ভুল
আমি আমার করা ভুলের কথা বলি না-
কারন আমি সেগুলো শুধরে নিয়েছি।
ভালো থাকুক তারার সন্তানেরা, এই নক্ষত্রের নিচে।
যখন স্কুলে পড়তাম, তখন বই কেনার সামর্থ্য আমার খুব একটা ছিলনা। টিফিনের টাকা জমিয়ে যে কটা পারতাম কিনতাম। তখন আমাকে প্রতিদিন ৫ টাকা করে টিফিন দেয়া হত। সপ্তাহ শেষে ২৫ টাকা জমে যেত।
ঈদে বা অন্য সময় যখন কিছু বাড়তি টাকা পাওয়া যেত, সেটা সোনায় সোহাগা। একবার কোন এক আত্মীয় বাসায় এসে আমাকে ১০০ টাকা দিয়েছিলেন। আমি সেই টাকা দিয়ে বই কিনে এনে বাসায় বেদম মার খেয়েছি।
এমনকি কখনো টাকা কুড়িয়ে পেলে আমি সেটা জমিয়ে রাখার চেষ্টা করতাম।
পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন আমি খুব একটা স্বচ্ছল পরিবার থেকে আসিনি। তবে প্রায় চল্লিশে এসে এখন আর আমাকে বই কেনার জন্য কারো কাছ থেকে ধার নিতে হয় না। মাসে এক বা দু'বার আমি শহরের পশ লাইব্রেরীতে ঢু মারি।

সেখানে এসি রুমে বই সাজানো থাকে। সাথে কফি আর স্ন্যাকস খাবার ব্যবস্থা আছে, আড্ডা দেবার সুযোগ থাকে। আমি সেখানে যাই, কিন্তু বই পড়ুয়ার থেকে বেশি দেখি কৃত্তিম সংস্কৃতি সচেতন মানুষ। এরা সময় কাটানোর জন্য আসে।
নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানগুলো ছিলো আমার জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। এখনও মাঝেমধ্যে সেখানে গেলে মন ভরে যায়।
একটা অদ্ভুত বিষয় হলো, কেউ আমাকে বই উপহার দেয় না। আমি প্রচন্ড বই পড়ুয়া এটা জানার পরেও কেউ আমাকে উপহার দিলে নানা রকম অদ্ভুত জিনিস উপহার দেয়। জামাকাপড়, পারফিউম, চকোলেট, হাবিজাবি ইত্যাদি । অথচ কেউ জানেই না, আমি বেশি খুশি হই বই উপহার পেলে।
কারন আমার আশেপাশে যারা আছেন, তারা বই পড়েন না। বই বাছাই করা একটা চরম যন্ত্রনাদায়ক প্রক্রিয়া। কোন লেখকের বই উপহারের জন্য কেনা উচিৎ সেটা নিয়ে চিন্তা করার মত সময় সবার নেই। ইণ্টারনেটের যুগে সেটা জানাটা সোজা হলেও, কেউ এই কষ্ট টুকু করতে চান না।
উপহারে পাওয়া বেশিরভাগ জামাকাপড়ই আমি পরি না। আমার পছন্দ হয়না।
অনলাইনে এখন বই বিক্রির একটা হিড়িক লেগেছে। আগে শুধু রকমারি ছিলো। রকমারি থেকে কিছু বই অর্ডার করতাম। এখন আর করি না।
বাংলাবাজার বুকস - নামে একটা ফেইসবুক পেইজ থেকে তারাশঙ্করের "কীর্তিহাটের কড়চা" অর্ডার করেছিলাম। তারা একমাসের বেশি হয়ে গেছে বই ডেলিভার করতে পারেনি। বই নাকি এখনও প্রকাশই হয়নি। কি অদ্ভুত!
আমার বাচ্চাটা বই পড়তে চায়না। তার কম্পিউটার আছে। আমি নিজেও বেশিরভাগ বিদেশী বই পড়ার জন্য একটা কিন্ডল কিনে নিয়েছে। আরামসে সেখানে হাজারখানেক বই নিয়ে ঘোরা যায়। তবে আমার রুমে বই ছড়ানো থাকে। আমার আশা বই দেখতে দেখতে একদিন বাচ্চাটা বইয়ের প্রেমে পড়ে যাবে।
আশেপাশের এত এত ব্যস্ত মানুষেরা বই পড়ে না। তাদের চিন্তাভাবনা নির্দিষ্ট একটা শেকলে বাঁধা থাকে, ভাবলেই আমার অস্বস্তি হয়। এরা বাঁচে কি করে?
মানুষ নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করতেই পারে। হয়ত বনের হরিণেরাও তাই করে। যেহেতু আমরা কেউ কারো ভাষা বুঝি না, তাই এই দাবিতে কোন ধরনের বাদ-বিবাদ ঘটে না।
মানুষের এই দাবি করার পেছনে কিছু অত্যাবশ্যকীয় কারন রয়েছে। একমাত্র আমরাই প্রাণীজগতের মধ্যে সভ্যতা গড়ে তুলেছি। দু'পায়ে হাঁটার ক্ষমতা অর্জনের সাথে সাথে আমাদের হাতগুলো মুক্ত হয়েছে। হাতের ব্যবহার আমাদের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে।
আমাদের মস্তিষ্কও দেহের তুলনায় অন্যান্য প্রানীদের থেকে বড়। জটিল চিন্তাভাবনা যেমন ভাষার ব্যবহার এবং একসাথে কাজ করে কোন বিশাল স্থাপনা সৃষ্টি ইত্যাদি আমরাই করতে পারি।
ভ্রমন, খেলাধুলা, সামাজিক আচার পালন এবং জীবন উপভোগেও আমরা অন্যান্য প্রানীদের ছাড়িয়ে গেছি। খাদ্য গ্রহন করে প্রজাতির ধারা অক্ষুণ্ণ রাখা বাদেও আমরা নানা ধরনের অহেতুক কাজ করি। অতএব আমরা শ্রেষ্ঠ।
এই শ্রেষ্ঠ মানুষই কিছু আবার জগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজগুলোর একটা করে। সে অন্য প্রানীদের হত্যা করে। এমনকি নিজ প্রজাতিকেও সে হত্যা করে।
বিজ্ঞানীদের মতে বর্তমান মানুষেরা হচ্ছে সাত নম্বর প্রজাতি। এর আগের ছয়টি টিকে থাকতে পারেনি। আমাদের পূর্বপুরুষ নিয়ানডার্থাল (Neanderthals) কে নাকি আমরাই হত্যা করেছি। যদিও এটা পেলিওএন্থ্রোপলজির বিষয়। আর এ ব্যপারে আমার জ্ঞান কিঞ্চিত দুর্বল।
তবে মানুষের ইতিহাস যতদূর পর্যন্ত লেখা আছে, সেখানে নানা সময়ে নানা কারনে এবং অকারনে মানুষেরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করেছে এবং একে অন্যকে হত্যা করেছে। কখনো দেশপ্রেমের নাম করে আবার কখনো ধর্মের কারনে। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি তাই মাঝে মাঝে খুব অকিঞ্চিৎকর মনে হতে পারে। আপনি সিরিয়া কিংবা ফিলিস্তিনের মানুষদের জিগ্যেস করুন, কারা তাদেরকে খুন করছে? অন্য গ্রহের প্রাণী, নাকি এই গ্রহের অন্য প্রাণীরা?
উত্তর হচ্ছে, মানুষ।
মানুষ নিজেরাই আইন বানায়, বর্ডার বানিয়ে নিজেদের খাঁচার ভেতরে আরো সংকীর্ন করে এবং সম্পদের অপ্রতুলতা নিয়ে যুদ্ধ করে। এটা প্রাকৃতিক নিয়মে হচ্ছে এবং সামনেও হবে। পৃথিবীর তাবৎ জায়গায় যদি মানুষকে সমানভাবে থাকতে দেয়া হয় আর খাদ্যেরও অভাব না থাকে, তবুও এরা বিভিন্ন গল্প বানিয়ে একে অপরকে খুন করবে।
প্রযুক্তি জ্ঞানের উৎকর্ষতায় খুন করার পদ্বতি এবং সংখ্যা পরিবর্তিত হয়। চেঙ্গিস খান এক বছরে যত মানুষ মেরেছে, এখনকার মোটামুটি শক্তিশালী যে কোন বোমা একটা শহরের উপর ফেলে তার থেকে বেশি মানুষ মেরে ফেলা সম্ভব।
আদিকাল থেকেই টিকে থাকার জন্য মানুষকে হিংস্রতা দেখাতে হয়েছে। অন্যরা যেখানে শুধু মাত্র খাবারের জন্য খুন করত, সেখানে মানুষ নিছক আনন্দের জন্যও খুন করে। মাঝেমধ্যে কারো গল্প পছন্দ না হলে তাকেও খুন করে। রোম সাম্রাজ্যে এম্ফিথিয়েটার বানিয়ে মানুষ কিভাবে মানুষকে হত্যা করে, সেটা লোকজন রীতিমত আনন্দ উল্লাস করে দেখত।
আমাদের রক্তেই খুনের নেশা আছে। কারুর ধর্ম পছন্দ না হলে তাকে খুন করা যায়। অন্যের বাসস্থানকে নিজের বলে দাবি করে খুন করা সম্ভব। রাজনৈতিক ক্ষমতা পালাবদলের জন্য মানুষের লাশ দরকার। আমাদের যেকোন বিপ্লবকে মহিমান্বিত করার জন্য আমরা রক্ত নিতে চাই, দিতে চাই।
অথচ আমরা নিজেদের বুদ্ধিমান দাবি করি। শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের জন্য নিজেদের মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু মনে করি।
বিজ্ঞানের সোজাসাপটা কথা হচ্ছে, যেহেতু মানুষ সবচেয়ে বেশি শক্তি অপচয় করে বা ছড়াতে পারে তাই মানুষকে কে খাদ্যশৃঙ্খলের উপরে স্থান দেয়া হয়েছে। আমরা পুঞ্জীভূত শক্তিকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছি। মহাবিশ্বের সব জায়গায় শক্তি সমানভাবে ছড়িয়ে পড়লে গ্রহে গ্রহে প্রজাতির উদ্ভব বন্ধ হয়ে যাবে।
এটা বোঝা অবশ্য বেশ দূরহ একটা কাজ হবে। কারন দর্শন আর বিজ্ঞান এখানে মিলে মিশে একাকার। আমরা এখন আর দুটোকে এক করে দেখি না। আধুনিক যুগে দার্শনিকের তেমন কোন সম্মানও নেই।
তবে প্রকৃতির একটা সাধারণ দর্শন হচ্ছে, যে প্রানী তুমি খাবে না, তাকে হত্যা করবে না।

তোমার আর আমার দুজনের হাতে যদি বন্দুক থাকে তবে আমরা আইন নিয়ে কথা বলতে পারি।
তোমার আর আমার দুজনের হাতেই যদি ছুরি থাকে তবে আমরা নিয়ম নিয়ে কথা বলতে পারি।
তুমি আমি দুজনেই যদি খালি হাতে আসি তবে আমরা যুক্তি নিয়ে কথা বলতে পারি।
কিন্তু তোমার হাতে বন্দুক আর আমার হাতে ছুরি থাকলে, তুমি যা বলবে সেটাই সত্যি।
আর তুমি বন্দুক নিয়ে আসলে যদি আমি খালি হাতে থাকি, তবে তুমি শুধু অস্ত্র নিয়ে আসোনি, আমার জীবন তোমার হাতে।
আইন, নিয়ম এবং নৈতিকতার ধারনা তখনই কাজ করে যখন এরা সমতার ভিত্তিতে তৈরি হয়।
জগতের নির্মম সত্য হচ্ছে যেখানে টাকা কথা বলে সেখানে সত্য নিশ্চুপ হয়ে যায়। আর যখন ক্ষমতা কথা বলে তখন টাকাও তিনপা পিছিয়ে যায়। যারা আইন তৈরি করে বেশিরভাগ সময়ে তারাই প্রথমে আইন ভাঙে। আইন হচ্ছে দুর্বলের পায়ে শেকলের মত আর ক্ষমতাবানের জন্য হাতিয়ার।
পৃথিবীতে যা কিছু ভালো তার জন্য লড়াই করাতে দোষের কিছু নেই। ক্ষমতাবানেরা সবাই সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা করছে, আর দূর্বলেরা অলস বসে থাকে সেই সম্পদের ভাগ পাবার জন্য।
জুলাই-আগষ্ট বিপ্লবের পরে দেশের কোন কিছুই ঠিক মত যাচ্ছে না। প্রথম কয়েকদিন নব বিবাহিত দম্পতির মত সবাই খুব প্রশংসা করলেও, বিপ্লবের ক্ষত কোনভাবেই মুছে ফেলা যাচ্ছে না। ইউনুস একজন চৌকস ব্যবসায়ী হলেও কার্যত তিনি প্রশাসন চালাতে ব্যার্থ হচ্ছেন।
ক্ষমতার মূল জিনিস হচ্ছে তা প্রয়োগ করতে হয়। অনেক ক্ষমতা নিয়ে বসে থাকলে বা লোকে কি বলবে এই লজ্জা করলে দেশ চালানো যাবে না। সবাইকে খুশি করতে গেলেও নেতা হওয়া যায় না। সেই হিসেবে ইউনুস সরকারের ক্ষমতা মনে হচ্ছে খুব কম।
নভেম্বরে অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে। এক কলেজ আরেক কলেজের সাথে মারামারিতে লিপ্ত হয়ে গেছে। কলেজ ভাংচুরেরর পর শিক্ষার্থীরা যা কিছু পাচ্ছে লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। এর আগেই অটোরিকশা চালকেরা আন্দোলনে নেমেছে। তারাও রাস্তায় মারামারি করছে। তারাও অবৈধ বাহন স্বাধীনভাবে চালাতে চায়।
ঢাকায় মূলত প্রতিদিনই কিছু না কিছু সহিংসতা হচ্ছে। পুলিশ আর আর্মি হার্ড লাইনে যাচ্ছে না। আর্মির ব্যপারটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এরা চাইলে হয়ত অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারত, কিন্তু কেন যেন সেই সদিচ্ছাটা দেখতে পাচ্ছি না।
আজকে আবার দেখতে পেলাম হিন্দু-মুসলিম একটা দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা চলছে। আদালত চত্বরে গন্ডগোলের পর, আদালতের বাইরে সরকারি এক আইনজীবিকে হত্যা করা হয়েছে। ইসকনের একজন নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেফতার করা হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায়। সনাতন ধর্মালম্বীরা আন্দোলনে নেমেছে।
এইখানে একটা ব্যাক্তিগত অবজারভেশন এর কথা বলি, ইসকনের এই লোককে আমি চিনতাম না। হঠাৎ করে ফেইসবুক রিলে তার একটা ভিডিও দেখি। এখন এইসব ভিডিও বেশ চলছে। সেখানে তিনি হিন্দুদের কোন একটা সভায়, জনসংখ্যা বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। অনেকটা মুসলমানদের ওয়াজিয়ান বক্তাদের মত। কি সেলুকাস! একটা দেশের মানুষ ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে কোয়ালিটির থেকে কোয়ান্টিটির দিকে যেতে উপদেশ দেয়। কি অথর্ব আর নিন্মশ্রেনীর চিন্তা। মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ সবার চিন্তা ভাবনা একইরকম।
মূলত দেশকে একটা গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা কার্যত দৃশ্যমান এখন। ছাত্ররা জাতির ভবিষ্যত - এই কথাটা এজন্যই বলা যে এরা বড় হয়ে, অভিজ্ঞতা অর্জন করে দেশের বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব নেবে। মব ভায়োলেন্সে উৎসাহিত একদল তরুণের কাছে কোন ধরনের দায়িত্ব দেয়া মূর্খতা। এদের শিক্ষা সমাপ্ত হয়নি, এবং এদের অভিজ্ঞতা শুধুই প্রতিহিংসার।
এরাই যদি আগামী দিনের দেশের ভবিষ্যত হয়। তবে সামনে শুধুই রক্তাক্ত দিন।
দেশ চালানোর জন্য একটা মাসল পাওয়ার দরকার হয়। কে সেই দায়িত্ব নেবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। আবার শুধু মাসল পাওয়ার হলেই হবে না। সেই ক্ষমতাকে সমীহ করার লোকও থাকতে হবে। পুলিশের সাথে আগষ্টে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর, এরা এখনও স্বাভাবিক হয়নি। বাঙালি এমনিতেই উচ্ছৃঙ্খল জাতি - এখন ভয় ভেঙে এরা যত্র তত্র মব ভায়োলেন্সে সব সমস্যার সমাধান চাইছে।
এটাকেই যদি স্বাধীনতা আর গণতন্ত্র বলে, তবে এদেশটা খুব দ্রুত ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে। ধর্ম একটা বিশাল পলিটিক্যাল ট্রাম কার্ড এই উপমহাদেশে। বাংলাদেশের অশিক্ষিত জনগনের উপর সেটা প্রবলভাবে প্রয়োগের চেষ্টা চলছে।
খুব শিগ্রই আরেকটি বিপ্লব অথবা গৃহযুদ্ধের আশংকা করছি। নয়ত দৃশ্যপটে কেউ একজন এসে বলতে পারে, মার্শাল ল' জারি করা হলো। অনির্দিষ্ট কালের জন্য কারফিউ।
কালকে রাতে হঠাৎ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। রাত তখন সাড়ে ন'টা বাজে। মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। বৃষ্টি হলে সাধারণত আমি ফ্যান লাইট বন্ধ করে বারান্দার দিকের দরজাটা খুলে দেই। ঝুম ঝুম একটা শব্দ নামে আমার ঘরে। সাথে ভেজা একটা বাতাস এসে মন ভরিয়ে দেয়।
অনেক অনেক পুরনো স্মৃতিরা ঘিরে ধরে এসময় আমাকে। আমি এই সময়টার নাম দিয়েছে "ইচ্ছে পূরণ"। যা খুশি ভেবে নেয়া যায় তখন। মন ভালো থাকলে কবিতার দুএকটা পংক্তিও মাথায় আসে।
খিচুড়ি খেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু রেঁধে দেবার লোক নেই। নিজের রান্না করতে হবে বলে সেই ইচ্ছেটাকে মাটি দিলাম। একটা চা বানিয়ে আবার চেয়ারে এসে বসেছি। কিন্তু চা খেতেও ভুলে গেছি। এই বৃষ্টির পরে ঢাকায় ঠান্ডা নামতে পারে। এই নভেম্বরে আগে যেখানে হাঁড় কাপানো ঠান্ডা ছিল, এখন সেখানে এসি ছেড়ে রাখতে হয়।
স্কুলে যখন পড়তাম তখন এসময়টা আমার বড়ই আনন্দে যেত। আমাদের বুয়েট স্কুলটা বেশ খোলামেলা, সাথে একটা মাঠও ছিল। ক্লাসের জানালা দিয়ে সোনালি রঙের রোদ এসে পড়ত বেঞ্চের উপর, আমার মুখে। আমার নজর থাকত কখন টিফিনের ঘন্টা দেবে। খুব বেশি পড়ুয়াদের দলে আমি ছিলাম না। গল্পের বই আর কমিক্সেই আমার মন পড়ে থাকত সবসময়। অনেক বেশি বন্ধুও বানাতে পারিনি। তবে দু'জন বন্ধু এখনও টিকে আছে। জীবনের দৌড়ে আমাদের এই তিনজনের একজনও চাকরি-বাকরি কিছু করি না। তবুও বেশ ভালো জীবন কেটে যাচ্ছে।
পড়াশোনাটা শুধু চিন্তার বিকাশের জন্য। আমাদের মনে হয় সেটা হয়েছে। আমরা শুধু পাশ করার জন্য আর চাকরি করার জন্য পড়িনি। তোমরা এখন কিসের জন্য পড়ছ?
ফেইসবুকে ভিডিও দেখেছি, নতুন স্বাধীনতার নাম করে শিক্ষকদের পদত্যাগ করানো হয়েছে। অত্যন্ত অসভ্য ভাবে এবং কুৎসিত উপায়ে। ছোট ছোট বাচ্চাদের আন্দোলন করতে দেখেছি, যাদের মাথায় বিপ্লব মানেই অসভ্যতা ঢুকে গেছে। তোমরা কিসের জন্য পড়াশোনা করছ?
একদল দেখলাম আন্দোলন করছে পরীক্ষার সিলেবাস কমানোর জন্য, আরেকদল অটো পাশ চায়। কেউ আবার রাস্তা বন্ধ করে চাইছে তাদের কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় করে দেয়া হোক সেজন্য! তোমরা আসলে কিসের জন্য পড়ছ?
এই জনপদটা অসভ্য লোকজনে ভরা। এখানে শিক্ষার বারোটা-তেরোটা অনেক আগেই বেজে গেছে। কয়দিন পরপরই সবাই রাস্তা বন্ধ করে অন্যের সময়ের ক্ষতি করে শুধুমাত্র নিজের দাবি আদায়ের জন্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝখান দিয়ে গতকাল বাসায় ফেরার সময় তাবলিগ গ্রুপের স্মরনকালের সবথেকে বড় সমাবেশ এর মাঝখানে পড়ে গেলাম। প্রায় দুই ঘন্টা লাগল এই জায়গা থেকে বের হতে। আমার এই জীবনে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এইরকম উজবুকি কান্ড আর দেখিনি। রাস্তায় সারি সারি বাস এনেছে এরা। সারাটা রাস্তা কলার খোসা আর পলিথিনে মোড়ানো খিচুড়ি ফেলা। মেট্রোরেলের নিচ দিয়ে দেয়া রেলিং টপকে, গাছের পাতা ছিড়ে মাদ্রাসা ছাত্ররা অবাধে পার হচ্ছে।
আমার তখন মনে পড়ল নৈতিকতা শিক্ষা থেকে আসে, আমাদের স্কুল এবং মাদ্রাসাগুলো দুই জায়গাতেই এই শিক্ষাটা ব্যার্থ হয়েছে। আগে আওয়ামীলীগের লোকজন টোকাই ভাড়া করে আনত এখন মাদ্রাসা ছাত্রদের হাতে আলকায়েদার পতাকা ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে, সমাবেশে বাস ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছে। নগর জুড়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের পোস্টার। জেন-জি তোমাদের আইডল কারা?
তোমরা কি জানো দেশকে কতদিন পিছিয়ে দিয়েছ তোমরা। যে বাকস্বাধীনতার কথা তোমরা বল, সেটা কোথায়? তোমাদের পক্ষে না থাকলে সবাই আওয়ামীলীগ? এই ধরনের বুদ্ধি নিয়ে তোমরা দেশ চালাতে চাইছ? তোমরা অটো পাশ জেনারেশন বলায় রাগ করো কিসের জন্য? তোমরাতো আদতে সেই দাবিতেই মাঠে নামো।
আগেও কেউ ভালো ছিলো না, এখনো কেউ ভালো নেই, ভালো থাকার সম্ভাবনাও দেখছি না।
ঢাকা একটা ব্যর্থ নগরীতে পরিণত হয়েছে। যার যা কিছু দাবি আছে, আন্দোলন আছে, সব ঢাকার মূল পয়েন্টে এসেই করতে হয়। যান চলাচলের রাস্তাকে রাজপথ নাম দিয়ে সবাই রাজপথের লড়াকু সৈনিক হতে চায়। যদি রাজাই না থাকে, তবে কিসের রাজপথ? কার রাজত্ব?
পৃথিবীর কোন দেশে এই রকম অসভ্যতা চলে রাস্তা জুড়ে? কারা স্কুল ছেড়ে রাস্তায় নামে আবেগ পুঁজি করে? কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস না করে, ল্যাবে রিসার্চ করা বাদ দিয়ে রাজনীতি করে? এত এত বিপ্লব কেন করতে হয় বারবার?
বিজ্ঞান, সাহিত্য আর সংগীতে বুঁদ হয়ে থাকার কথা যে সময়টায়, তখন তোমরা কি করছ? তোমরা কিসের জন্য পড়াশোনা কর? দেশের জন্য যে করোনা সেটা নিশ্চিত। তোমরা যাদের আইডল মানো তাদের অতীত আর বর্তমান অবস্থা দেখেছ?
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা ব্যর্থ, আমাদের গণতন্ত্র একারনেই কাজ করে না। আরও পঞ্চাশ বছরেও কাজ করবে বলে মনে করছি না। যা কিছু সুন্দর তা নষ্ট করে যদি দাবি আদায় করতে হয় তবে জেনে নিও, ভূল হয়ে গেছে। কোথাও একটা বড় ভূল হয়ে আছে।
ডারউইন সাহেব একটা সাধারণ পূর্বপুরুষের কথা বলে ধরা খেয়ে গেছেন তাবৎ ঈশ্বরপ্রেমী মানুষের কাছে। বুঝে না বুঝে লোকটাকে হেয় করা হচ্ছে প্রায় দুইশ বছর ধরে।
কিন্তু আচরনগত দিক থেকে আমি খুব সাদৃশ্য পাই, মানুষ আর বানরের মাঝে। এদেরকে একটু আদর দেখালেই মাথায় উঠে বসে।
মাথা থেকে নামাতে হলে আছাড় দিতে হয়।

Point of no return - এই কথাটা আমি প্রথম পড়ি ব্ল্যাকহোল নিয়ে পড়তে গিয়ে। ব্লাকহোল মহাবিশ্বের এমন একটা স্থান, যেখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত বেশি যে সেটা টাইম-স্পেসের সাধারণ গাণিতিক সূত্রগুলোকে ভেঙে ফেলে। এই ব্ল্যাকহোল নামক স্থানের আশে পাশে ইভেন্ট হরাইজন নামের যে অঞ্চলটা আছে আমরা সে পর্যন্তই দেখতে পারি। এর পরে বা ব্ল্যাকহোলের ভেতরে দেখতে পারি না। কারন ইভেন্ট হরাইজন এর স্কেইপ ভেলোসিটি (Escape Velocity) আলোর গতির সমান। মানে সেখান থেকে বের হতে হলে কোন বস্তু বা তথ্যের আলোর চেয়ে বেশি গতিতে ভ্রমন করতে হবে। যেহেতু সেটা আমাদের পরিচিত মহাবিশ্বে সম্ভব নয় তাই, কোন কিছুই এই সীমারেখা অতিক্রম করলে আর ফেরত আসতে পারে না। এই জায়গাটাকে পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন বলে।
আমাদের জীবনেও এই পয়েন্ট অফ নো-রিটার্ন উপস্থিত, কিন্তু আমরা ক'জন সেটা জানি?
ছোট থেকে বড় হতে হতে আমরা নানা ধরনের ভুল করি। এই ভুল করেই মানুষ শেখে। কিন্তু একটা বয়সের পরে গিয়ে প্রতিটা ভুল আপনাকে ভোগাবে। কারন ভুল শোধরানোর সময় তখন আর থাকে না। ধরুন, আপনি ছয় বছর বয়সে গিয়ে স্কুলে ভর্তি হলেন না। প্রথাগত শিক্ষায় গেলেন না, নিজের মত করে চললেন। বয়স যত বাড়বে, আপনার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবার সম্ভাবন তত কমবে। যদিও জীবন যাপন করতে শিক্ষা অপরিহার্য নয়, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে অশিক্ষিত হলে আপনার উন্নত জীবনের সম্ভাবনা কমে যাবে।
আপনি অস্বাস্থ্যকর খাবার খান, নানান রকম পেটের অসুখে ভোগেন, আবার ঠিক হয়ে যান। কিন্তু একটা সময় পরে আপনার শরীর নিজে থেকে আর এটা ঠিক করতে পারবে না। দরকার হবে ঔষধের। আর এর পরেও যদি আপনি শরীরের জন্য দরকারি খাবার না খেয়ে অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে যান, তবে এমন একটা সময় আসবে যখন কোন ঔষধই আর আপনাকে সুস্থ করতে পারবে না।
যারা মাদক নেয়, তারা কিছুদিন ভাল থাকে আবার কিছুদিন অসুস্থ হয়, কিন্তু একটা সময় গিয়ে তারা আর সুস্থ থাকতে পারে না। তাদের পক্ষে আর কখনই সুস্থ জীবনে ফেরা সম্ভব হয় না।
এই না ফিরতে পারাটাই হচ্ছে পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন। আপনার প্রতিটা ভুল আপনাকে এই বিন্দুর দিকে নিয়ে যেতে থাকবে একটু একটু করে। যারা ক্রমাগত ভুল করে যাবে তাদের পয়েন্ট অফ নো রিটার্নে পোছে যাবার হার বেশি।
আপনার একটা ভুল সিদ্ধান্তের পর আশেপাশের অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়, আপনার পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয় সব থেকে বেশি। যারা পয়েন্ট অফ নো রিটার্নে পৌছে গেছেন তারা শুধু নিজেরাই ডোবেন না, সাথে আর বেশ কয়েকজনকে নিয়ে ডোবেন। কারন একটাই, মায়া।
লজিক্যাল ডিসিশান হচ্ছে, পয়েন্ট অফ নো রিটার্নে পৌছে যাবার পর সেই মানুষকে ত্যাগ করা। কিন্তু অনেক সময় আমরা সেটা মেনে নিতে চাই না আবেগের কারনে। ফিরে আসার ক্রমাগত চেষ্টায় সময় এবং আর্থিক অপচয় ঘটে।
মানব শরীর অত্যন্ত নাজুক একটা জিনিস। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস, জীবন যাপন প্রনালীর কারনে আমরা ক্রমাগত পয়েন্ট অফ নো রিটার্নে পৌছে যাই খুব দ্রুত। একটু একটু করে সময় যায় আর না ফিরতে পারার বিন্দুর দিকে আমাদের দেহ চলে যায়। যারা ব্যায়াম বা শারীরিক কোন পরিশ্রম করেন না, তারা যারা ব্যায়াম করেন তাদের তুলনায় রোগ-শোকে ভোগেন বেশি। একটা বয়সের পরে ব্যায়াম করার সামর্থ্য বা ইচ্ছা আর থাকে না। তখন বেঁচে থাকতে হয় নানা অসুখ আর ঔষধ নিয়ে।
যে কোন দূর্ঘটনা ঘটে যাবার পরে প্রথমে অবিশ্বাস আসবে, যে এমন হতেই পারে না! তারপর আসবে ক্ষোভ, কেন আমার সাথেই এমন হল? এরপর আসবে মেনে নেয়া আর তারপর দুঃখ। কিন্তু যৌক্তিক বিষয় হচ্ছে, পয়েন্ট অফ নো রিটার্নে পৌছে যাবার পর কোন কিছুতেই আর সেই ঘটনা পরিবর্তন করা যায় না। নিজের অবস্থা মেনে নেয়াটাই তখন সব থেকে উত্তম কাজ।
--
বেশিরভাগ মানুষ জানে না, কোন জিনিসই একদিনে বা হুট করে হয় না। সাম্রাজ্যের পতন, ব্যবসায় সাফল্য, কিংবা শরীর গঠন সব কিছুতেই একটা দীর্ঘ সময় লাগে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রমের পরে সাফল্য আসে। নতুন একটা ভাষা শিখতে যান, সেখানেও আপনাকে ব্যায় করতে হবে অনেক সময়। একটা শিশুও নিজের মায়ের ভাষা শিখতে তিন বছরের মত সময় নেয়।
পরিনত বয়সে যে ভুল করে ফেলেছেন সেটা অনেক সময় আর শোধরানো যাবে না। শোধরাতে গেলে নতুন নতুন ভুলের জন্ম হবে। যেটুকে সময় পাবেন এই পয়েন্ট অফ নো রিটার্নের পরে সেটা উপভোগ করার চেষ্টা করুন।
সময় খুবই দরকারি জিনিস, আপনার জীবনে সেটা সীমিত এবং যে কোন পরিমানে টাকা দিয়েও সেটা ফেরত পাওয়া যাবে না।
শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের নিচে বাইক নিয়ে বামে ইন্ডিকেটের দেয়া অবস্থায় বসে ছিলাম। বাইকের পেছনে বউয়ের হেলমেট ঝুলছে। বেশ বড়সড় সাইজের হেলমেট। সেইফটি ফার্স্ট। বউ নাস্তা কিনতে গেছে। মেডিকেলের দিক থেকে উলটা পথে আসা রিকশা গুনছি।
এক ভদ্রলোক শার্ট ইন করা ফর্মাল ড্রেসে, কালো রঙের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হন হন করে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাবার সময় জানতে চাইলেন, ভাই যাবেন নাকি? আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি তিনি আমাকে কিছু বলছেন। ফুলফেইস হেলমেট পরা আমার, পূর্বদিকের সূর্যের কারনে সান ভাইজর নামিয়ে রেখেছি। দ্বিতীয়বার, একটু সামনে গিয়ে তিনি আবার বললেন যাবেন না?
এবার আমি বুঝতে পেরেছি তিনি কি মিন করেছেন। আমি একটা হাসি দিলাম, কিছু বললাম না। তৃতীয়বার জিগ্যেস করার পর ভাইজর উঠিয়ে তাকে বললাম, না ভাই যাবো না। কিছুটা অবিশ্বাস নিয়ে তিনি সামনে চলে গেলেন।
বউ নাস্তা কিনে আসার পর তাকে বললাম, একটা ছেলে আমাকে জিগ্যেস করল যাবো নাকি। একটু দূরে গিয়েই দেখলাম তিনি এখনো হাঁটছেন। বাইক একটু স্লো করে পেছনে বসা বউকে দেখিয়ে বললাম, "ভাই, এই কারনে যাবো না।"
তিনি রসিকতা মনে হয় বুঝতে পারলেন। বললেন, স্যরি ভাই, আমি মনে করেছি আপনি রাইড শেয়ার করেন। আমিও হাসি মুখে সামনে রওনা দিলাম।
ভাই যদি এই লেখা পড়ে থাকেন কিছু মনে করবেন না। কিছুটা হিউমার না থাকলে ঢাকা শহরের রাস্তায় বের হলেই মেজাজ খারাপ হবে।
সকাল বেলাতেই শাহবাগে জ্যাম কেন লেগে গেল বুঝলাম না! এটা একটা অসম্ভব রকমের উদাসীন শহর। আপনারা যারা নিয়ম করে সকাল বেলা ধোপদুরস্ত হয়ে বের হন, তাদের জন্য অনেক মায়া। সৃষ্টিকর্তার অসীম দয়ায় এমন একটা প্রফেশনে আছি, আমাকে রাস্তা মাপতে হয় না। লেখালেখি করেই জীবন পার করে দিতে পারব আশা রাখি।
পাঠাও আপনাদের অনেকের জন্য একটা নির্ভরযোগ্য বাহন এটা জানি। অনেকের পরিবার চলে একটা বাইকের উপর নির্ভর করে। এই শহরে নিজের গাড়ি এফোর্ড করাটা অনেকের পক্ষেই সম্ভব না। আমাদের শহরের জনসংখ্যার তুলনায় রাস্তা অনেক অল্প, পাবলিক পরিবহনও নগন্য এবং জঘন্য।
চোখ কান খোলা রাখবেন সর্বদা। এবার আসেন কিছু টিপস দেই। পাঠাও বা ক্ষ্যাপ রাইড শেয়ার করা লোকদের কিভাবে চিনবেন।
- এরা আমাদের মত শৌখিন বাইকারদের মত আরাম করে বসে থাকবে না। একটু পর পর কোমর বেঁকিয়ে সামনে পেছনে তাঁকাবে যাত্রির আশায়।
- আপনি বলার আগেই বেশিরভাগ সময় নিজের থেকে আপনাকে এপ বাদে ক্ষ্যাপ মারার আমন্ত্রন দেবে। আপনি শুধু সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন, ব্যাস।
- এদের বাইকের অবস্থাও নাজুক থাকবে।
- ৯০ ভাগের পায়ে রাইডিং সু অথবা হাতে গ্লাভস থাকবে না। স্যান্ডেলেই চলে যায়। কারন এদের পা টাইটেনিয়ামের তৈরি।
- জামাকাপড় কিছুটা মলিন থাকবে যেহেতু সারাদিন রোদে পুড়ে বাইক রাইড করতে হয়।
আর এর পরেও যদি চিনতে না পারেন, তবে তার নিজের মাথার এবং পিলিয়নের হেলমেটের দিকে নজর দিন। ময়লা অথবা স্ট্র্যাপ ছেড়া দেখবেন। অথবা ডিমের খোসার মত টোপলা হেলমেট দেখবেন।
আমরা সৌখিন বাইকররা বেশিরভাগ সময়েই ফুলফেইস এবং পরিস্কার দামি হেলমেট ব্যবহার করি। দামী বললাম এই কারনে, কারন মাথা বাঁচাতে হয়। আমাদের পিলিয়নের হেলমেটও বেশ দামি, দেখতে সুন্দর এবং বড়সড় হয়। দেখলেই বুজবেন এগুলো আছাড় দিয়েও আপনি ভাঙ্গতে পারবেন না।
এরপরও যদি কনফিউজ থাকেন, তবে আল্লাহ ভরসা। যেকোন বাইকের পিছনে উঠে বসেন। রাস্তায় এদের তাড়াহুড়া, তিড়িং বিড়িং আর ইন্ডিকেটর বিহীন চলাচল দেখলেই চিনে যাবেন।
বিশদিন পর ঢাকার রাস্তায় বের হয়ে মনে হল, এইখানে চলতে হলে কোন কিছুতেই মাথা ঘামানো যাবে না। ঢাকার রাস্তার নিয়ম আর জঙ্গলের নিয়ম একই।
আমেরিকা পৃথিবীর সবথেকে বড় দেশ নয়, বোধহয় চতুর্থ হবে, এমনকি জনসংখ্যার দিক থেকেও সে সবার উপরে নেই। সবচেয়ে বেশি ধার্মিকও সেখানে নেই, তাহলে কোন ক্ষমতাবলে সে পৃথিবীর উপরে ছড়ি ঘোরাচ্ছে? সহজ উত্তর হচ্ছে তার প্রযুক্তি এবং সামরিক সক্ষমতায়।
এই দুটো বিষয় আবার নির্ভর করে বিজ্ঞানের পেছনে একটা দেশ কত খরচ করে তার উপর। তার মানে ধরে নেয়া যায় আমেরিকা বিজ্ঞান গবেষনার পেছনে প্রচুর খরচ করে।
আরেকটু বিশদভাবে বললে আমেরিকান কালচারে বিজ্ঞান এবং শিক্ষার পেছনে খরচ করার মানসিকতা আছে। কালচারের কথা বলছি কারন যেকোন দেশের রাজনীতি, আইন আর স্কুলগুলোর পড়াশোনা নির্ভর করে সেখানকার সংস্কৃতি আর বিনোদনের উপর।
আমি যখনই কোন সায়েন্স-ফিকশন মুভি দেখি, সেখানে আমেরিকানদের উপস্থিতি দেখি। বিগ-ব্যাং থিওরি একটা কমেডি টিভি সিরিজ। কয়েকজন তত্ত্বীয় বিজ্ঞানী এবং ইঞ্জিনিয়ারদের ল্যাব এবং ল্যাবের বাইরের জীবন সেখানে দেখানো হয়েছে। সিরিজটা এতই মজার আর কমিক রিলিফে ভরা যে যতবার দেখি ভালো লাগে। প্রচুর মানুষ অনুপ্রানিত হয়েছে বিজ্ঞানকে নতুন ভাবে ভালোবাসতে এই সিরিজ দেখে।
সে দেশে কার্ল-সাগান এক জনপ্রিয় নাম। তার হাত ধরে কত শত বাচ্চারা বিজ্ঞানী হবার স্বপ্ন দেখেছে। তাদের মিচিও কাকু এখনো টিভিতে বিজ্ঞানের কঠিন সব বিষয়গুলোকে তুলে আনছেন ফ্যান্টাসি গল্পের মত করে। নেল ডেগ্রেস টাইসন এর পডকাস্ট আপনি ঘন্টার পর ঘন্টা দেখতে পারবেন বোর হওয়া বাদে।
কি বুঝলেন? এরা শুধু মারামারির মুভি বানায় না, বরঞ্চ বিজ্ঞানকে ভালোবাসা তাদের সংস্কৃতির একটা অংশ বানিয়ে ফেলেছে। সায়েন্টিস্টরা সেখানে সেলিব্রেটির মর্যাদা পায়।
ইলন মাস্কের কথাই ধরুন, আজকে দেখলাম তার কোম্পানি স্পেস-এক্স একটা রকেট লাঞ্চিং এর পর আবার ডকিং স্টেশনে এসে বুস্টারকে ল্যান্ড করিয়েছে। এ লোকটা কিন্তু ফিল্মস্টার বা ক্রিকেটার নয়, সে ইঞ্জিনিয়ার। বলা হয়ে থাকে আয়রনম্যান মুভিতে টনি স্টার্ক আসলে তাকে পোট্রে করেছে। সত্যি-মিথ্যা জানি না।
বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিকে যদি আপনার সংস্কৃতির অংশ বানিয়ে ফেলেন তবে লাখ লাখ স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাকে আপনি অনুপ্রানিত করতে পারবেন ভবিষ্যতে বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করার জন্য।
আমাদের দেশে সাই-ফাই লেখক খুবই কম। জাফর ইকবাল, হুমায়ূন আহমেদ বাদে বাকি অনেকের লেখাতেই আমি সেই ফ্যান্টাসি খুঁজে পাইনি যেটা একটা বাচ্চাকে অনুপ্রানিত করতে পারে। সত্যজিৎ রায়ের লেখা বিজ্ঞান গল্প, অথবা প্রফেসর শুঙ্কুও আমাকে অনেক আন্দোলিত করেছে ছোটবেলায়।
বিজ্ঞান নিয়ে টিভি সিরিজ বানানো অনেক দুরের কল্পনা আমাদের জন্য। আমাদের টিভি সিরিজগুলো পড়ে আছে রোমাঞ্চ, খুন-খারাবি আর সস্তা প্রেমের ডায়লগ নিয়ে। আমাদের মা-বাবারা ব্যস্ত থাকেন ভারতীয় সিরিয়াল আর মুভি নিয়ে। শাহরুখ, সালমান আর দিপীকার নাম আমাদের বাচ্চাদের মায়েরাও জানেন।
এদেশে সাংবাদিকরা পড়ে আছে কে কোথায় হেলিকপ্টার বানালো, তেল বাদে বাইক কিভাবে চালালো এইগুলার নিউজ নিয়ে। সংবাদপত্র চাইলে যে কোন জিনিসকে জনপ্রিয় করতে পারে, কিন্তু টিভি আর সংবাদপত্র যদি সুডো-সাইন্সের চর্চা করে তবে ভরসা কার উপর রাখা যায়?
ওয়াজ মাহফিল শুরু হলো বলে, শীতকাল আসন্ন প্রায়। এটা এখন আমাদের কালচারের অংশ হয়ে গেছে। আমরা উন্নত হতে চাই, কিন্তু সেই মানসিকতার বীজ বপন করতে চরম অনীহা। আমরা কোটি টাকা খরচ করে পর্নস্টার, নায়ক গায়ক ভাড়া করতে পারি, কিন্তু দেশের বা বিদেশের কোন বিজ্ঞানীকে হাইলাইট করতে চাই না। কিছু কালচার একদিনে হয় না, তাকে হওয়াতে হয়। বাঙ্গালী বিজ্ঞানীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবেন দেশের বাইরে, কারন সেখানে গবেষনার সুযোগ আছে, বোঝার আর এপ্রিশিয়েট করার মানসিকতা আছে।
আপনি যতক্ষন পর্যন্ত বাইকের ইঞ্জিন দিয়ে হেলিকপ্টার বানানোকে প্রশ্রয় দিয়ে যাবেন আমরা সেটা নিয়ে হাসাহাসি করেই যাবো। আগে এদের পড়াশোনার খোঁজখবর নিন। একাডেমিয়া একদিনে গজায় নাই। এরোন্যাটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আর স্পেস টেকনোলজি নিয়ে পড়তে বাচ্চাদের আগ্রহী করে তুলুন। এই সকল সুডো-সাইন্স দেখলেই ক্যামেরা নিয়ে হুজুগে চলে যাবেন না।
এবার দৃশ্যপট থেকে আমেরিকা শব্দটা বাদ দিন। অন্যকোন দেশের নাম বসিয়ে দিন। জাপান, চীন বা ভারতও হতে পারে। সুজ্যারল্যান্ড, জার্মানি, কানাডাও বসাতে পারেন। এদের সংস্কৃতিও একই রকম। যারাই বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিকে তাদের কালচারের অংশ বানাতে পেরেছে তারাই উন্নতি করছে। এখানে গোপন কোন মন্ত্র নেই। আমরা আজকে থেকে শুরু করলে আমাদের ৫০ বছর লাগবে জাতিকে বদলে দিতে।
শুধু দয়া করে, লাইট বাল্ব আবার আবিষ্কারের চেষ্টা করবেন না। ওটা অপ্রয়োজনীয়, অহেতুক।
আমি বাসা থেকে বের হবার খুব একটা সময় পাইনা। যতুটুকু পাই ততটুকুতেও আমি আসলে বের হতে চাই না। বাজারে গিয়ে কোন একটা জিনিস কিনে নিয়ে আসাটা আমার জন্য বেশ কষ্টসাধ্য বিষয়। কাঁচাবাজারও এই জন্য আমি বেশিরভাগ সময় রাতে কিনি। জানি ঠকছি, তবুও কিনি।
প্রচুর প্রযুক্তি পন্য আমকে কিনতে হয়। আইটি প্রফেশনে থাকায় দরকারি যন্ত্রাংশ কিনতে আমি সাধারণত মাসে একবার এলিফ্যান্ট রোডে যাই। আগে এক বন্ধু সেখানে ব্যবসা করত, তার সাহায্যে সময় বাঁচিয়ে খুব অল্পদামে আমি প্রোডাক্ট কিনতে পারতাম। এখন আর সে নেই।
আমার ভরসার যায়গা এখন অনলাইন থেকে কেনাকাটা করা। যদিও কিছুটা অনাস্থা থেকে যায়, তারপরও চেষ্টা করি বাজারে না গিয়ে বাসায় বসেই যদি সেই কাজটা সেরে ফেলা যায়, তবে দুটো টাকা বেশি গেলেও ক্ষতি নেই।
দারাজ থেকে আমি অনেক অর্ডার করি। চায়নিজ প্রোডাক্টও এরা খুব তাড়াতাড়ি এনে দিতে পারে। কিছুদিন আগে অর্ডার করা একটা এক্সটেনশন কেবল, যেটা আমি মার্কেটে গিয়ে খুঁজেও পাইনি দারাজে অর্ডার দিইয়েছিলাম।
ডেলিভারি ম্যান সাধারণত আমাকে নিচে এসে ফোন দেয়, আমি গিয়ে নিয়ে আসি। আজকে অদ্ভুত বিষয় হল, দারাজের একজন ডেলিভারি ম্যান ফোন দিয়ে আমাকে বলল, "আমার শরীর খারাপ লাগছে আমি চলে এসেছি হাবে। আপনার প্রোডাক্টটি আমি ডেলিভারড দেখিয়ে দিলাম। কালকে জুমার নামাযের আগে আমি আপনাকে দিয়ে যাবো।"
আমি ছোট্ট করে বললাম, ঠিক আছে।
আমার সমস্যা নেই, এটা অত জরুরী কিছু না। কাল নিলেও হবে। কিন্তু পরক্ষনেই মনে হল, ডেলিভারি কালকেই করুক, কিন্তু ডেলিভারড দেখাতে হবে কেন?
কেবলের দাম বেশি না। সে যদি এটা গায়েব করেও দেয় তবে আমার বিশেষ কোন ক্ষতি হবেনা। তবে আমার মানসিক ক্ষতি হচ্ছে, আমি একে অবিশ্বাস করছি। সে হয়ত আজকে ক্লান্ত তাই দিতে পারছে না, আগামীকাল দেবে। আর রাত ৮ টা বেজে গেছে, সবারই এখন বাসায় ফেরার তাড়া।
কিন্তু আমি এদের অবিশ্বাস করা শুরু করেছি। এমন না যে, আমার কোন প্রোডাক্ট আমি ডেলিভারি পাইনি, বা এর আগেও তারা না দিয়েই বলেছে, দিয়েছি...। তবুও হঠাত করে এই শ'পাঁচেক টাকার প্রোডাক্টের জন্য আমি একজন মানুষকে সময়ের আগেই অবিশ্বাস করছি।
নৈতিকভাবে কি দৃঢ়তা হারাচ্ছি?
আমি মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকতে রাজি আছি, প্রথমবার। দ্বিতীয়বার বোকা সাজতে রাজি না। কিন্তু এই যে অস্থিরতা গত কয়েকদিন আমার মাঝখানে চলে এসেছে সেটা উপভোগ করতে পারছি না।
প্যানিক এটাকে আবার আক্রান্ত হতে যাচ্ছি মনে হয়।
আমি জীবনে অনেকবার ঠকেছি, শিখেছি, কিন্তু কখনো মনোবল হারাইনি। আমাকে যারা ঠকিয়েছে তারা সবাই আমার পরিচিত। অপিরিচিত মানুষের কাছে ঠকেছি খুব কম। হতাশার বিষয় হল মানুষ ঠকানোর শিক্ষা পরিচিতজনের কাছ থেকে নিতে হয়েছে আমাকে।
আমার সমস্যা বা অভাবের কথা আমি কাউকে বলি না। তাতে আমার পরিচিত জনদের ধারনা এই মানুষটা বোধহয় একটা সমস্যাবিহীন জীবনযাপন করে। নারে ভাই, রক্ত মাংসের মানুষ আমি। আপনাদের মত আমাকেও সংসারের বাজেট নিয়ে চিন্তা করতে হয়, কি তরকারি রান্না হবে সেই চিন্তা করতে হয়। বাচ্চার স্কুল, টিফিন নিয়ে চিন্তা করতে হয়। আমার বিশেষত্ব হচ্ছে, আপনি এগুলো নিয়ে গসিপ করেন, আমি করি না।
আমি নিভৃতে চিন্তা করতে ভালোবাসি।খুব কাছের দু-তিনজন বন্ধুবাদে আমি কারো সাথে সময় নষ্ট করে আড্ডাও দিতে চাই না।
সেদিন অনেক আগের এক বন্ধু, যে লেখালেখি করে, সে আমাকে বলল দেশে এলে আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমি অপারগতা জানালাম। কারো সাথে বসে আড্ডা দিতে এখন আর ইচ্ছে করে না। অনেক দূর থেকে কেউ একজন এসে অনিচ্ছুক একটা চেহারা দেখুক, সেটাও চাই না।
দিনদিন ঘরকুনো হয়ে যাচ্ছি। আমার শুধু দরকার এক রুম ভর্তি বই, একটা কম্পিউটার আর কফি।
আমার কিছু ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি দুই ধরনের মানুষকে এড়িয়ে চলি। রাজনৈতিক আর ধার্মিক। এরা প্রচন্ড পরিমানে হিপোক্রেসি নিয়ে জীবন যাপন করে।
রাজনীতি যারা করে তারা সত্য বলে না, চাইলেও বলতে পারে না। তবে লোকে এদের ভয় পায়, সমীহ করে কারন মানুষের ক্ষতি করার ক্ষমতা এদের আছে।
আবার আশেপাশে, এমনকি নিজ পরিচিত জনের মধ্যেও যত ধার্মিক আমি দেখেছি তারা কেউই সৎ নয়। এরাও অনবরত মিথ্যা বলে এবং অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে এরা মনে প্রচন্ড রকমের অস্বাস্থ্যকর একটা ঘৃণা নিয়ে জীবনযাপন করে।
কোন শিশুকেই আমি বর্ণবাদী আর ঘৃণা পোষন করতে দেখিনি। এরা সবার সাথে সমানভাবে মিশতে পারে। কিন্তু বড় হতে হতে এরা শিখে যায় কিভাবে একটা বিশেষ রঙকে ঘৃণা করতে হয়, কোন জাতিকে ঘৃণা করতে হয়। এই অসুস্থ মানসিকতা প্রাপ্তবয়স্করা শিশুদের মাঝে চালান করে। বংশানুক্রমে এই বিভাজনের খেলা চলছে।
চিন্তা-ভাবনা করাটা কঠিন একটা কাজ। বেশিরভাগ মানুষ এই কাজে অক্ষম। তাই যে কোন ঘটনায় তারা হুট করে একটা সিদ্বান্তে চলে আসে, একটা রায় দিয়ে দেয়। এই রায়টা নির্ভর করে ব্যাক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা আর কি ধরনের তথ্য তার কাছে আছে সেটার উপর।
বাংলাদেশের মানুষ যে কোন ঘটনায় কোন ব্যক্তিকে যখন "খারাপ বা ভালো"র সনদ দেয়, তখন তারা দুটো জিনিসের পরিচয় দেয়, দলান্ধতা আর ধর্মান্ধতা।
আপনি কোন রাজনৈতিক দল করেন আর কোন ধর্মের অনুসারী, সেটার উপর নির্ভর করবে আপনি ভালো না খারাপ। সামষ্টিক ভাবে জাতি হিসেবে বাঙ্গালী খুবই উঁচু মানের রেসিস্ট। ব্যাক্তি বিশেষে অনেক ভালো মনের মানুষ আমি দেখেছি।
সৈয়দ শামসুল হক - আমি তাকে চিনি কবি হিসেবে। তার কোন কবিতা আমার মুখস্ত নেই। তবে অনেকগুলোই পত্রিকা মারফত পড়েছি। বিশেষ করে একটি কবিতার কথা আমার মনে আছে, "নূরুলদীনের কথা মনে পড়ে যায়" - নামে।
একটু কোট করা যাকঃ
অতি অকস্মাৎ
স্তব্ধতার দেহ ছিঁড়ে কোন ধ্বনি? কোন শব্দ? কিসের প্রপাত?
গোল হয়ে আসুন সকলে,
ঘন হয়ে আসুন সকলে,
আমার মিনতি আজ স্থির হয়ে বসুন সকলে।
অতীত হঠাৎ হাতে হানা দেয় মানুষের বন্ধ দরোজায়।
এই তীব্র স্বচ্ছ পূর্ণিমায়
নুরুলদীনের কথা মনে পড়ে যায়।
কালঘুম যখন বাংলায়
তার দীর্ঘ দেহ নিয়ে আবার নূরলদীন দেখা দেয় মরা আঙিনায়।
এটা তার বিখ্যাত কবিতা। অনেকেই পড়েছেন।
টিভিতে তিনি মাঝে মধ্যে আসতেন। কৈশোরে বিটিভিতে তার কবিতার আবৃত্তি শুনেছি। বিংশ শতাব্দীর বাঙ্গালী কবিদের মধ্য তাকে আলাদা ভাবে চেনা যায়।
গল্পকার হিসেবেও তিনি সাবলীল। তবে তিনি যে সায়েন্স ফিকশনও লিখে গেছে সেটা আমার একদমই অজানা ছিল। সেদিন বেঙ্গল বইয়ে ঢু মারছিলাম, সময় পেলেই করি। বইয়ের গন্ধ আমার ভাল লাগে। সেখানেই হটাত করে নজরে আসে তার সায়েন্স ফিকশন সমগ্রতে।

"মহাশুন্যে পরান মাস্টার" এবং "মেঘ ও মেশিন" - এই দুটো গল্প আছে বইটিতে। সায়েন্স ফিকশন যে এমনও হতে পারে সেটা আসলে না পড়লে আমার জানা হতনা।
মাটির কাছাকাছি গিয়ে গল্প বলা - এরকম ভাবে যদি বলি তবে বেশি বলা হবে না। খুব সাধারণ এক গ্রাম্য পাগলের গল্পকে নিয়ে গেছেন সমাজের একটা শক্তিশালী চিত্র তুলে ধরতে। সেখানে অভাব আছে, অভিযোগ আছে আর আছে আশার গল্প। অলৌকিক ভাবে ক্ষুধার সমস্যা সমাধানের গল্প।
পরের গল্প মেঘ ও মেশিনে তিনে আসলে নিজেকেই খুঁজে বেড়িয়েছেন। নিজের চরিত্র এঁকেছেন এক কঠোর সমাজের মাঝখানে। যেখানে প্রেম, ভালোবাসা নাই, কবিতা, গল্প আর গান অনুপস্থিত। এরকম একটা সমাজে বিপ্লবের স্বপ্ন তিনি দেখেছেন সবজান্তা এক "মাইন্ড রিডার" মেশিনের হাত ধরে। যান্ত্রিক আর স্বার্থানেষী মহলের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি কিভাবে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন সেটাই মূল এই গল্পে।
গতানুগতিক সায়েন্স ফিকশন নয় এই দুটো গল্পের একটিও। যারা অতীত, ভবিষ্যত আর সময়ের রহস্য খুঁজে বেড়ান বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মাঝে এই বই তাদের ভালো লাগবে না।
সৈয়দ হক ভবিষ্যতের কথা বলেছেন ঠিকই কিন্তু আমি দেখেছি বর্তমান আর অতীতকে। সুখপাঠ্য নয়, তবে চিন্তার উদ্রেক করবে বইয়ের গল্প দুটো।
ঘৃণা অত্যন্ত ব্যাক্তিগত একটি বিষয়। আপনি কাকে ঘৃণা করবেন সেটা নির্ভর করে তার দ্বারা আপনার কি পরিমানে ক্ষতি হচ্ছে সেটার উপর।
অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, মানুষই বোধহয় একমাত্র প্রজাতি যারা শারীরিক ক্ষতির আশংকা না থাকা স্বত্তেও অন্যপ্রজাতি বা অন্য মানুষকে ঘৃণা করে শুধুমাত্র বিশ্বাসের বলি হয়ে।
বিশ্বাসের ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। মানব সভ্যতার প্রায় পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। সেই শুরু থেকেই মানুষ উত্তর খুঁজে বেড়িয়েছে আমরা কে, এবং কোথা থেকে এসেছি? সেই উত্তর খুঁজতে যেয়ে এসেছে নানা ধরনের ধর্ম বিশ্বাস। চাঁদ, সূর্য আর সমুদ্রকেও সৃষ্টিকর্তা ভেবেছে একসময় মানুষ।
মানুষের চিন্তার উন্মেষ তখন খুব বেশি ছিলো বলে মনে হয়না। চোখের সামনে নিজের থেকে বড় যা কিছুই দেখেছে তাতেই ঈশ্বরের ছায়া দেখতে পেয়েছে।
প্রাচীন গ্রীকদের কথা যদি ধরি - সমুদ্র দেবতা পসাইডেন ছিলেন তাদের বিশ্বাসের অংশ। তখন জিউস শাসন করতেন মাউন্ট অলিম্পাস থেকে। তিনি মানব জাতির পিতাও বটে। আর তার ভাই হেডিস ছিলেন পাতালপুরির নিয়ন্ত্রন কর্তা। এক জটিল পারিবারিক নিয়মে পৃথিবীর ঘটনাবলি নিয়ন্ত্রিত আর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিল গ্রীকবাসী।
গ্রীকদের সমসাময়িক কালে আরো যারা পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিল তাদের নিজেদেরও অনেক দেবদেবী ছিলো। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবেই অনেক ঈশ্বরের উপাসনা করা হত। গোত্র, পরিবার এবং একটা সমাজের আকারের উপর নির্ভর করত কাদের দেব-দেবী বেশি শক্তিশালী। খোদ মক্কার কাবা ঘরেই একশর মত মূর্তি ছিল। এমনকি এদের অনেকের নামও ছিলো না।
প্রাচীন ব্যাবিলনের কথাই বলি, তাদের মতে দেবতা এনলিল জীবন্ত প্রানী তৈরি করার কথা ভেবেছিলেন। এনলিল ছিলো স্বর্গ আর পৃথিবীর স্রষ্টা। তিনি মানুষ তৈরির কাজ দিয়েছিলেন জ্ঞানের দেবতা এনকি'কে। আরেক দেবী নিনহারসাগ (Ninhursag) দেবতাদের আদলে মানুষের মুর্তি তৈরি করেছিলেন মাটিতে ঢালাই করে। এরপর এনলিলের রক্ত এই মূর্তিকে জীবন এবং জ্ঞান দিয়েছিল।
সৃষ্টিজগতকে ব্যাখ্যা করার এই সকল প্রাচীন চেষ্টা থেকেই উদ্ভব হয়েছে নানা ধরনের বিশ্বাস আর ধর্মের। এই বিশ্বাসগুলোই নিয়ন্ত্রন করত তখনকার সমাজব্যবস্থা আর গোত্রীয় বা রাষ্ট্রীয় আইন।
এত কথা বলার মানে হল, বিশ্বাস সমসময়ই মানব সভ্যতার গুরুত্বপুর্ন চালিকা শক্তি ছিলো। এই বিশ্বাসের বলি হয়েই যুদ্ধ হয়েছে, রাষ্ট্র ভেঙ্গেছে, গড়েছে, মানব হত্যা হয়েছে, ইতিহাসের পট পরিবর্তন হয়েছে।
একেশ্বরবাদের ধারনা এসেছে আরো অনেক পরে। যখন মানুষের সভ্যতা একটা শক্ত ভিত পেয়েছে তখন। বিশ্বাসকে তারা একটা যৌক্তিক আদল দেয়ার চেষ্টা করেছেন। বিশ্বাস যেমন সভ্যতা গড়েছে তেমনি ধ্বংসও করেছে।
বর্তমানের আধুনিক মানুষও কিন্তু বিশ্বাসের এই খেলা থেকে মুক্ত নয়। তবে চিন্তার উন্মেষ ঘটার কারনে আমাদের বিশ্বাস আরো বিস্তৃত হয়েছে। আমরা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিশ্বাস করি, আইনে বিশ্বাস করি। ধর্মে বিশ্বাস করে ভালবাসি বা ঘৃণা করি।
এত এত কাল্পনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে শুধুমাত্র বিশ্বাসের উপর ভর করেই। এগুলো সভ্যতার দিক পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখছে।
টাকার কথাই ধরুন। টাকা বর্ডার ভেদে ভিন্ন ভিন্ন রুপে আছে। কিন্তু এর একটা বৈশ্বিক রুপান্তর আছে। পৃথিবীর এক দেশের মুদ্রা আপনি অন্যদেশের মুদ্রায় রুপান্তর করতে পারবেন। কোন দেশের মুদ্রা কতটা রুপান্তর করা যায় তা নির্ভর করে একটা রাষ্ট্র কতটা শক্তিশালি তার উপর।
বর্তমান পৃথিবীতে আমেরিকান ডলার সবচেয়ে বেশি রুপান্তর সক্ষম মুদ্রা। কারন পৃথিবী বিশ্বাস করে আমেরিকা সামরিক শক্তিতে একটা সুপারপাওয়ার।
টাকা দিয়ে আপনি অন্য যে কোন জিনিস কিনতে পারেন, কারন মানুষ বিশ্বাস করে এই কাগজের জিনসটার একটা বিনিময় মূল্য আছে। এই বিশ্বাসের পেছনে কারন ব্যাংক, রাষ্ট্র এবং সামরিক শক্তি।
বন্ধুকের ক্ষেত্রেও কথাটা সত্য। যতক্ষন পর্যন্ত না তা ব্যবহার করা হচ্ছে মানুষ সেটাকে ভয় পায় এবং সমীহ করে। তার দৃঢ় বিশ্বাস থাকে বন্দুক সমাজ এবং ব্যাক্তিকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে। এই বিশ্বাসই মুল শক্তি। এর ফলে যা হয়, মাত্র ২ লক্ষের মত সৈনিক দিয়ে আপনি ২০ কোটি জনগণকে নিয়ন্ত্রন করতে পারেন।
যখন এই বিশ্বাস (ভয়) ভেঙে যায়, তখন মাত্র অল্প কিছু পুলিশ আর সেনাবাহিনী দিয়ে দেশের জনগনকে নিয়ন্ত্রন করা যায় না।
এদেশে ২০২৪ সালে তাই হয়েছে। মানুষের ভেতরের বিশ্বাসটা নড়বড়ে হয়ে গেছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থা তার ভালো চায় এই বিশ্বাসে ঘুন ধরেছিল আরো অনেক আগেই। আগুনটা জ্বলেছে ২০২৪ এর জুলাইতে এসে।
এখন আমরা কার উপর বিশ্বাস স্থাপন করব সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না। বিরোধী মতে বিশ্বাসী লোকজন একে অপরকে হত্যা করছে। এমনকি সরকার পতনের পরও খুন খারাবি বন্ধ হয় নাই। দেশের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানুষ হত্যা চলছে।
ধর্মে ঘোরতর অবিশ্বাসী লোকজনও রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে চায়, গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্রের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে আস্থা রাখতে চায়। রাষ্ট্র যেমন একটা কাল্পনিক বিশ্বাসের উপর ভর করে চলে, আমাদের আইন আদালতও তাই। আমরা মানুষেরা নিজেরাই কিছু নিয়ম কানুন বানিয়েছি যেন জোর যার মুলুক তার এই সত্য থেকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা যায়।
একটা রাষ্ট্র তখনই ভেঙে পড়ে যখন আমাদের বানানো সংবিধান আর আইনের প্রতি আমাদের বিশ্বাস দূর্বল হয়ে যায়। আমরা এখন সেই অবস্থায় আছি। এই বিশ্বাস পুনরায় কিভাবে বাড়ানো যায় সে চেষ্টা না করলে পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিলিন হয়ে যাবে।
ঘৃনা ব্যক্তিগত এবং এর উৎপত্তি বিশ্বাস থেকে। যেহেতু আইনের প্রতি আর বিশ্বাস নেই, শ্রদ্ধাও নেই। তাই চোর সন্দেহে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলাটা যায়েজ। দালাল, আওয়ামীলীগ বা রাজাকার সন্দেহে মানুষ হত্যা করাও যায়েজ। পুরোটাই নির্ভর করে আপনি কি মানবতায় বিশ্বাস করেন নাকি জাস্টিস অন দ্যা স্পটে বিশ্বাস করেন তার উপর।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ৭০ হাজার রাশিয়ান যোদ্ধা মারা গেছেন। এদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এরা যুদ্ধে গেছে একটা বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এই বিশাল অংকের মানুষের মৃত্যুতে মানবজাতির কোন উপকার হয়নি। পুরো পৃথিবী জুড়েই চলছে এই বিশ্বাসের দ্বন্দ।
এটা কি কোনদিন বন্ধ হবে?
ইতিহাস যদি ভবিষৎবাণী করতে পারে, তবে সেই ধারা অনুযায়ি মানুষ একে অপরকে হত্যা বন্ধ করবে না। সর্বদাই তারা বিভিন্ন মতবাদে বিশ্বাস করে আলাদা আলাদা দলে ভাগ হবে এবং নিজ প্রজাতি হত্যাকে অনুমোদন দেবে।
গতকালকের থেকে আজ বা আগামীকাল ভালো যাবে এই বিশ্বাসে বেঁচে থাকা লোকগুলো এখন ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছে না। তাদের সামনে কোন কিছুর উপর আস্থা আর বিশ্বাস রাখার অবস্থা নেই। এরা প্রচন্ড পরিমানে হতাশ আর খুনি হবে। আদিম বিশ্বাসে ফেরত যাবে, মব জাস্টিস অনুমোদন করবে।
সবাই কিন্তু মানুষ, তারপরেও সে অন্য আরেক মানুষের ক্ষতি করে বা মেরে ফেলে শুধু মাত্র কোন একটা আদর্শ আর বিশ্বাসের বলে।
সমাধান কি?
সমাধান আছে যুক্তিতে। জগতের কোন উপকার না হলে আপনি মানুষ হত্যা করবেন না। না ব্যাক্তি না রাষ্ট্র, কাউকেই মানুষ হত্যার অনুমোদন দেয়া যাবে না। সে জন্যে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাটা খুব জরুরী। নয়ত এই সাপ কোন একদিন আপনাকেই কামড়ে দেবে।
অশিক্ষিত/কুশিক্ষিত মানুষ যৌক্তিক নয়। তার যত সম্পদ আর ডিগ্রিই থাকুক না কেন, সে ভয়ংকর। আমাদের দেশ ইউরোপ বা কানাডা হবে না। বরং আমরা পালিয়ে গিয়ে ওইসব দেশে আশ্রয় নেবো। কারন ওই অঞ্চলের লোকজন শিক্ষিত এবং তাদের সমাজ ব্যবস্থা আমাদের থেকে উন্নত। চিন্তা, চেতনা আর নতুন আবিষ্কারে আমাদের থেকে তাদের যোজন ব্যবধান। এরা কিন্তু ধর্মের বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে এই রকম সমাজ ব্যবস্থা বানায়নি।
আরেকটা জিনিস মনে করিয়ে দেয়া দরকার, দরিদ্র্য এবং চিন্তা ভাবনায় অনগ্রসর সমাজেই কিন্তু ধর্মীয় ভয় এবং বিশ্বাসের বেশি প্রচলন থাকে। বাংলাদেশেও তাই চলে। ধর্ম একটা নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা, কিন্তু যখন আপনার রাষ্ট্র তার থেকে উন্নত ব্যবস্থা প্রদান করতে পারবে, খুব স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে ধর্মীয় আইন গৌন হয়ে যাবে। ইউরোপের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। সেখানে ধর্ম আনুষ্ঠানিক রুপে আছে, কার্যত সমাজে এর প্রয়োগ আর আচরন কম।
আমরা বর্ণবাদকে ঘৃণা করি। কিন্তু বিয়ের সময় সাদা চামড়া খুঁজি। আমরা সব মানুষ সমানের কথা বলি, কিন্তু ধর্মের কারনে কারো বাসায় আগুন দিতে দ্বিধা করি না। আমরা গণতন্ত্রের বুলি আওড়াই, কিন্তু ক্ষমতার পট পরিবর্তনে বিশ্বাস করি না। অদ্ভুত এক অন্ধকারে ডুবে থাকা জাতি আমরা।
বাক স্বাধীনতা চাই বটে, কিন্তু বিরুদ্ধ মতকে স্বাগত জানাতে আমাদের শেখানো হয় না। এদেশে গণতন্ত্র এখনো আসেনি, কারন অযৌক্তিক আর কুশিক্ষত মানুষ দিয়ে দেশটা ভরা।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা আর গবেষণা বাদে আর সব কিছুই হচ্ছে। নেতাদের মিছিল হচ্ছে, মানুষ খুন হচ্ছে, কাওয়ালি হচ্ছে, মিলাদ মাহফিল হচ্ছে। একটা সভ্য জাতির জন্য যা যা দরকার, তার বেশিরভাগ উপকরণই আমাদের নেই।
মেধাবী হবার আগে মানুষ হতে হয়, মানুষ হত্যা বন্ধ করতে হয়।
আমরা কিছু অণুর সমষ্টি মাত্র, যারা অন্য অণুদের নিয়ে গবেষনা করছি। আমরা মহাবিশ্বের সেই অংশ যে নিজেই খুঁজে বেড়াচ্ছে সে কে এবং কোথা থেকে এসেছে? এই প্রশ্নের উত্তর পাবার পর সব কিছু জানা হয়ে যাবে এবং জগতের সব প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রকৃতি বারংবার বিভিন্ন প্রজাতি তৈরি করবে এই উত্তর খোঁজার জন্য।

কবি-সাহিত্যিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সমালোচনা সহ্য করতে না পারা। যেহেতু তারা সৃষ্টিশীল মানসিক খোরাক উৎপাদনে ব্যস্ত থাকেন, তাদের ধারনা তারা যাই প্রসব করবেন সেটাই পাচ্য।
পরিচিত কারো লেখা যদি ভাল না লাগে তাই চুপ থাকি। কি দরকার। কালের গর্ভে এমনিতেই সেটা হারিয়ে যাবে। যদি কারো অন্তঃসারশূন্য লেখাও ভালো না লাগে তবে সেটা বলা যাবে না। বললেই কাট্টি।
বাংলাদেশের বয়স খুব বেশি না। আমাদের বুদ্ধিজীবির সংখ্যাও হাতে গোনা। বিশাল বড় কোন দার্শনিকও আমাদের এখানে জন্মাননি যারা পৃথিবী ব্যাপ্তি নিয়ে আলোচনায় আছেন বা থাকবেন।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এরা নমস্য। এদের নিয়ে মাতম করা বাতুলতা। ছাগলের তিন নম্বরের বাচ্চার কাজ। সে জানে না তার কি করা উচিৎ, তাই অযথাই...। যারা নজরুল পড়েনি তারাও তাকে ভালবেসে নিজেদের দলে টানতে চায়। তিনি যে সেকুল্যার মতাদর্শের ছিলেন এরা সেটা অবিশ্বাস করে।
রবীন্দ্রনাথ যে হিন্দু ছিলেন না, বরঞ্চ ব্রাহ্ম ধর্মের মতানুসারী এরা তাও খতিয়ে দেখে না। ঘৃণা করা দরকার তাই করছি। কান নিয়েছে চিলের মত তাই অনেক লোকই মনে করে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়াটা নজরুলের বদান্যতায়। সোজা বাংলায় চুরি। অথচ বয়সের হিসেবে রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান নজরুল তখন বালক মাত্র।
বেশির ভাগ লোকজন না পড়েই, না জেনেই সাহিত্য বা তার স্রষ্টাকে ঘৃণা করে। সাহিত্যকর্মের উদ্দেশ্য কখনই মারামারি লাগানো নয়। ভালোবাসতে কারন দরকার হয় না। ঘৃণা করতে দরকার।
বাংলাদেশ ২.০ লোড হবার পরে, আমি ইউটিউবে যে লোকটার বক্তৃতা সব থেকে বেশি শুনি তিনি হচ্ছেন, সলিমুল্লাহ খান। ইনি আবার আহমদ ছফার শিষ্য। চরম বাগ্মী এই লোক যখন কথা বলা শুরু করেন তখন আমি দুই প্লেট বিরিয়ানি এমনিতেই শেষ করে দিতে পারি।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তিনি যখন বলা শুরু করেন তখন এক রেললাইন থেকে গাড়ি অন্য রেললাইনে চালিয়ে দেন। On Track এ থাকতে পারেন না। বলা শুরু করেন শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কিন্তু মাঝখানে চলে গেলেন বাংলাদেশের ১০০ বছরের ইতিহাসে, রাজনীতিতে...। তবুও ভালো লাগে।
তিনি মিথ্যা বলেন না। একারনেই তাকে শুনতে ভাল লাগে। তার দেয়া বর্ননাও অহীর মত আকাশ থেকে এসে পড়েনি। তিনি ফ্যাক্ট দিয়ে বলার চেষ্টা করেন। অনেকটা রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের মত। প্রচন্ড পড়ুয়া লোক। এরকম আরেকজনের কথা আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনি, তিনি হচ্ছেন ইয়োভাল নোয়া হারারি। শুধু তার লেখাই নয়, তার বলার ভঙ্গিও চমৎকার।
এনারা নমস্য, কারন এদের চিন্তাভাবনা আর সিদ্ধ্বান্ত ধর্ম থেকে আসে না, আসে নিজস্ব শিক্ষার দর্শন থেকে। এরা যখন কোন কিছু বললেন তখন ধর্মীয় বায়াসনেস থেকে সরে এসে বলার চেষ্টায় থাকেন। এই জিনিসটাই হচ্ছে সেক্যুলারিজম। নাস্তিকতা থেকে এর স্পষ্ট ব্যবধান আছে।
রাষ্ট্র যদি নিরপেক্ষ না হয় তবে এই ধরনের বুদ্ধিজীবি গজায় না। রাষ্ট্রের কোন ধর্ম নেই, কারন সে ব্যাক্তি নয়। ব্যক্তির ধর্ম থাকে। বাংলাদেশকে তার নিজস্ব পরিচয় থেকে মুছে দিতে চান, তবে শুধুমাত্র এর বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে নিয়োজিত লোকগুলোকে ছাঁটাই করে ফেলুন। এরকমটা আগেও হয়েছে।
এমন একটা শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা তৈরি করেছি, যেখানে গন্ডায় গন্ডায় এ-প্লাস বের হয়ে আসে। এরা নিজেদের মেধাবী দাবী করে, কিন্তু চাকুরির আশায় হাঁ করে বসে থাকে। এই ব্যবস্থা চাকুরীর জন্য চাকর চায়, মেধাবী নয়।
আমাদের শিক্ষা আনন্দদায়ক নয়।
দেশ নিয়ে লেখাটা খুব কঠিন। যাই লিখবেন না কেন, কিছু লোকের আঁতে ঘা লাগবেই। আমি সবসময়ই বলে এসেছি মূর্খের দেশে গণতন্ত্র থাকে না। যতই বিপ্লব হোক আর মানুষ মরুক বছর শেষে দেখা যাবে এদেশের মানুষ দশ বছর আগে যে মানসিকতার ছিলো এখনো তাই রয়ে গেছে।
গনতন্ত্রের সুফল পেতে হলে দেশের ৮০ ভাগ জনগণকে রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত হতে হবে। অতবা নূন্যতম নৈতিক মূল্যবোধ থাকতে হবে। এ দুটোই গড়ে ওঠে শিক্ষা ব্যবস্থা অথবা সাংস্কৃতিক বলয় থেকে। আমাদের না আছে ধর্মীয় শিক্ষা, না আছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অথবা নৈতিক দৃঢ়তা। মক্তবে যা বলা হয়, আর হুজুরে ওয়াজে যা বলে তাই বিশ্বাস করে বসে থাকে বেশিরভাগ লোক। রাজনৈতিক নেতায় মাইকে যেভাবে চিল্লায়, সহমত ভাইয়েরা সেভাবেই ঘাড় নাড়ে।
চিন্তা করে নিজে ভালো মন্দ বুঝে সিদ্ধান্ত নেবার লোক খুব কম। আমরা না মানুষ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের জন্য হয়ে গেছে ক্যানসারের মত। যত ধরনের গুজব আছে সব গুলোকে গুলিয়ে এখানে পরিবেশন করা হচ্ছে। গত পনের বছরে মানুষের মুখের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল এটা সত্য কথা, কিন্তু এখন যা হচ্ছে সেটাও আলাদা কিছু নয়। সবাই কে এক দলের হতে হবে এমন একটা দিব্যি নিয়ে নিয়েছে সবাই। তুমি কাউকে ঘৃণা করো মানে এই নয় যে আমাকেও সেই একই ব্যাক্তিকে ঘৃণা করতে হবে!
২০২৪ সালের শেষে এসে দেশ ইসলামিস্টদের দখলে না গেলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তাদের দখলে। হেন জিনিস নেই এরা বিকৃত করছে না। ধর্মের উদারতা এদের শিক্ষায় নেই। খুব মোটা দাগে সোশ্যাল মিডিয়া বিবেচনায় - কেউ যদি হুট করে বলে দেয় বাংলাদেশ একটা মৌলবাদী রাষ্ট্র, আপনি তাকে ভূল প্রমান করতে পারবেন না।
আমাদের ধর্মান্ধরা বরাবরই বলে এসেছে এটা একটা মুসলিম রাষ্ট্র, অথচ সংবিধান বলে ভিন্ন কথা। এই রাষ্ট্র সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে।
আঘাতটা সবসময় সবার আগে আসে সংস্কৃতির উপর। যাত্রা গান, পালা গান, পহেলা বৈশাখ, পথ নাটক, একুশের প্রভাত ফেরী, শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, রবীন্দ্রনাথ সব কিছুতেই এই দলের প্রচুর আপত্তি। তারা পারলে এখনই শহীদ মিনার ভেঙে ফেলত, জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করত।
পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাবার পরেও, বিশাল ভূ-রাজনৈতিক দূরত্ব থাকার পরেও এই জনগোষ্ঠীর একাংশ পাকিস্তান প্রেমী।
ভারতকে অপছন্দ বা ঘৃণা করার একশটা কারন থাকতে পারে কিন্তু পাকিস্তানকে ভালোবাসার একটা কারনও আমি খুঁজে পাইনা।
শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে যে দেশগুলো ভাগ হয়েছে তারা নিয়তির লিখন খন্ডাতে পারবে না। এসকল জায়গায় ক্যাঁচাল সারাবছর লেগে থাকবেই।
নতুন সরকার এসে আপাত দৃষ্টিতে খুব বেশি পরিবর্তন আনতে পারেনি। রাস্তার শৃঙ্খলা আগেও কম ছিল, এখন তা পুরোপুরি ভেঙে যাবার পথে। শহর জুড়ে অটো রিকশা চলছে কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে। ক্ষেত্র বিশেষে এরা প্রাইভেট কারের ড্রাইভারকে গালিগালাজ করছে আস্তে চালানোর জন্য। আমি নিজে এর স্বাক্ষী।
ব্যবসায়ীরা আগেও দুই নাম্বারী করত এখনো তাই করে যাচ্ছে। যা কিছু ঘটছে এই দেশের সীমানায় তা এই জনপদ থেকে উঠে আসা বাঙ্গালীই করছে। তাই নীতিগত ভাবে বলাই যায়, বাঙালি একটা অসভ্য জাতি।
বাক স্বাধীনতা মানে, গলার জোরে আরেকজনের কন্ঠরোধ করা নয়, আগে চাঁদাবাজি করতে পারতাম না এখন অবাধে পারি সেটা নয়। ধর্মের নামে দেশের নাম পরিচয় মুছে দেবার চেষ্টা করা, সংস্কৃতিকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা, কিংবা জাতীয় সংগীতকে মুছে ফেলার নাম বাক স্বাধীনতা নয়।
রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকে না। রাষ্ট্র একটা ধারনা মাত্র। ধর্ম মানুষের খুব ব্যাক্তিগত একটা বিষয়। আমরা সেটাকে খুব স্থূলভাবে কর্দমাক্ত করে ফেলছি। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে জলঘোলা করা যাবে, ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া যাবে, মানুষ খুন করা যাবে- কিন্তু মানুষ হওয়া যাবে না।
দেশ একটা সংকটময় সময় পার করছে। সদ্য এক সরকারের পতন হয়েছে ছাত্র জনতার বিপ্লবে। কার্যত আইন আদালত সব থমকে গেছে। প্রথম কদিন গেলো ডাকাতের কবলে। রাত হলেই "বর্গি এলো দেশে"র মত করে শহরের অলিগলিতে এদের উপদ্রব শুরু হলো। কিন্তু ঠেকিয়ে দিলো জনতা। তারা রাত জেগে পাহারা দিতে লাগলো নিজেদের এলাকা। একতাই বল।
নৈতিক মনোবল হারানো পুলিশ রাস্তায় না থাকলেও জনতা জাগ্রত।
ডাকাত ধরার পর মাইর, এরপর শুরু হলো অভিনব কায়দায় মানসিক টর্চার। ডাকাতদের বেশিরভাগই যেহেতু ইয়াং বয়সের, তাদের দিয়ে নাচ-গানের প্রতিযোগিতা চালালো এই জেনারেশন। বাংলাদেশ আসলেই অদ্ভুত। বুড়োদের মাঝে আতংক আর কিশোর-যুবকেরা ব্যপারটাকে উৎসবের পর্যায়ে নিয়ে গেলো।
আমি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে ফেইসবুকে এইসব ভিডিও দেখলাম। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাকাতের জন্য মায়াও লাগল। এরা নিশ্চয়ই এইরকম পরিস্থিতিতে পড়বে সারাজীবনেও তা কল্পনা করেনি।
Bangladesh is absolute cinema.
এরপর আবার পুরনো রুপে ফিরে এলো আন্দোলন। এতদিন যারা কোন দাবি জানায়নি এবার তারাও প্রতিদিনই কোন না কোন দাবি নিয়ে ঢাকার রাস্তা দখল করতে লাগল। গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে চাঁদাবাজেরা আবার শুরু করল হুমকি ধামকি। আর্মি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও, রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় এই অভিশাপ আবার শুরু হবে এতে কোন সন্দেহ নাই। ছাত্ররা একসময় ঘরে ফিরে যাবে, নিজের পড়াশোনায় মন দেবে। এই পরজীবীরা তখন আবার দেশের আনাচে কানাচে ভরে যাবে।
অগাষ্টের শেষে এসে আবার সমস্যায় পড়ল দেশ। চরমভাবে বন্যায় আক্রান্ত হল ফেনী, নোয়াখালী এবং সিলেট অঞ্চল। অতিবৃষ্টি আছেই, সেই সাথে আছে বর্তমানে দায়িত্ব নেয়া প্রশাসনের অদক্ষতা। ভারত তার বাঁধ খুলে দিতে বাধ্য হওয়ায় বন্যার তীব্রতা আরো বাড়ল।
অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে এই বন্যার পূর্বাভাস কিন্তু অনেক আগে থেকেই ছিলো। কিন্তু দেশের এই ডামাডোলে কেউ নজর দেয়নি। ভারত বিরোধিতা যেহেতু অনেক আগে থেকেই আছে দেশে, তাই ফেইসবুক ছেয়ে গেলো ভারতকে দোষ দেয়াতে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কোন বাঁধ দিয়ে এই পরিমান পানি আটকে রাখা সম্ভব না।
উজানের দেশ ভারত থেকে ভাটির দেশ বাংলাদেশে পানি আসবেই ফিজিক্সের সূত্র মেনে। ওখানে বন্যা হলে এখানেও বন্যা হবে। আটকানোটা প্রায় অসম্ভব।
দোষ দেয়া বন্ধ করে আমাদের উচিৎ নিজেদের সামর্থ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া বন্যার্তদের সাহায্যে। দ্বিধাবিভক্ত বাঙ্গালী আবারো এক হয়েছে। Absolute সিনেমার মত করে তারা ত্রান সংগ্রহ করছে, উদ্ধারকারী দল পাঠাচ্ছে, টাকা-খাবার সব কিছুই যাচ্ছে। হতাশ হতে গিয়েও তাই মাঝে মাঝে আবার আশার আলো দেখি এই জাতির জন্য।

ভাটির দেশ হবার কারনে আমাদের দেশে প্রতি দশ বছর পরপর ভয়াবহ বন্যা হবেই। আমাদের দরকার প্রস্তুতি নেয়া। ফেইসবুকে অনেক ফেইক ছবির ভীড়ে উপরের এই ছবি আমার মনে দাগ কেটেছে। এই শিশু যখন বড় হবে, সে কি জানবে তাকে সুস্থ অবস্থায় দেখে কত কত মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। কি ভীষণ একটা গোলমেলে সময়ে তাকে রক্ষা করা হয়েছে?
তরুণদের দখলে থাকা দেশে, তাদের অভিজ্ঞতার অভাব থাকলেও সদিচ্ছার অভাব দেখছি না। এটাই হওয়া দরকার ছিলো। পথ হারিয়োনা বাংলাদেশ। জিও-পলিটিক্সের প্যাঁচে আর ব্যক্তিগত স্বার্থের গোলকধাঁধায় অনেক দেশই বসন্তের পর ডুবে গেছে ঘোর অমাবস্যায়। বিপদের সময় যারা কাছে আসে, মধুর কথা বলে, এরা সবাই বন্ধু নয়। রাস্তায় মিছিল করা আর দেশ চালানো এক বিষয় নয়। দরকারে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে- People are judged by their action, not by words or religion. যে বাক স্বাধীনতার কথা বলার আশায় জনতা বুক বেঁধেছে, সংস্কারের নামে নিজেরাই সেটার গলা টিপে ধরবেন না।
আমাদের দেশে দুই রকমের লোক আছে, সবকিছুকেই রাজনৈতিক রুপ দেয়া আর সবকিছুকেই ধর্মীয় রুপ দেয়া লোক। এরা বাংলাদেশের দূর্যোগকে রাজনৈতিক বলবে আর পাশের দেশের দূর্যোগকে খোদার অভিশাপ নামে চালিয়ে দেবে। কেউ মনে রাখে না, প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া করে ভাল থাকা যায় না।
আমার মাঝে মধ্যে মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কেন ইউরোপের মত বর্ডার পাই না? ব্যক্তিগতভাবে বর্ডারের ধারনাটাই আমার পছন্দের না। তারপর হঠাৎ করে মনে হয়, এই জনপদের লোকগুলো আসলে উন্মাদ শ্রেণীর। ধর্মীয় বিভাজনকে যারা সবকিছুর উর্ধ্বে রাখে তারা কোনদিন "Open Border" এর ধারনা কল্পনাও করতে পারবে না। এদের জন্য ভালো জিনিস উপভোগ করতে ইউরোপ ভ্রমণই একমাত্র উপায়।
ফেইসবুক মূলত মূর্খ আর বাচাল লোকজনে ভরা। ইদানিং তাই ফেইসবুকে ঢু মারা কমিয়ে দিয়েছি। নিজের মনের কথা লিখলেও লোকজনের আঁতে ঘা লাগে। বাকস্বাধীনতার কথা মুখে বললেও আমরা খুব কম সময়েই বিরোধী পক্ষকে বলতে দেই, আর শুনতে পছন্দ করি। এখনও পর্যন্ত চিন্তার উন্মেষ খুব কমই দেখেছি এই দেশে।
লেখালেখির জন্য কোন জাতি যদি মানুষ খুন করতে পারে, তবে তাদের ভবিষ্যত অন্ধকার। সেখানে বাক স্বাধীনতা নেই। সব অভিমতকে স্বাগত জানাতে হবে। যুক্তি খন্ডন করতে হবে যুক্তি দিয়ে, জ্ঞান কে জ্ঞান দিয়ে। তলোয়ারের ডগায় বা বন্ধুকের নলে ক্ষমতা বদল হলেও, তা ক্রমাগত নতুন নতুন বিপ্লবের জন্ম দেবে। আর প্রতিটি রাজনৈতিক বিপ্লব দেশকে দশ বছর করে পিছিয়ে দেবে।
আমি বিখ্যাত কোন ব্যক্তি নই। এমনকি পরিচিত মহলে জনপ্রিয়ও নই। কিছুটা একরোখা আর জেদি টাইপের মানুষ। বেশিরভাগের কাছেই আমি নিতান্তই বোরিং একটা চরিত্র। নিজের জন্মদিনে কেউ শুভেচ্ছা জানালে এখন আর পুলকিত হইনা। যেহেতু নানা জায়গায় ফর্ম পূরণ করতে গেলে জন্ম তারিখ দেয়া লাগে, তাই তারিখটা ভুলিনা। কিন্তু সচেতনভাবে চেষ্টা করি এটা লুকিয়ে রাখার। অহেতুক উচ্ছাস ভালো লাগে না।
তারপরেও সবার আগে আমার কন্যা আর স্ত্রী জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। একটা ছোট কেক এনেছে। আলিনা সেটা সাথে সাথেই কেটে খেয়ে ফেলেছে। যদিও সে প্রথমে আমাকেই কাটতে বলেছিল। কারন এটাই নাকি নিয়ম।
আমাকে এরপরেও এক-দুজন মেসেজ করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। বাংলালিংক, এয়ারটেল, সিটি ব্যাংক, ব্রাক ব্যাংক থেকেও মেসেজ পেয়েছি। কর্পোরেট অটোমেটেড মেসেজ। তারপরেও কিছুটা ভালো লেগেছে।
২০২৩-২০২৪ আসলে খুব ভালো যায়নি। অনেক খারাপ সময় পার করতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে ভেঙে পড়তে গিয়েও আবার শিরদাঁড়া খাড়া রাখতে হয়েছে।
বিশেষ করে "প্যানিক এটাক" নামে একটা যন্ত্রনায় আক্রান্ত হয়েছি অনেকবার বিগত ছয় মাসে। প্যানিক এটাক আমার কোনকালেই ছিলো না। এটা শুরু হয়েছে দীর্ঘ সময় ভারতে থাকার সময়। দীর্ঘ মেয়াদি বিষন্নতায় আক্রান্ত ছিলাম। সেই সাথে প্যানিক এটাক আমাকে বেশ কাবু করে ফেলেছিল। হটাৎ করে মনে হত সব অন্ধকার হয়ে আসছে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, আর কোনোদিন মনে হয় দেশে ফেরত যেতে পারব না। প্রচন্ড অস্থির লাগত...।
নিজস্ব পরিকল্পনার বাইরে চলাটা আমার এই প্যানিক এটাককে বাড়িয়ে দিয়েছিল বেশ কয়েকগুণ। এখন আপাতত ভাল আছি। আবার লিখতে পারছি, নিজের কাজ করতে পারছি।
নাহ, সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাইনি। রোগের কার্যকারন যেহেতু জানি তাই সমাধান বের করার চেষ্টা করেছি। হিউম্যান সাইকোলজি একটা জটিল এবং মজার বিষয়। মস্তিষ্ক কিভাবে কাজ করে বিভিন্ন ঘটনায় সেটা আমাকে সবসময়ই ভাবায়। নিজে এই নিয়ে অল্পবিস্তর পড়াশোনাও করি। তাই চেষ্টা করেছি নিজেই কিভাবে শিরদাঁড়া সোজা করে আবার হাঁটতে পারি।
সমস্যা হচ্ছে, চাহিদা। অন্যদের কাছে আমার খুব বেশি চাহিদা না থাকলেও, সবারই কিছু না কিছু চাহিদা থাকে আমার কাছে। ২০২৪ আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে শক্তভাবে "না" শব্দটা বলতে হয়। এই না বলতে না পারলে আমাকে আরো গভীরে হারিয়ে যেতে হবে।
কারন, দিনশেষে কেউ আমাকে একবারও জিগ্যেস করে না, আপনি কেমন আছেন?
আমার এক স্কুলের সহপাঠী প্রায় তিন বছর আগে হুট করে একদিন আমাকে ফোন করে কিছু টাকা ধার চাইল। আমি স্বভাবতই তার ফোন পেয়ে কিছুটা অবাক হয়েছিলাম। কারন জীবনের ব্যস্ততায় সবাই বেশ দূরে সরে গিয়েছে। কারো সাথে কারো যোগাযোগ নেই। সেখানে অনেকদিন পরে ফোন দিয়ে টাকা ধার চাওয়াটা সে সাধারণ হিসেবে ধরে নিলেও আমি কিছুটা বিব্রত হয়ে গেলাম।
আমি না করার পরেও সে আরো দু-একবার ফোন দিলো এবং শেষ পর্যন্ত আমি তাকে একহাজার টাকা বিকাশ করে দিলাম। যথারীতি সে এই টাকা আর ফেরত দিলো না। আর কোনদিন ফোনও দিল না।
দুইদিন আগে সে আবার ফোন করে টাকা চাইল। এবার পরিমানটা কিছুটা বেশি। আমি কিন্তু এবার আর ভূল করলাম না। তাকে না করে দিয়েছি সরাসরি।
মানুষকে টাকা ধার দেয়া, বা বাকিতে কাজ করে দেয়া এই জিনিসগুলো আমার বেশ অপছন্দের। ধারের অভিজ্ঞতাও ভাল না। বেশিরভাগ মানুষই ধার নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। চাইতে গেলে এমন ভাব করে যেন আমি অতীব লজ্জার কোন কাজ করে ফেলেছি।
ভূল থেকে শিক্ষা নিয়েছি, তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখন না বলে দেই মুখের উপর। টাকা দিয়ে সম্পর্ক নষ্ট করার থেকে, না দিয়ে দূরে থাকাটাই ভালো।
অর্থ কখনোই অনর্থের মূল নয়, যোগ্যতার থেকে বেশি লোভ করাটাই অনর্থের মূল। মানি ম্যানেজমেন্ট নামক একটা বিষয় আছে যেটা বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জানেন না। তাদের দারিদ্রতা তাই কোনদিন কাটে না।
এককোটি টাকা পেলে আপনি কি করবেন এই প্রশ্নের জবাবে তাই একেকজন একেক রকম উত্তর দেয়। খুব কম লোকজনই বলে নিজের পেছনে ইনভেস্ট করব, নিজেকে আরো বুদ্ধিমান বানাতে বা ব্যবসায় ইনভেস্ট করব। তাই টাকা হলেই যে সেটা দিয়ে আপনি আরো টাকা বানাতে পারবেন সেটারও নিশ্চয়তা নেই।

দানে টাকা বাড়ে না, তবে মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যায়। নিজেকে অন্যের থেকে সুপিরিওর ভাবার একটা সুযোগ আসে। এটার সামাজিক আর ধর্মীয় গুনাবলি আছে। আমরা সেই পরিমান টাকাই দান করতে পারি যেটা চলে গেলে আমাদের নিজেদের জীবন যাপনে সমস্যা হবে না। ধারের ক্ষেত্রেও তাই এমন পরিমান ধার দেয়া উচিৎ যেটা ফেরত না পেলে আপনার সমস্যা হবে না।
আবেগের বশে নেয়া যেকোন সিদ্ধান্ত আপনাকে ডোবাবে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি তাই দেখেছি। অনেক খারাপ লাগলেও তাই এখন যুক্তি দিয়ে চিন্তা করার চেষ্টা করি এবং ধার না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমি এই ভুল করে শিখেছি।
আপনার জীবন যাপন হতে হবে খুব সাদামাটা। যেটার দরকার নেই সেটা কখনো কিনতে যাবেন না। শুধুমাত্র মানুষের সাথে প্রতিযোগিতা করার জন্য বা স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে কোন বস্তু বা সেবা কেনা মানে আপনি একটি নির্দিষ্ট চক্রে ঢুকে গেছেন।
প্লেনের ইকোনমি ক্লাসে যদি ভ্রমন করতে সমস্যা না হয়, তবে বিজনেস ক্লাসের টিকিট কাটা অপচয়ের সামিল। যাদের চেনেন না জানেন না তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে নিজেকে জাহির করাটাও অর্থের অপচয়। দাওয়াতে গেলে অতিরিক্ত অর্থ যদি ব্যায় হবার সম্ভাবনা থাকে বা কোন ব্যবসায়িক ফায়দা না হয়, তবে সেই দাওয়াত এড়িয়ে যাওয়াটাই যৌক্তিক।
আপনি একবার কারো দ্বারা প্রতারিত হতে পারেন, বা প্রথমবার সে আপনাকে বোকা বানাতে পারে, কিন্তু, একই ব্যক্তি যদি দ্বিতীয়বারও আপনাকে বোকা বানাতে পারে তবে বাস্তবিকই আপনি একটা মূর্খ।
জুলাই ২০২৪, প্রচন্ড অস্থির একটা সময়। কেউ কারো কথা শুনছে না, সরকার পেশী শক্তি দেখানোর চেষ্টায় আছে, ছাত্ররাও নিজেদের আদর্শ থেকে সরছে না।
আওয়ামীলীগ সরকার কোনভাবেই বুঝতে চাইলো না, বিশ্বাস বা আদর্শের মৃত্যু হয় না। তাকে বদলাতে হয়। গুলি চলেছে, মানুষের প্রান গিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ছাত্রদের জয় হয়েছে।
৫২ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত, বাংলাদেশের ইতিহাস বলে ছাত্রদের উপর গুলি চালিয়ে কোন সরকার টিকে থাকতে পারেনি।
অনেক বিজ্ঞ বিজ্ঞ রাজনৈতিক কলামিস্ট ইতিমধ্যেই বলে ফেলেছেন কেন, কিভাবে, কি হয়েছে। আমার নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষন আছে বর্তমান ছাত্র অভ্যুত্থান নিয়ে।
অভ্যুত্থানের পেছনে আমেরিকা ছিলো, নাকি বিএনপি এবং জামাত-শিবির, সেটা যদি ক্ষমতাসীন দল বলে দেয় তবে জনগন সেটা অবিশ্বাস করবে এটা খুব স্বাভাবিক। খুব সুদূর প্রসারি চিন্তা ভাবনা করাটাও বেশিরভাগ লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা বর্তমানটাই দেখে এবং সেই অনুযায়ি হুট করে একটা মতামত দিয়ে দেয়।
এই দেশে কোন কালেই সরকার জনগনের প্রিয় ছিলো না এবং আমাদের দেশে খুব সম্ভবত কখনই নিরপেক্ষ নির্বাচন বলে কিছু হয়নি। ভবিষ্যতে যে হবে না সেটা অবশ্য বলতে পারছি না। পরিবর্তন আসতেই হবে এবং ১০০ ভাগ না হলেও যদি ৮০ ভাগও পরিবর্তন হয় এই জেনারেশনের হাত ধরে, তবে সেটাও খুব চমকপ্রদ হবে।
ক্ষমতার ধর্মই হল সেটা সময়ের সাথে দূর্নীতিগ্রস্থ হবে। রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, গনতন্ত্র সবগুলো এই ধারা মেনে চলে।
স্বাভাবিক ভাবেই তাই এর পরিবর্তন দরকার। যদি সরকার পরিবর্তন না হয় তবে তাদের মাঝখানে একটা উন্নাসিকতা চলে আসে। ধরাকে সরা জ্ঞান করা শুরু করে। নিজেদের যা ভালো লাগে তা অন্যদের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। একবারও চিন্তা করেনা আমার পদ্ধতি ভূলও হতে পারে।
গত পনের-বিশ বছরের শাসনামলে আওয়ামীলীগ যে পাপের বোঝা বাড়াচ্ছিল তার মিনার এই আন্দোলনের ধাক্কায় তাই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে। এটা হবারই ছিলো। আমরা সিস্টেম কলাপসের আশা করেছিলাম। কিন্তু সেটা যে এত দ্রুত আর এতগুলো তাজা প্রানের বিনিময়ে হবে সেটা ধারনা করতে পারিনি।
আওয়ামীলীগের ভুল নিয়ে এখন কথা বলা সোজা, কারন তারা আর ক্ষমতায় নাই। এতদিন যারা চোখ-কান বুজে সব নিরবে সমর্থন করেছিলেন বা বাধ্য হয়েছিলেন এরা তাই গর্ত থেকে বের হয়ে আসবেন। এবং বিপ্লব পরবর্তিতে তাদের ক্ষোভ মেটানোর চেষ্টায় কিছু ধ্বংসযজ্ঞ চালাবেন দেশজুড়ে। এর প্রথম শিকার হবে আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা, তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাড়িঘর।
বাংলাদেশের কালচার অনুযায়ী কিছু সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িও পোড়ানো হবে।
সরকারি স্থাপনা ভাংচুরও এই প্রক্রিয়ার বাইরে যাবে না। প্রচুর মুরাল এবং স্কাল্পচারও ভাঙ্গা হবে। বিপ্লবের পরে সব দেশেই হয়। পূর্ববর্তী সরকারের করা বেশিরভাগ জিনিসের উপর আক্রোশ দেখায় জনতা। তবে আমাদের এখানে যেটা হচ্ছে সেটাকে ইসলামি রুপ দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে মূর্তি হারাম বলে। ইসলামে মূর্তি হারাম কারন সেগুলোর পূজা করা হয়। স্কাল্পচার ভাঙ্গার যুক্তি, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্বের স্মৃতি বিজড়িত জিনিস ভাঙ্গার যুক্তি আমি পাইনা।
আমি এমন লোকও চিনি যারা শহীদ মিনার এবং জাতীয় স্মৃতিসৌধের বিরুদ্ধে কথা বলেন।
এর মাঝে কিছু সুবিধাবাদি দল থাকে যারা লুটতরাজে অংশ নেবে, ডাকাতির চেষ্টা করবে। থানাগুলোয় একের পর এক আগুন দেয়া হয়েছে। দেশে কার্যত এখন কোন পুলিশিং ব্যবস্থা নেই। আমার বিশ্বাসমতে যারা এই ছাত্র আন্দোলন করেছিল, তারা সবাই রাজনৈতিক ভাবে বেশ স্ব-শিক্ষিত এবং একটা নৈতিকতা ধারন করে। এরা দেশজুড়ে সব থানায় আক্রমন আর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে না। এটা সম্পূর্নভাবে অনৈতিক এবং দেশকে লম্বা সময়ের জন্য অস্থির অবস্থায় ফেলে দেবে।
এই ব্যপারটা পুরোটাই রাজনৈতিক। আওয়ামীলীগ তার শাসনামলে পুলিশ থেকে শুরু করে আর্মি সবজায়গাতেই নিজস্ব দলীয় নিয়োগ দিয়েছিলো। মানুষের এই আক্রোশ সেখান থেকেও আসছে। বিচারবিহীন ভাবে ছাত্রদের উপর গুলি চালানো এটা ছিল ভিমরুলের চাকে ঢিল দেয়ার মতো।
পুলিশকে জনগনের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে বিগত সরকার। বাংলাদেশ আর্মি এই কাজটা করতে চায়নি। তারা অতীতের এরশাদ আমলের ঘটনা ভুলে যায়নি। সমর্থন না পেয়ে তাই সরে দাঁড়াতে হয়েছে হাসিনা সরকারকে। সরকার পতনের পরে তাই প্রশাসনে চলছে চরম বিশৃংখলা। রদবদল চলছে সবজায়গায়।
আজকে বাংলাদেশ পুলিশের যে দূরবস্থা, তার জন্য পুরোপুরিভাবে দায়ী বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। পুলিশকে তারা গত পনের বছর ধরে রাষ্ট্রীয় লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার আগে বিএনপি এবং এরশাদ সরকারও একই কাজ করেছিল। অথচ কেউ কারো ভূল থেকে শিক্ষা নেয়নি।
এই জনপদে যারাই এসেছে তারা ক্ষমতার মসনদ নিজেদের উত্তরাধিকার ভেবে বসে ছিল। জনগণের সেবক হিসেবে থাকার কথা যে পুলিশের তারা অনেক দূরে সরে গিয়েছিল জনস্রোত থেকে। আমি খুব সাধারণ মানুষ হিসেবেই দেখেছি পুলিশের প্রতি মানুষের প্রচন্ড ঘৃণা এবং অনাস্থা। এটা কাটিয়ে ওঠাটা কঠিন মনে হলেও অসম্ভব নয়। কারন দিন শেষে সবাই নিজের ঘরে আরামে নিদ্রায় যেতে চায়। রাতজেগে বাড়িঘর পাহারা দেয়াটা কিংবা রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রন আর ময়লা পরিষ্কার কিছুদিনের জন্য রোমান্টিক হতে পারে, তবে যৌক্তিক নয়।
যার কাজ তাকে করাটাই সাজে। সুশাসনের অংশ হতে গেলে শ্রম বন্টন এবং তদারকি থাকতে হয়। থাকতে হবে আইনের শাসন। তার জন্য আমাদের পুলিশ দরকার।
ছাত্র আন্দোলন সফল হয়েছে, ক্ষোভে বা আবেগে এটাকে মুক্তিযুদ্ধ বলে এখন চালিয়ে দেয়া গেলেও ইতিহাসে এটা যৌক্তিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধ বলে পরিচিতি পাবে না। ছাত্র আন্দোলন আমাদের এই জনপদে নতুন নয়। এই আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধ বললে ১৯৭১ কে অবহেলা করা হয়, লাখো শহীদকে তুচ্ছ করা হয়। তবে এটা কাগুজে ভাষা। কারন মৃত শহীদদের তাতে কোন আপত্তি থাকার কথা না। আপনি যা খুশি বলতে পারেন। তারা কবর থেকে উঠে এসে কোন দাবি দাওয়া পেশ করে না, অভাব অনুযোগ করে না। যত সমস্যা সব হয় জীবিতদের। তারা মৃতদের জীবনের বদলে রাজনীতি করে।
স্বৈরশাসক এদেশে বারবার এসেছে এবং প্রত্যেকবার পরাজিত হয়েছে। ভবিষ্যতেও যে আসবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কারন এই জনপদের মানুষ নৈতিক ভাবে এখনও প্রচন্ড অশিক্ষিত।
কিন্তু তাই বলে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, এবং বঙ্গবন্ধুকে অপমান করার কোন যৌক্তিকতা নেই। সেই সময়টা মিথ্যে নয় এবং তাদের ত্যাগ বৃথা যায়নি। একটা নতুন জাতি তার স্বপরিচয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে আবির্ভূত হয়েছিল।
যে কোন সরকার যেন স্বৈরশাসক না হয়ে উঠতে পারে সেজন্য দরকার একটা কার্যত শক্ত বিরোধীদল। আওয়ামীলীগের সব থেকে বড় ভূলের একটা ছিল এটা। দেশে যখন কোন বিরোধীদল থাকে না, তখন জনগনই সরকারের বিরোধী দল হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। আশা করি ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবেন তারা এদিকটা ভেবে রাখবেন।
আমি ভোটাধিকার প্রাপ্ত হবার পর মাত্র একবার ভোট দিতে পেরেছিলাম। গত তিনবারে দেশে আদতে কোন ভোট হয়নি। ভোট নিয়ে আমি খুব চিন্তিত ছিলাম এমনও নয়। মূর্খের দেশে গণতন্ত্র খুব বেশি কাজও করে না। সেখানে বারবার বিপ্লব আসে আর দেশ পিছিয়ে যেতে থাকে।
গণতন্ত্র তখনি মোটামুটি আকার নিতে থাকবে যখন, প্রথমত রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের গঠনতন্ত্রে গণতন্ত্র থাকবে। বাই রোটেশনে দলের সভাপতি, নেতা, সহনেতা এরকম প্রধান পদগুলোতে পরিবর্তন আসবে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র কাঠামোয় থাকতে হবে কেউ এক বা দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি হতে পারবে না। আপনি যখন জানবেন আপনার দলের বা দেশের জন্য আপনি যতই কাজ করেন না কেন কখনো দলীয় বা রাষ্ট্র প্রধানের পদ আপনি পাবেন না, তখন তেলবাজিই হয়ে যাবে সবার প্রধান অস্ত্র। একজন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। তাকে ঘিরেই সবাই নাচে, গায়, আর দূর্নীতি শুরু করে। আমাদের মূল রাজনৈতিক দলগুলোর ভরাডুবি হয় এই কারনেই।
পরিবারতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলাটাও একধরনের কৌতুক। এখানে ভোটাধিকার দিলেও আদতে কোন পরিবর্তন আসেনা নেতৃত্বে। যাহা লাউ তাহাই কদু হিসেবে রয়ে যায় ৫০ বছর পরেও। একটা বৃহৎ পরিবারের মতই রয়ে যায় দেশ। আমাদের পরিবারগুলোতে যেমন কর্তাই সব করেন, তার ইচ্ছাতেই পরিবার চলে। একটা সময় সন্তানেরা বড় হয়ে আলাদা হয়ে যায়, অথবা উপার্জনক্ষম হলেই বাধে মতানৈক্য, গৃহযুদ্ধ এবং অবধারিত ভাবে পিতা পরাজিত হন। ভাগ হয়ে যায় পরিবার এবং নতুন পরিবারের সৃষ্টি হয়।
দেশকে একইরকম হতে দেয়া যাবে না। এখানে সর্বমতের শ্রদ্ধা এবং সহনশীলতা থাকতে হবে।
একজন স্বৈরশাসক যেহেতু জনগণের ভোটে আসেন না, তাই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য তাকে ব্যবসায়ী, আর্মি, পুলিশ, প্রশাসন এবং নানা লোকজনকে খুশি রাখতে হয়। দূর্নীতির শুরুটা হয় সেখান থেকে। নিজে টিকে থাকার জন্য অবধারিতভাবে মেনে নিতে হয় অনেকের অন্যায্য আবদার। কখনোই বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজের গলা উঁচু করে বলতে পারেন না, আমার দেশের মানুষ এটা চায় না। আমি দেশের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। সেখানে গিয়েও তাকে মেনে নিতে হয় অন্যায্য দাবি। বাড়ে নিজ জনগনের অসন্তোষ। এটা একটা চক্রের মত। সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে বিরুদ্ধ মতের দমন করতে হয়। যখন থেকে আপনি ভোটে কারচুপি করা শুরু করবেন, জেনে রাখবেন আপনার পতন অনিবার্য।
দেশে সরকার পতনের পরপরই বিএনপির সমাবেশ দেয়াটা একধরনের মূর্খতা ছিল। তারা এই আন্দোলনের ফলভোগ করতে চাইছে, চাইছে জামায়েতে ইসলামির মত পল্টিবাজ দলও। ক্ষমতায় যাবার জন্য এই দুই দল যা করার তা করবে, সেটা যতই অনৈতিক হোক।
যেকোন স্থাপনার নামকরনের ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগ একটা স্বৈরাচারী এবং দলান্ধের পরিচয় দিয়ে গেছে আগের বিএনপি সরকারের মত। তাই সরকার বদলের পরপরই জামায়াত এবং বিএনপি মিলে এগুলো মুছে ফেলার আপ্রান চেষ্টা করছে। এটাও ক্ষমতা দেখানোর একটা উপায়।
ইসলামী ঘরানার দলগুলো ধর্ম পুঁজি করি আবেগি জনগনকে বোঝানোর চেষ্টা করছে মূর্তি ভাঙ্গা জায়েজ, রাস্তার নাম ইসলামিক হতে হবে, চত্তরের নাম এরাবিক হতে হবে।
একটা ভিডিওতে দেখলাম তারা এরাবিক গ্রাফিতি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে, আশা জনগন এটা মেনে নেবে ধর্মীয় আবেগে। এরপরই তাদের সাথে বাম এবং সাধারণ ছাত্রদের লেগে যায়। মুছে ফেলা হয় সেই গ্রাফিতি।
খুব সূক্ষভাবে নারীর ক্ষমতায়ন কমবে এবং একটা পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী তৈরি হবে ধর্মের নামে, যদি এখনি তাদের প্রতিহত না করা যায়।
পৃথিবীর কোথাও ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া দেশগুলো শান্তিতে নাই। আমাদের এই ঝামেলাটা তাই দেশভাগের পর থেকেই শুরু হয়েছে। এবং এটা চলমান থাকবে...।
আপনি ধর্মান্ধতাকে রুখে দিতে পারেন শুধুমাত্র সংস্কৃতি আর নৈতিক শিক্ষা দিয়ে। আমাদের বেশিরভাগ মানুষ এটা বুঝতেই চায় না যে, নৈতিক হবার জন্য ধর্ম অপরিহার্য নয়। অপরিহার্য হচ্ছে যৌক্তিক হওয়া আর শিক্ষা। আমাদের নিজস্ব বাঙ্গালী আচার এবং অনুষ্ঠান আছে এগুলোর উপর কিছুদিন পরে নিষেধাজ্ঞা আসলেও খুব অবাক হবার কিছু নেই। গুজব আর অপপ্রচারে কুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী খুব সহজেই প্রভাবিত হয়।
আমি কখনই চাইনা আরব বসন্তের পরবর্তী অবস্থা হোক এই দেশে। একটু গুগল করলেই দেখতে পাবেন তাদের বর্তমান অবস্থা। আমাদের জেন-জি নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং ২০২৪ এর ছাত্র আন্দোলনে যে সাহসিকতা দেখিয়েছে, এরপর চাইনা দেশে আরেকটা সংঘাত বেধে যাক এদের সাথে বিএনপি এবং ধর্ম ব্যবসায়ীদের। গোড়াতেই সমস্যার সমাধান করা গেলে সংঘাত এড়ানো যাবে। আরব বসন্তের পরেই ধর্মীয় জঙ্গীগোষ্ঠীর যে উত্থান হয়েছে তার খেসারত এই দেশগুলো এখনো দিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের পরিনতি যেন একইরকম না হয়।
ড. মোহাম্মদ ইউনুস একজন যোগ্য ব্যক্তি, অন্তত তার ট্র্যাক রেকর্ড তাই বলে। তিনি মিষ্টভাষী এবং বাক্যে অহেতুক অলংকারের ব্যবহার কম করেন। রাজনীতিবিদদের মত চিৎকার করে মাঠ গরম করার চেষ্টা করেন না। কাউকে অহেতুক গালাগাল আর দোষ দেন না। এটা খুব আশার বিষয়। তিনি এয়ারপোর্টে নেমেই সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় আবেগে কেঁদে ফেলেছেন বা চেষ্টা করেছেন। তার পেছনে দাঁড়ানো একজন চোখমুখ খিঁচে খুব চেষ্টা করছিলো কান্না আনার। এসব আমরা দেখে আসছি অনেক কাল থেকেই। রাজনৈতিক কান্না আর আসল কান্নার পার্থক্য বোঝার ঘিলু আমাদের আছে। প্রথমবার করেছেন দেখে তাকে মাফ করা যায়।
আমরা আবেগ বিক্রি করে এরকম কাউকে চাইছি না। চাইছি শান্ত এবং যৌক্তিক একজন নেতাকে।
ক্ষমতার গন্ধ সবসময়ই তীব্র। তার সুবাসে চাটুকারেরা তাকে ঘিরে ফেলবে খুব দ্রুত। এই ভদ্রলোককে যে পরিমান যন্ত্রনা আওয়ামীলীগ দিয়েছে, তা ভুলে যদি তিনি দেশ সংস্কারে মন দেন, সেটাই আমাদের পরম পাওয়া হবে। যেভাবে তিনি ব্যবসা পরিচালনায় দক্ষতা দেখিয়েছেন, আশা করি বাংলাদেশকেও সেরকম ভাবে পথ দেখাতে পারবেন।
বাংলাদেশের সর্বাঙ্গে ব্যাথা, ঔষধ দেবে কোথা? - এর পরেও সংস্কার শুরু করতে হবে। যে দূর্নীতি অতীতের রাজনৈতিক দলগুলোকে অপাংক্তেয় করেছে, নতুন দলগুলো সেখান থেকে শিক্ষা নিক। শান্তি আর সুদিন ফিরে আসুক এই জনপদে।
চেতনার বদলে, ভালোবাসা বিলি হোক। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হোক যুক্তি আর মেধার। এখন সময় আবেগের পরিবর্তে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়ার।
সকাল থেকেই ধুমাইয়া বৃষ্টি পড়তেসে। কালকে রাতেই ভাবছিলাম, আগের মত সারাদিন বৃষ্টি পড়বে এরকম দিন ঢাকায় খুব একটা দেখছি না। সকালেই ইচ্ছা পূরণ।
বৃষ্টির শব্দ আমার খুব পছন্দের। আশেপাশে টিনের চাল নেই। তবে কংক্রিটের উপর আলাদা একরকম বাজনা বাজছে। এটাও মন্দ না। আমার বারান্দায় আকাশের একটা ডিশ লাগানো আছে। সেখানে নিয়মিত লয়ে টুং টাং শব্দ হচ্ছে।
হঠাৎ মনে পড়ল, আজকে তবে রিকশাওয়ালাদের ঈদের দিন। ঢাকা পানির নিচে খুব দ্রুতই চলে যায়। এতে তাদের ব্যবসা বাড়ে। আমার কি? আমারতো চাকরি নাই, কোথাও যাবার তাড়া নাই :)
পরক্ষনেই মনে পড়ল, আজকে শুক্রবার, কারোই খুব তাড়া নাই। অন্যদিন নিজে সকালে চা বানাই না। আজকে মনে হলো, এইরকম বৃষ্টিতে চা মন্দ না। যদিও আমার চা রেডিমেড। খাবারের ব্যপারে আমি খুব কৃচ্ছতা বজায় রাখি।
আমার বারান্দা আর জানালা দিয়ে একটুকরো আকাশ সবসময়ই দেখা যায়। তাই দেখছি আর এক কাপ চা। ব্যাকগ্রাউন্ডে অ্যালেক্সা চিৎকার করছে,
"চার চার চৌকো জানালায়
আমায় দেখে হাতটা বাড়ায়
আকাশ দেখে দিচ্ছি ছুট
মাথার ভেতর শব্দজট..."
জীবনের এই ছোট ছোট সময়গুলো খুব আনন্দের। আমি রুমের ফ্যান-লাইট সব বন্ধ করে দিয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনছি। শব্দজট কাটানোর চেষ্টা করছি। অনেকদিন হলো গল্পে ফিরতে পারছিনা। গালভরা নামে এটাকে "Writer's Block" বলে। কিন্তু আমার পছন্দ "শব্দজট"।

সংসারে যে জিনিসটা সবথেকে বেশি প্রয়োজন সেটা হচ্ছে একে অপরের প্রতি সম্মান। ভালোবাসা খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায় যদি সম্মান না থাকে।
পুরুষ এবং নারী কখনই একে অপরের সমকক্ষ বা প্রতিযোগী নয়। মিলিয়ন বছরের অভিযোজনে মানব সমাজে পুরষের দায়িত্ব এবং নারীর দায়িত্ব আলাদা। তাদের কর্মক্ষেত্রও আলাদা।
জগতের সকল জীবের একমাত্র লক্ষ্য বংশ বিস্তার করে সবচেয়ে সেরা প্রজাতি তৈরি করা। একারনেই শক্ত সমর্থ, বলশালী পুরুষ এবং সুন্দরী নারীরা বিয়ের বাজারে অগ্রগন্য। এটা প্রকৃতির নিয়ম। মানুষ নানা গল্প বানায় আর বিশ্বাস করে এই সত্যকে লুকিয়ে রাখার জন্য।
সঙ্গী বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় প্রাচীনকালে এই পরীক্ষায় সবার আগে থাকত দক্ষ শিকারীরা। কারন তারা খাদ্যের যোগান আর নিরাপত্তা দিতে পারত। তারপরের যুগে বিজয়ী যোদ্ধারা। ক্ষমতাশালী রাজারা অনেক পত্নী এবং উপপত্নী গ্রহন করতেন।
সভ্যতা অনেক এগিয়েছে, এখন নায়ক-নায়িকারা চাহিদার শীর্ষে, সবার আগে অগ্রগণ্য হন এথলেটরা। ভালো ফুটবলার এবং ক্রিকেটারকে ঠিক এই প্রাকৃতিক কারনেই নারীরা খুব পছন্দ করে। পুরোটাই জৈবিক, বংশবিস্তারের আদিম জীনগত তাড়না।
শারীরিক ক্ষমতা কম হলেও, অর্থের ক্ষমতা মানুষকে একইরকম ভাবে বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে আকর্ষনীয় করে তোলে। সবকিছুর মূলেই বংশবিস্তারের প্রাকৃতিক ইচ্ছা।
কবি সাহিত্যিকরা এই প্রাকৃতিক ধারায় অনেক পেছনে পড়ে। তাদের না থাকে অর্থ, না আছে ক্ষমতা। বলশালী এবং সুন্দর না হলেও তারা বাকপটু হন। তারা আবেগকে কাজে লাগান সঙ্গী নির্বাচন প্রক্রিয়ায়।
প্রকৃতিতে ফুল যেমন আপনাকে বিমোহিত করার জন্য ফোটে না। সে তার বংশ বিস্তারের ধারা অব্যাহত রাখার জন্যই নানা রঙে নিজেকে সাজায়। পাখিরাও একই কারনে মধুর সুরে ডাকে। জগতের মোদ্দা কথা টিকে থাকা এবং সেরা সঙ্গী নির্বাচন করে আগের প্রজন্মের যে শারীরিক সমস্যা থাকে তা কাটিয়ে ওঠা।
আজকের কোন প্রজাতিই একবারে আসেনি এই পর্যায়ে। ট্রায়াল এন্ড এরর এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে সবাইকে। সেরা বলে কিছু নেই এবং নিখুঁত বলেও না।
বিশ্বাস একটা কাল্পনিক বিষয়, তুমি কোনভাবেই একে প্রমান করতে পারবে না। প্রমানযোগ্য বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করার দরকার নেই।

যে তোমার মতামত গ্রহন করে না, তার কোন কিছুর দায়ভার গ্রহন করতে তুমি বাধ্য নও।
বারবার ক্ষমা করে দেয়াটা দূর্বলতার লক্ষন।
ভালোবাসা চিরদিন একই রকম থাকে না। তরল পদার্থের মত সময়ের সাথে সাথে সে আকৃতি বদলায়। কাউকে অবহেলা করার আগে দশবার চিন্তা করবে।
একশ দিন ভালো ব্যবহার করো, মানুষ সেটা মনে রাখবে না। একদিন খারাপ ব্যবহার করো, সেটাই তোমার পরিচয়। একারনেই নিপাট ভদ্রলোক হয়ে ওঠা হয় না আমার।
আমি সায়েন্স ফিকশনের পাঁড় ভক্ত। ছোটবেলা থেকেই পড়ে আসছি।
সদ্য শেষ করলাম "মোশতাক আহমেদের" - নিলির ভালোবাসা - নামের একটা সায়েন্স ফিকশন।
খুবই আশাহত হলাম। ভদ্রলোক নাকি খুব নামকরা লেখক। কিন্তু এটাকে ঠিক সায়েন্স ফিকশন না বলে একটা চিত্রনাট্য বললে ভাল হয়। কোন বিশেষ রহস্য নেই। একজন পৃথিবীর মানুষ এবং আরেকজন ভিন গ্রহের নীল রঙের মেয়ের ভালোবাসার মিনমিনে গল্প।
অহেতুক অনেক বর্ননা। বইটা বেশ বড়, কিন্তু মূল উপদান শূন্য।
বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর কোন চটক নেই। অহেতুক কিছু টাকা খরচ করে বইটা কিনলাম।
আমার মনে হয় এই কথাটা অনেক কবি সাহিত্যিকই বলে গেছেন।
আবেগেময় কথা। জগতে যা কিছু ঘটে তা নির্দিষ্ট কার্য কারনেই ঘটে। মানুষ যেমন তার বংশ বিস্তারের জন্য সবথেকে সুন্দরী নারী বা শক্তিশালী পুরুষ খোঁজে, তেমন সকল প্রানি এবং উদ্ভিদকুলেও ঘটে।
ফুল নিজের বংশ বিস্তারের জন্যই প্রকৃতিতে নিজেকে সাজায়। মানুষকেও আকৃষ্ট করে একারনেই। যে ফল আপনি খান আর যে ফুলের গন্ধে বিমোহিত হয়ে কবিতা লেখেন, তা শুধু মাত্র গাছের পরাগায়ণে এবং বংশ বিস্তারে সাহায্য করার জন্যই তৈরি হয়।
পুষ্প নিজের জন্যই ফোটে। পুরো পৃথিবীর বাস্তুসংস্থান এভাবেই চলে।
প্রানী হত্যা মহাপাপ, এটা কোন কোন ধর্মে থাকলেও বাস্তুসংস্থানে এর কোন ঠাঁই নেই। খাদ্য শৃঙ্খলের কে কাকে মারবে এবং খাবে সেটা কোটি কোটি বছরের "ইভোলিউশন" ইতিমধ্যে ঠিক করে দিয়েছে।
আমরা মানুষ হিসেবে প্রানী প্রেমীও নই। আমাদের প্রানী প্রেম খুব "সিলেক্টিভ"। আমরা বেড়াল, ঘোড়া এসব খাই না। কেউ কেউ হয়ত খায়। কিন্তু ছাগল, গরু, মহিষ, মুরগী, পাখি ইত্যাদি দেদারসে হত্যা করি এবং খাই। এটাই স্বাভাবিক।
খাদ্য শৃঙ্খলে আমরা সর্বভূক।
জগতটাই টিকে আছে Survival of the fittest এর নীতিতে। মানুষ সেই ফিটনেস এর বিচারে সব থেকে smartest ও বটে।
Legacy বলতে কিছু নেই। আমরা আসলে কিছু রেখে যেতে পারি না। আমাদের মৃত্যুর সাথে সাথেই আমাদের গল্পগুলো শেষ হয়ে যায়।
আমাদের সন্তানেরা আমাদের থেকে সম্পূর্ন আলাদা রকমের মানুষ। আমাদের কোন কিছু তারা বহন করে নিয়ে যাবে সেরকমটা হয় না।
আপনার যা অর্জন তা আপনার একান্তই নিজস্ব। বিজ্ঞানীর ছেলেও যদি বিজ্ঞানীও হয়, তবে সেটা তার একান্তই নিজের চেষ্টায়।
অহেতুক বিশাল সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে নিজের ছোট্ট জীবনকে উপভোগ না করতে পারাটা তাই মূর্খতা।
অনেক রাজার ছেলেও শেষ পর্যন্ত রাজা হতে পারেনি। অনেক বিশাল সাম্রাজ্য অচিরেই ডুবে গেছে ইতিহাসের পাতায়।
তাই আপনি বংশধর না রেখে গেলে পৃথিবীর কোন অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে না।
যা করছেন নিজের জন্যই করছেন।
বেঁচে থাকাটা উপভোগ করতে শিখুন।