বিরোধী এবং নারী বিদ্বেষী কর্মাকান্ডের জন্য। খুব অদ্ভুতভাবে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান হতে গিয়েও আবার থেমে গেছে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়ায়।
বুদ্দিজীবী মহল বিএনপি কে অকুণ্ঠ সমর্থন না দিলেও, দৃশ্যত জামায়েতকে ত্যাগ করেছে।
কিছু নতুন শব্দ আমদানী করার চেষ্টা করা হয়েছে এই দেড় বছরে ইনসাফ, ইনকিলাব, আজাদী - ইত্যাদি। এমন না যে এই শব্দগুলো আমরা ব্যবহার করি না। কিন্তু জোর করে ভাষায় কোন কিছু ঢোকানো যায় না। এই শব্দগুলো আমরা ন্যায়, বিপ্লব, স্বাধীনতা - ইত্যাদি শব্দে প্রকাশ করতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করি। এইখানে একটা কালচারাল কনফ্লিক্ট ঘটানোর চেষ্টা চলেছে যেটা মাঠে মারা গেছে।
যেই জেনজিরা ৭১ এর ইতিহাস জানত না, এবার তারা সে সম্পর্কে কিছু হলেও জেনে গেছে। অদূর ভবিষ্যতে আমরা আবারও এই ধরনের বিপ্লব দেখব যদি না আমাদের সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করে আর ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করতে পারে।
( এই লেখাটায় আমি ২০২৬ এর নির্বাচন এবং তার পূর্ববর্তী অবস্থার কিছু ইতিহাস ধরে রাখার চেষ্টা করেছি মাত্র।)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন