কবিরাজ, দারোয়ান অথবা গার্ড - কি নামে ডাকি তোমায়?
যে কোন দায়িত্ব নিতেই আমার প্রচন্ড অনীহা কাজ করে। যেহেতু চাকরি করি না, তাই কারো হুকুমের দাস হবার অভ্যাসটা নাই। দায়িত্ব নেবার পর কারো খবরদারিও আমার পছন্দ না। আমি নিজের মত করে কাজ করতে পছন্দ করি।
পারফেকশনিস্ট হবার কারনে, কেউ কোন দায়িত্ব দিলে সেটা অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে করার একটা বদ-অভ্যাস আছে আমার। বেশিরভাগ সময়েই আশেপাশের মানুষের এটা ভাল লাগে না। কাজের সময় এরা যুক্তির বদলে আবেগকে প্রাধান্য দিতে চায়। যেটা আমার খুব অপছন্দের।
আমি যে বিল্ডিংটায় থাকি সেখানে পয়তাল্লিশটা পরিবার থাকে। এতগুলো পরিবার নিয়ে আসলে এটাকে একটা গ্রাম ঘোষনা করা যায়। প্রতিদিনই এখানে নতুন নাটক হয়। কেউ লিফট বন্ধ রাখতে বলে, কেউ খোলা চায়। কারো বুয়া নিয়ে সমস্যা, তো কারো আবার দারোয়ান পছন্দ না। নিজেকে এসব ঝামেলা থেকে দূরে রাখতেই পছন্দ করতাম। গত বছর দুয়েক তাই ছিলাম।
কার্যত অচল একটা কমিটি ছিল, যারা খুব একটা কিছু করছিল না। নোংরায় বসবাস করতে ভাল লাগছিল না দেখে ফ্রিতে উপদেশ বিলি করা শুরু করলাম। ব্যস, ধরে বেঁধে আমাকে কমিটির সদস্য বানিয়ে দেয়া হল। এখন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই অবস্থা।
সবচেয়ে বেশি সমস্যা দারোয়ান নিয়ে। দুজন দারোয়ান থাকে বিল্ডিঙের গেইটে। এদের কাজ সারাদিন বসে বসে ঝিমানো আর সময় মত পানির মটর ছাড়া। আহামরি কোন ট্রেনিং নাই। শিখিয়ে পড়িয়ে নেয়া হয়েছে। সারাদিনে বিল্ডিঙয়ের লোকের কিছু ফুট-ফরমাশ খাটে, বিনিময়ে হালকা পাতলা বখশিস পায়। একজনের নাম হেলাল আরেকজনের নাম লতিফ।
তবে এদের বুদ্ধি আর শরীর স্বাস্থ্যের যে অবস্থা, তাতে ডাকাত পড়লে বেচারাদের বাঁচাতে আমাদেরই নামতে হবে। এর মধ্যে লতিফ অসুস্থ হয়ে পড়ল টাইফয়েডে। তাকে ছুটি দিতে হলো, মাসখানেক হয়ে গেলেও, তার ফেরার নাম নেই। হেলালের উপর পড়ল দূর্গ রক্ষার দায়িত্ব। সে আবার কিছু মনে রাখতে পারে না। কেউ একটু ঝাড়ি দিয়ে কথা বললেই সব গুলিয়ে ফেলে।
একদিনের কথা বলি, সে দুপুরবেলা আমাকে ফোন দিয়ে জানালো, ভাই নিচে হিজরা এসেছে। একে ঢুকতে দিবো নাকি?
আমি তার কথায় বেকুব বনে গেলাম। দূর্গের প্রহরী যদি মালিকের কাছে জানতে চায়, চোর এসেছে ঢুকতে দেবো নাকি, তখন নিজেকে কষে একটা লাথি মারতে মন চায়।
এই নিয়ে একচোট বকা দিলাম তাকে। পরদিন আবার সেই হিজরা আসলো, নিজেই নিচে নেমে গিয়ে সমস্যার সমাধান করলাম। তো এই হলো আমাদের হেলাল। চরিত্র ভালো, চুরিদারির স্বভাব নাই, কারো কাছে অতিরিক্ত কিছু দাবি করেনা, তবে মানুষটা একটু বোকা।
মায়া করে তাকে মাঝে মধ্যে কিছু কথা বলি দেখে সে ভেবেছে, আমিও মনে হয় তার মত বোকা চিন্তা ভাবনার একজন। গল্প করতে গিয়ে একদিন আমাকে জানালো, সে আসলে অনেক গুনী একজন কবিরাজ। অনেক ধরণের গাছপালা সে চেনে। শুধু এই শহরে গাছ পাওয়া যায় না দেখে তার দারোয়ানের চাকরি করতে হচ্ছে।
যেকোন কিছুতেই আমার ভীষন অবিশ্বাস। আমার চেহারে দেখেই হেলাল সেটা বুঝেছে। আমি তাকে সাবধান করে দিলাম সে যেন তার কবিরাজি এই বিল্ডিঙের কারো উপর না ফলায়।
বিশ্বাস অর্জনের জন্য সে বলল, সে অনেক দূর থেকেই মানুষের গলার কাঁটা মন্ত্র পড়েই নামিয়ে দিতে পারে। প্রমানের জন্য একজনকে আমার সামনেই ফোন দিলো। তার কাঁটা নেমে যাবে বলে আশ্বাসও দিলো।
আমি হাসি, কিন্তু তার বাটপারিতে যে আমি বিরক্ত সেটা বুঝতে দেই না। উৎসাহ পেয়ে সে এমন সব রোগের ফিরিস্তি দেয়া শুরু করল যেগুলো ভালো করার জন্য বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর গবেষণা করে যাচ্ছেন। খরচ করা হচ্ছে বিলিয়ন ডলার। ডায়রিয়া, আমাশয়, জ্বর থেকে শুরু করে ক্যানসার ভাল করার বুদ্ধি তার আছে।
আমি কমিটির লোকজনকে সাবধান করে দিলাম। এই বোকাসোকা দেখতে নিরীহ মানুষটা আসলে বাটপার কিসিমের। এর মধ্যে আমাদের ল্যান্ডলর্ডের একজন আবার কোম্পানির দারোয়ান রাখতে চায়। এই ধরণের লুংগি আর শার্ট পরা দারোয়ান থাকলে তার সেইফ ফিল হয় না। স্টান্ডার্ডও মনে হয় কিছুটা কমে যায় এলাকার। সমস্যা হচ্ছে, তিনি নিরাপত্তার কথা বলেন, কিন্তু তিনি নিজে এই বিল্ডিঙয়ে বসবাস করেন না। এ কারনেই বেশিরভাগ এলোটি তার কথা মানতে নারাজ।
তবে এবার ঠিক করেছি তার কথা মেনে নিবো। কাহাঁতক আর এই ঝামেলা সহ্য করা যায়। যে কোন বিল্ডিং কমিটির দায়িত্বে থাকা মানে একটা গ্রামের মোড়লগিরি করার মত। এখানে সবাই সভাপতি আর উপদেষ্টা হতে চায়। পদগুলো অবৈতনিক হলেও কিসের মোহে যেন এরা আটকা পড়ে আছে।
আসছে নভেম্বর থেকেই আশা করি আমাদের নতুন গার্ড আসবে। বিল্ডিঙয়ে ঢুকলেই যারা ঠকাস করে স্যালুট দিয়ে বলবে, গুড ইভিনিং স্যার। আমিও নিজেকে একটু এলিট ভাবতে পারবো।
কবিরাজ মশায়কে বিদায় জানাতে হতে পারে, কিভাবে বলব বুঝতে পারছি না। শুনেছি কবিরাজ আর গুনীন এরা বাণ মারতে ওস্তাদ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন